• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ২২শে অক্টোবর, ২০১৯ ইং | ৭ই কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | ২২শে সফর, ১৪৪১ হিজরী

রাত ১০:০৫

হিমাগারে রাজধানীর ‘সিটিং সার্ভিস’


তরিক শিবলী : গণপরিবহনে ‘সিটিং সার্ভিস’ বলে আইনি বৈধতা না থাকলেও রাজধানীর ‘লোকাল’ নামে পরিচিত বাসগুলো রং বদলিয়ে হয়ে গেছে ‘সিটিং সার্ভিস’ বাস। এসব বাস সার্ভিস সরকার-নির্ধারিত ভাড়ার নিয়মও মানছে না। ফলে স্বল্প দূরত্বের যাত্রীদের ভোগান্তির পাশাপাশি গুনতে হচ্ছে বাড়তি অর্থও। ‘মুড়ির টিন’ খ্যাত ফিটনেসবিহীন গাড়িগুলোও ‘সিটিং সার্ভিসের’ নাম করে অতিরিক্ত ভাড়া নেয়ার পাশাপাশি নিচ্ছে অতিরিক্ত যাত্রী । বাড়তি ভাড়া দিলেও তাদের যেতে হচ্ছে দাঁড়িয়ে। যাত্রী ওঠানামার জন্য এসব গাড়ি প্রতিটি স্টপেজেই দাঁড়াচ্ছে। ফলে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়েও সেবা পাচ্ছেন না যাত্রীরা। যেন হিমাগারে রাজধানীর ‘সিটিং সার্ভিস’।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ঢাকাকে যানজটমুক্ত করার প্রচেষ্টা ফলপ্রসূ না হওয়ার জন্য নৈরাজ্যই প্রধান কারণ। আর এক্ষেত্রে ‘সিটিং সার্ভিস’ সবচেয়ে বড় উদাহরণ। হঠাৎ করে নগরীর শতভাগের মতো পরিবহন সিটিং হয়ে যাওয়ার মানে যাত্রী পরিবহন ক্ষমতা অর্ধেক হ্রাস। ফলাফল বাড়তি অর্থদ-ের পাশাপাশি ভোগান্তি। সুযোগ বুঝে ‘মুড়ির টিন’ খ্যাত লক্কড়মার্কা ফিটনেসবিহীন গাড়িগুলোও ম্যানেজ ফরমুলার আওতায় রাস্তায়। সুতরাং রাস্তা জুড়ে এখন বাস আর বাস।

সড়কে নিয়মনীতি মানার ও প্রতিষ্ঠার কোন চেষ্টাই নেই কারও। পরিবহন মালিক, শ্রমিক, যাত্রী কিংবা আইন প্রয়োগকারী সংস্থা সবাই যে যার মতো করে চলে, নিজেরাই নিয়ম ভাঙে। স্বাভাবিক ভাবেই সড়কগুলো হয়ে থাকে অনিরাপদ। নিরাপত্তাহীনতার মধ্যেই চলে মানুষ।

খামারবাড়ি থেকে মহাখালীগামী বিকাশ পরিবহনের গাড়ি নিয়ম মেনে বায়ের লেন ধরে যাবার কথা। দৃশ্যে অনিয়ম স্পষ্ট, ডানের লেনে এগিয়ে এসে বামে ঢোকার চেষ্টা। ফলাফল দুই লেনেই পেছনের গাড়ি আটকা পড়েছে। শুধু সাধারণ ও অশিক্ষিতরাই নয়, সরকারি, বেসরকারি, শিক্ষিত, বিত্তশালি এবং সমাজের ভীষণ প্রভাবশালীরাও একইভাবে এখানে, এবং এধরনের মোড়ে নিয়ম ভাঙে প্রতিযোগিতা দিয়ে।

যাত্রী ওঠানামায় স্বেচ্ছাচারিতা বহাল আছে, পেছনের সব যানবাহন আটকে রাস্তার মাঝে বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠায়, নামায়। যাত্রীরাও ঝুঁকি জেনেও অনিয়ম প্রিয়। পুলিশের সামনেই এসব চলে। কিন্তু তারা যেন দেখেনা।

রাস্তায় নির্ধারিত জায়গায় দাঁড়াতে দেখা পাওয়া যেন সুন্দরবনে বাঘ দেখার মতই বিরল ঘটনা। পুলিশের সামনেই জটলা পাকিয়ে সৃষ্টি করা হয় যানজট।
বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে সড়ক ও পরিবহন কর্তৃপক্ষ বিআরটিএ’র কমিটির সিটিং সার্ভিসসহ ২৬টি বিষয়ের সুপারিশ হিমাগারে। সিটিং সার্ভিসের নামে অরাজকতার জয়জয়কার। গেটলক সার্ভিসের কথা বলে যারা তারাও পথে যাত্রী তোলে। যাত্রী পরিবহনে ভাড়ার তালিকা কেন ঝুলানো নেই এমন প্রশ্ন তোলাই যেন হস্যকর ব্যাপার। গণপরিবহণের ফিটনেস লাগেনা, যা খুশি চলছে।

নগরীর আয়তনের ২৫ শতাংশ সড়ক থাকার কথা, আছে ৮ শতাংশেরও কম। ফুটপাতগুলো যার ক্ষমতা আছে তার দখলে। লেন না মানার সংস্কৃতি ভিআইপি সড়কেও বহাল, লেগুনা চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দেয়ার খবরটা মিথ্যা প্রমাণ করছে এরা।

স্কুল-কলেজগুলোর সামনে যথেচ্ছ পার্কিং, যেমন খুশি তেমন ওঠানামা, যানজট মেনে নেয়া বাস্তবতাই আছে। অন্যদের দুর্ভোগ হবে কিনা কেউ ভাবে না।যানজটে যেমন নাকাল, ফাঁকা রাস্তা যেন বিপদ। রাত গভীর হলে রাস্তা ফাঁকা হয়, বেপরোয়া হয় যানবাহন। উল্টোপথেও চলে। সার্বিক বাস্তবতায়, অনিময়মই আজও দাপটের সাথে টিকে আছে সড়কে।

রাজধানীতে গত কয়েকবছরে বিভিন্ন রুটে চালু হয়েছে বেশ কিছু নতুন পরিবহন। তবে চালু হওয়া এসব বাস গেইটলক কিংবা সিটিং সিস্টেমে চলায় মোটাদাগে যাত্রীদের একটা বড় অংশেরই কোন উপকারে আসেনি। পরিস্থিতি আরো খারাপ হয় যখন ৭ নম্বর, ৮ নম্বর, ভিআইপি ২৭ বা ৩ নম্বরের মতো লোকাল বাসগুলোও একে একে হয়ে যেতে থাকে গেটলক সার্ভিসের নামে প্রতারণার হাতিয়ার।

এমন পরিস্থিতিতে খোদ পরিবহন মালিক সমিতির আহ্বানে সিটিং সার্ভিস বন্ধ করতে গিয়ে উল্টো চাপে পড়ে পিছিয়ে আসতে হয় বিআরটিএ কে।

এক যাত্রী বলেন, সিটিং হওয়াতে আমরা যারা অল্প দূরত্বে যাবো, এই যেমন ফার্মগেট থেকে শাহবাগ যেতে চাইলে বাসে উঠতে পারি না।’ আরেক যাত্রী বলেন, ‘আমরা যা চাই তার তো কিছুই পাই না। সিটিংয়ের ভাড়া বেশি দেই কিন্তু সেখানে আসলে সে সুবিধা পাই না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বের কোথাও নগরীর ভেতরে সিটিং সার্ভিস নেই। সেখানে ঢাকার মতো জনবহুল মেগাসিটিতে তো প্রশ্নই ওঠে না। পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. সামছুল হক বলেন, ‘দূরপালার জন্য সিটিংটা থাকতে পারে কিন্তু শহরের মধ্যে এটা পিক আওয়ারে কোনভাবেই অনুমোদন দেয়া উচিৎ না। যদি আমরা গেইটলক করে দেই তাহলে বাস কিন্তু বেশি নামাতে হবে। বাস বেশি নামালে আবার যানজট হয়ে যাবে। তারা বলছেন, সিটিং সার্ভিসে না গিয়ে পরিবহন কোম্পানিগুলো এসি, নন এসি বা মহিলাদের জন্য স্পেশাল সার্ভিস চালু করতে পারে।

ডিএনসিসির পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও পরামর্শক ড. এস এম সালেহউদ্দিন বলেন, পৃথিবীর সব দেশে যেটা আছে সেটা হলো, বৃদ্ধ, শিশু বা নারীদের জন্য কেবল একটা সিটের বন্দোবস্ত থাকে।

তবে সড়ক পরিবহন নিয়ন্ত্রণ সংস্থা বিআরটিএ বলছে, মালিক শ্রমিক যাত্রী সবার স্বার্থ ঠিক রেখেই নগরীতে বাস সার্ভিসের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবেন তারা। বিআরটিএ’র ডিরেক্টর (এনফোর্সমেন্ট) নাজমুল আহসান মজুমদার বলেন, আমরা চেষ্টা করবো সব যাত্রীদের সুবিধা এবং স্বার্থ সামনে রেখে আমরা সিদ্ধান্ত নেবো।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ছোট্ট এ নগরীতে জনসংখ্যার বাড়তি চাপ সামলাতে গণপরিবহণের যেমন ব্যবস্থাপনা দরকার ছিলো তা নেই। ফলে বাড়ছে ভোগান্তি। তারা বলছেন, যদি গণপরিবহণকে সুষ্ঠু নিয়ম শৃঙ্খলার আওতায় আনা যায় তাহলে অল্প বাসেই বেশি সংখ্যক যাত্রীকে পরিবহণ সুবিধা দেয়া সম্ভব।