• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ২১শে জানুয়ারি, ২০২০ ইং | ৭ই মাঘ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | ২৫শে জমাদিউল-আউয়াল, ১৪৪১ হিজরী

রাত ৯:৩৫

রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলার শুনানি শুরু


নতুন কাগজ ডেস্ক: মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগের শুনানি শুরুনেদারল্যান্ডসের হেগে অবস্থিত আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালতে (আইসিজে) রোহিঙ্গাদের ওপর পরিচালিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার শুনানি শুরু হয়েছে।
মঙ্গলবার (১০ ডিসেম্বর) শুরু হওয়া শুনানির ধারা বিবরণী সরাসরি প্রচার করছে আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালত। মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর প্রতিনিধি হিসেবে এ মামলা করে গাম্বিয়া। মামলা পরিচালনা করছেন দেশটির বিচারমন্ত্রী ও অ্যাটর্নি জেনারেল আবুবকর মারি তামবেদ্যু।
মিয়ানমারের পক্ষ থেকে মামলায় লড়ছেন দেশটির স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চি। শুনানির শুরুতে প্রধান বিচারক সোমালিয়ার নাগরিক আব্দুলকায়ি আহমেদ ইউসুফ অভিযোগ পড়ে শোনান। এরপরে গাম্বিয়া ও মিয়ানমারের পক্ষে দুইজন অ্যাডহক বিচারক নিয়োগ দেন প্রধান বিচারপতি। তিনি তাদেরকে মনে করিয়ে দেন, তারা যেন নিরপেক্ষভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করেন।
১১ নভেম্বর আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালতে রোহিঙ্গা নির্যাতনের ফলে গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে এই অভিযোগ তুলে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলা করে গাম্বিয়া।
২০১৮ সালে বাংলাদেশে অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশনের (ওআইসি) মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলন হয়। এই সম্মেলনে গাম্বিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আসার কথা ছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর স্থলে দেশটির অ্যাটর্নি জেনারেল ও বিচারমন্ত্রী আবুবকর মারি তামবেদ্যুকে পাঠানো হয়। ঢাকায় পৌঁছানোর পরে তামবেদ্যু অন্য দেশের মন্ত্রীদের সঙ্গে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প সফর করেন। ২০১৮ সালের ৫ ও ৬ মে অনুষ্ঠিত মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে মুসলিম দেশগুলো সিদ্ধান্ত নেয় রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার জন্য গাম্বিয়ার নেতৃত্বে একটি অ্যাডহক কমিটি করা হবে এবং এ সংক্রান্ত যাবতীয় কাজ গাম্বিয়া সম্পন্ন করবে।
বাংলাদেশসহ অন্য আরও কয়েকটি দেশ এই কমিটির সদস্য, সবার সহযোগিতা নিয়ে গাম্বিয়া এ বছরের ১১ নভেম্বর মামলা করে।
গাম্বিয়ার আরেকটি সুবিধা হচ্ছে আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালত ও গণহত্যা বিষয়ক বিচার প্রক্রিয়া বিষয়ে অগাধ জ্ঞান আছে দেশটির বিচারমন্ত্রী আবুবকর মারি’র। ৪৭ বছর বয়সী ব্যারিস্টার আবুবকর রুয়ান্ডা গণহত্যা সংক্রান্ত মামলার কৌঁসুলি হিসেবে কাজ করেছেন।
জাতিসংঘের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করার সুবাদে আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালত যা জাতিসংঘের কোর্ট হিসাবে পরিচিত সে বিষয়েও ভালো ধারণা আছে তার। মামলা পরিচালনার কাজে আবুবকরকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রখ্যাত আইনি প্রতিষ্ঠান ফলি হগ সহায়তা করছে। এই ফলি হগ সমুদ্র সীমানা বিরোধ নিষ্পত্তির মামলায় বাংলাদেশের পক্ষে আইনি প্রতিষ্ঠান ছিল।
গাম্বিয়া তার প্রাথমিক আবেদনে গণহত্যা কনভেনশনের ৯ নম্বর ধারা বলে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে। গাম্বিয়া ও মিয়ানমার উভয়ই জেনোসাইড কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী দেশ। জাতিসংঘ ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের রিপোর্ট, জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের রিপোর্টসহ অন্যান্য রিপোর্টকে উদ্ধৃত করে গাম্বিয়া বর্তমান ঘটনাপ্রবাহের বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছে।
গাম্বিয়ার পক্ষ থেকে আইসিজে’র কাছে কয়েকটি বিষয়ে সুরাহা চাওয়া হয়েছে। মিয়ানমার গণহত্যা কনভেনশন লঙ্ঘন করেছে সে সম্পর্কিত ঘোষণা, মিয়ানমার যেন এই কনভেনশন মেনে চলে সে সম্পর্কিত ঘোষণা, যারা গণহত্যা করেছে তাদের শাস্তির ব্যবস্থা, রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব, প্রত্যাবাসনসহ ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করার নির্দেশ চাওয়া হয়েছে।
যেহেতু এ ধরনের মামলা অনেকদিন ধরে চলে, সেজন্য গাম্বিয়া একটি অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ চেয়েছে এই আদালতের কাছে, যাতে করে মিয়ানমার এই সংক্রান্ত কোনও প্রমাণ ধ্বংস করে না ফেলতে পারে। এই আদেশের শুনানি হবে ১০ থেকে ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত। আশা করা হচ্ছে, শুনানি শেষে এক মাসের মধ্যে এ বিষয়ে একটি আদেশ পাওয়া যাবে।
মামলা পরিচালনায় গাম্বিয়াকে সহায়তা করতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে পররাষ্ট্র সচিব এম শহীদুল হকের নেতৃত্বে একটি বড় প্রতিনিধিদল নেদারল্যান্ডসে উপস্থিতি থাকবেন।
আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালত (আইসিজে) হচ্ছে সারাবিশ্বের আদালত। জাতিসংঘের যে ছয়টি অঙ্গ সংগঠন আছে আইসিজে তার মধ্যে একটি। এটি সাধারণত জাতিসংঘের আদালত হিসেবে পরিচিত। আইসিজের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এখানে শুধুমাত্র দেওয়ানি মামলা করা যায়, ফৌজদারি নয়। ফৌজদারি মামলা করতে হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি)। ১৯৪৬ সালে যাত্রা শুরু হওয়া আইসিজেতে প্রথম মামলা হয় ১৯৪৭ সালে (যুক্তরাজ্য বনাম আলবেনিয়া)। এখন পর্যন্ত প্রায় ১৮০টির মতো মামলা হয়েছে ওই কোর্টে। বর্তমানে ১৭টি মামলার বিচার প্রক্রিয়াধীন আছে। এই আদালতের সদর দফতর নেদারল্যান্ডসের হেগে অবস্থিত।
এই আদালতের সদস্য দেশ অন্য দেশের বিরুদ্ধে সুমদ্রসীমা নির্ধারণ, গণহত্যা, তিমি শিকার, পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা, অন্যদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলানো, এমনকি নাগরিক সুরক্ষা সংক্রান্ত মামলাসহ যেকোনও বিষয়ে সুরাহার আবেদন করতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ভারতীয় একজন নাগরিককে পাকিস্তান মৃত্যুদণ্ড দিলে ওই ব্যক্তিকে রক্ষার জন্য ২০১৭ সালে ভারত আইসিজেতে মামলা করে। মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে রোহিঙ্গাদের ওপর হত্যা, গণধর্ষণ, নির্যাতন, উচ্ছেদসহ যেসব মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে সেগুলোকে দেওয়ানি মামলা হিসেবে উপস্থাপন করে দেশটির সরকারের বিরুদ্ধে ওই আদালতে মামলা করেছে গাম্বিয়া। বাংলাদেশ তাদের সার্বিকভাবে সহযোগিতা করছে।
মানবতাবিরোধী অপরাধের শিকার হয়ে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন থেকে লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশের টেকনাফ সীমান্তে আশ্রয় নেওয়ার মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গা সংকট বিশ্ব সম্প্রদায়ের সামনে চলে আসে। তবে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ‘ক্লিয়ারেন্স অপরেশনস’ অভিযানের শুরু এরও এক বছর আগে। ২০১৬ সালের ৯ অক্টোবর রাখাইনে একটি সীমান্ত ফাঁড়িতে হামলার অজুহাত দেখিয়ে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সে বছর অভিযান শুরু করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। সে সময় এই মুসলমান সম্প্রদায়ের একাংশের ওপর নির্মম নির্যাতন চালিয়ে সফল হয় সামরিক জান্তা। আর নির্যাতন চরমে পৌঁছালে অক্টোবর থেকে পরের জুলাই পর্যন্ত প্রায় ৯০ হাজার রোহিঙ্গা পালিয়ে আসে বাংলাদেশে। হত্যা, ধর্ষণসহ মারাত্মক নিপীড়নের শিকার হয়ে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা সদস্য উদ্বাস্তু হয়ে পড়ে। এই অভিযানের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে রাখাইন থেকে রোহিঙ্গাদের নিশ্চিহ্ন করতে নতুন পরিকল্পনা করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী।
পরের ধাপে রোহিঙ্গা নিধন ও উচ্ছেদের বিশদ পরিকল্পনা করে সেনা নিয়ন্ত্রণাধীন মিয়ানমার সরকার। আগের পরিকল্পনার মতোই ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট বেশ কয়েকটি পুলিশ ফাঁড়িতে হামলার ঘটনার অজুহাতে বন্ধ থাকা ‘ক্লিয়ারেন্স অপরেশনস’ নতুন করে শুরু করে মিয়ানমার বাহিনী। আগেরবারে রোহিঙ্গাদের একাংশকে টার্গেট করলেও ২০১৭ তে গণহত্যার উদ্দেশ্য নিয়ে গোটা উত্তর রাখাইনজুড়ে হামলা শুরু করে মিয়ানমার বাহিনী।
এতে সহযোগিতা করে দেশটির বেশ কিছু বৌদ্ধ সম্প্রদায়। মিয়ানমার সেনাবাহিনী প্রায় চারশ’ গ্রাম সম্পূর্ণ বা আংশিক পুড়িয়ে দেয় এবং সাত লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। বাংলাদেশ, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ফিলিপাইন ও নরওয়ের গবেষকরা একটি জরিপ করে এবং ওই জরিপের প্রাক্কলন অনুযায়ী ২৫ হাজারের মতো রোহিঙ্গা নিহত হয়।
প্রথম থেকেই বাংলাদেশ বিষয়টি দ্বিপক্ষীয় ও বহুপাক্ষিকভাবে সমাধানের চেষ্টা করে যাচ্ছে। হামলা শুরুর দুই মাসের মধ্যে প্রত্যাবাসন সংক্রান্ত একটি সমঝোতা সই করে দুই দেশ। আর দ্বিপক্ষীয় উদ্যোগের পাশাপাশি মিয়ানমারের ওপর চাপ অব্যাহত রাখতে বহুপাক্ষিক উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ। এরই অংশ হিসেবে বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) ও আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালতে (আইসিজে) মামলার সম্মুখীন মিয়ানমার।
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত তাদের তদন্ত কার্যক্রম শুরুর অনুমোদন পেয়ে গেছে। অন্যান্য জায়গায় আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার প্রক্রিয়া শুরু করার মানদণ্ডে এই বিচার প্রক্রিয়াও অল্প সময়, অর্থাৎ দুই বছরের মধ্যে শুরু হয়েছে। এই আইনি প্রক্রিয়ায় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠি তাদের ওপর পরিচালিত নির্যাতনের ন্যায়বিচার পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

নতুন কাগজ/আরকে