• ঢাকা
  • শুক্রবার, ২২শে নভেম্বর, ২০১৯ ইং | ৭ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | ২৪শে রবিউল-আউয়াল, ১৪৪১ হিজরী

বিকাল ৪:০১

সারাদেশে ইয়াবা সরবরাহের নিরাপদ মাধ্যম কুরিয়ার সার্ভিস!


হাফিজুর রহমান শফিক : দীর্ঘদিন ধরে মাদকদ্রব্যসহ নিষিদ্ধ পণ্য পরিবহনে অপরাধীরা অন্যতম মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছে কুরিয়ার সার্ভিসকে। বিশেষ করে ইয়াবার চালান সারাদেশে পৌঁছে দিতে নিরাপদ রুট হিসেবে কুরিয়ার সার্ভিসকে বেছে নিয়েছে মাদক ব্যবসায়ীরা।

দেশজুড়ে ব্যাঙের ছাতার মত প্রায় ১৭শ কুরিয়ার সার্ভিস গড়ে উঠেছে। কয়েকটির অনুমোদন থাকলেও বেশিরভাগ কুরিয়ারের নেই কোন অনুমোদন বা নজরদারি। আর সরকারের এই দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে দেশের জেলা উপজেলায় গড়ে উঠেছে ইয়াবার কারবারি সিন্ডিকেট।

কুরিয়ার সার্ভিস পরিচালনায় ও কাগজে কলমে কঠোর আইন বিধিমালা থাকা সত্ত্বেও তার প্রয়োগ নিয়ে কর্তৃপক্ষের যেমন মাথা ব্যাথা নেই তেমনি মানছেন না এই খাতে সংশ্লিষ্টরা। তাই তদারকির অভাবে অবৈধ পণ্য ও মাদকদ্রব্য সরবরারহের মাধ্যম হিসেবে অবাধে ব্যবহার হচ্ছে কুরিয়ার সার্ভিস।

যার উদাহরণ সম্প্রতিসময়ে উত্তরা, মতিঝিল সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বেশ কিছু ইয়াবার চালান সহ অসংখ্য অবৈধ ্রব্য ধরা পরা। কয়েকমাস আগে মতিঝিলের লিকুশায় অবস্থিত সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিস কার্যালয়ে অভিযান চালিয়ে র‌্যাব ৪০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করে। এ ঘটনায় সাথে জড়িত চারজনকে আটক করে র‌্যাব। র‌্যাব জানায়, পার্সেলে বিভিন্ন ধরনের ক্রিমের কৌটায় বিশেষ কায়দায় লুকানো অবস্থায় ইয়াবাগুলো ছিল। চারটি পার্সেলে চট্টগ্রামের লোহাগাড়া থেকে এসব ইয়াবা আসে।

দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাদকবিরোধী কঠোর অভিযানের মধ্যেও থেমে নেই মাদক কারবারিরা। তারা বিভিন্ন কৌশলে মাদকের চালান কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাচার করছে। র‌্যাব, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কড়াকড়িতেও দমছে না ভয়ঙ্কর এই অপরাধীরা।

র‌্যাব-১০ এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো: মহিউদ্দিন ফারুকী জানান, এসব অপরাধীরা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃতরা দেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চল থেকে ইয়াবা এনে ঢাকাসহ আশপাশের এলাকায় পাইকারি ও খুচরা বিক্রির কথা স্বীকার করেছে।

তিনি আরো জানান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাদকের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান অব্যাহত রাখায় মাদক কারবারিরা নিজেরা মাদক পরিবহন না করে বিভিন্ন কায়দায় ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করে থাকে। এ জন্য তারা কুরিয়ার সার্ভিসকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছে বলে গ্রেফতারকৃতরা স্বীকার করে। এর আগে সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসে অস্ত্র আনার ঘটনা ঘটে।

এ ছাড়া কয়েক বছর আগেও সুন্দরবন কুরিয়ারে টেকনাফ থেকে একটি বড় ইয়াবার চালান ঢাকায় আসে। একটি সূত্র জানায়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের মধ্যে টেকনাফ থেকে প্রায়ই ইয়াবার চালান ঢাকায় আসছে বিভিন্ন কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে। একটি সঙ্ঘবদ্ধ সিন্ডিকেট কুরিয়ার সার্ভিসে ঢাকায় ইয়াবার চালান আনছে। এ ক্ষেত্রে তারা কয়েকটি কুরিয়ার সার্ভিসকে ব্যবহার করছে। বিশেষ করে যে ব্যক্তি ইয়াবার চালান পাঠিয়ে থাকে, তার নাম ও ঠিকানা ভুয়া দেয়া হচ্ছে। তার মোবাইল নম্বরও ঠিক দেয়া হয় না। এমনকি যে ব্যক্তি প্রাপক তার নাম ও ঠিকানাও ঠিক থাকছে না। ফলে মূল হোতারা অধরা থাকছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, কুরিয়ার সার্ভিসে মাদক চোরাচালানকারি সিন্ডিকেটের কৌশল ভিন্ন ভিন্ন রকমের। এদের মূলহোতারা সব সময় আড়ালে থাকে। বিশেষ করে মাফিয়ারা কয়েক হাত বদল করে চালান পাচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে।

বেসরকারি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কুরিয়ার সার্ভিস পরিচালিত হয়ে থাকে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অধীনে। বেশ কিছু বিধিমালার ওপর নির্ভর করে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে কুরিয়ার সার্ভিসের লাইসেন্স প্রদান করে থাকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। যেকোনো পণ্য পরিবহনে এ প্রতিষ্ঠানগুলোকে শর্তারোপ করা হয়েছে। তেমনি কোন কোন পণ্য পরিবহন নিষিদ্ধ তা-ও কঠোরভাবে উল্লেখ করা হয়েছে বিধিমালায়।

কুরিয়ার সার্ভিস পরিচালনায় ২০১১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে প্রকাশিত গেজেটে কোন কোন নিষিদ্ধ পণ্য বা ্রব্য পরিবহন করা যাবে না তা উল্লেখ করা হয়েছে। নিষিদ্ধ দ্রব্যগুলোর মধ্যে রয়েছে মাক, বিস্ফোরক, অস্ত্র, চোরাচালানকৃত কোনো পণ্য, শুল্ক ফাঁকি দেয়া কোনো পণ্য, আমদানি ও রফতানি নিষিদ্ধ পণ্য। এ ছাড়া অন্য কোনো আইন বা বিধির অধীন ঘোষিত জনস্বাস্থ্য, জননিরাপত্তা বা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর, হুমকিস্বরূপ, রাসায়নিক, তেজস্ক্রিয় এবং প্রাণহানিকর ্রব্য এবং সরকার কর্তৃক সময়ে সময়ে জারিকৃত নিষিদ্ধ দ্রব্যাি পরিবহন করা নিষিদ্ধ।

তবে কুরিয়ার সার্ভিস পরিচালনায় কঠোর আইন ও বিধিমালা থাকলেও এর প্রয়োগ বাস্তবে নেই। এমনকি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ও এর কোনো খোঁজ রাখছে না।