• ঢাকা
  • সোমবার, ৯ই ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং | ২৪শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | ১১ই রবিউস-সানি, ১৪৪১ হিজরী

দুপুর ১২:১৮

রাজধানীতে পানি সংকট, ভোগান্তি চরমে!


নিজস্ব প্রতিবেদক;
মিরপুর, শেওড়াপাড়া, রামপুরা, বাড্ডা, মোহাম্মদপুর, মুগদা, হাজারীবাগসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় পানির তীব্র সংকট চলছে। প্রচন্ড গরমের মধ্যে রোজায় এই সংকট আরও বেড়ে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে নগরবাসীকে। মিরপুর-১-এর গুদারাঘাটসহ কোনো কোনো এলাকায় ওয়াসার লাইনে পানি থাকলেও সে পানি মিলছে না বাসাবাড়িতে। একটি সিন্ডিকেট কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে অবৈধভাবে পানি সরবরাহ দিচ্ছে বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর।

মিরপুর-১ এলাকার বাসিন্দা মো. রোকন মিয়া জানান, টানা ১৯ দিন ধরে তাদের এলাকায় পানি নেই। মাঝেমধ্যে সকাল ৬টার দিকে সামান্য পানি এলেও অল্প সময়ের মধ্যেই তা শেষ হয়ে যায়। তাই প্রতিদিনই পানির পাম্পে গিয়ে সামান্য পানি এনে চলতে হচ্ছে। আর খাওয়ার জন্য বেশিরভাগ সময় বোতলের পানি কিনতে হয়। মিরপুর-১৩ এলাকার বাসিন্দা হাফিজুল ইসলাম

জানান, গত ৯-১০ দিন ধরে এ এলাকায় পানি নেই। কোনো কোনো বাড়িতে একটু পানি আসে, তাও সঙ্গে সঙ্গে আবার বন্ধ হয়ে যায়। রমজানে প্রচÐ গরমের মধ্যেও তারা গোসল করতে পারেন না, হাত-মুখও ধোয়া যায় না। হঠাৎ করে কিছু পানি এলে তা অনেকটাই ময়লা। ফলে সেই পানি না যায় খাওয়া, তা দিয়ে না চলে গোসল। শেওড়াপাড়ার বাসিন্দা মো. আবদুল হাকিম জানান, তাদের এলাকায় ১৬ দিন ধরে পানি নেই। ভোররাতে আধাঘণ্টা সময় ধরে পানি আসে, সেটা দিয়ে গোসল হয় না। বউ-বাচ্চা নিয়ে বিপদে আছি। অফিস করে বাসায় গিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে পানি ব্যবহার করে পরিচ্ছন্ন হবো, সে সুযোগও নেই।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর উত্তর কাফরুল, দক্ষিণ কাফরুল, দারুস সালাম রোড, শ্যামলী, মিরপুর-১, ১৩, ১৪ নম্বর বøক, মিরপুরের রূপনগর আবাসিক এলাকা, ইব্রাহিমপুর, রামপুরা, বাড্ডা, মাদারটেক, মুগদা ব্যাংক কলোনি, মোহাম্মদপুর বায়তুল আমান হাউজিং, যাত্রাবাড়ী, পোস্তগোলা, গেন্ডারিয়া, পুরান ঢাকার সূত্রাপুর, কাপ্তানবাজার, নাজিরাবাজার, চানখাঁরপুলসহ বিভিন্ন এলাকার কোথাও পানির তীব্র সংকট আবার কোথাও পানিতে ময়লা-দুর্গন্ধ। কোনো কোনো এলাকায় এক মাস পর্যন্ত ওয়াসার লাইনে পানি নেই। আবার কোনো এলাকায় ওয়াসার পাইপে পানি এলেও তা ব্যবহারের অনুপযোগী।
রাজধানীর দনিয়া-কদমতলী এলাকায়ও গত ১০ দিন ধরে নেই পানি। ওই এলাকার বাসিন্দা স্থানীয় শিক্ষক আবদুর রউফ জানান, ওয়াসার পাইপলাইনে পানি বলতে গেলে একেবারেই আসে না। তাই বাধ্য হয়ে গ্যালনভর্তি পানি অন্য জায়গা থেকে কিনে আনতে হয়। পানির অভাবে তাদের ঠিক মতো গোসলও করা হয় না। অন্য জায়গা থেকে পানি এনে কোনোরকম হাত-মুখ ধোয়ার কাজ চলে। তিনি জানান, দনিয়ার গোবিন্দপুরেও নেই পানি। সেখানকার মানুষেরও একই অবস্থা। এ সমস্যার কথা বারবার ওয়াসার লোকদের জানালে তারা বলছে, গরমে উৎপাদন কম, তাই পানির কিছুটা সংকট রয়েছে। তারা শুধু বলে সমাধান হয়ে যাবে। কিন্তু দশ দিনেও পানি পাচ্ছি না। লালবাগ এলাকার পানি ঘোলাটে, দুর্গন্ধযুক্ত বলে অভিযোগ করেছেন জাহাঙ্গীর আলম নামে এক বাসিন্দা। তিনি বলেন, লাইনে সামান্য পানি আসে তাও ঘোলা এবং দুর্গন্ধময়। ফলে আমরা সেই পানি দিয়ে কোনো কাজই করতে পারছি না। পানিতে হাত দিতেই ঘৃণা হয়।

রাজধানীর বাড্ডা এলাকার বাসিন্দা আহমেদ ফেরদাউস খান জানান, তিন মাস ধরে এই এলাকায় ওয়াসার পানি অনিয়মিত। গত ২০ দিনে এই সমস্যা প্রকট হয়েছে। আমরা অন্য এলাকা থেকে পানি এনে চলছি। গোসল করার মতো পানি নেই, যতটুকু পানি দূর থেকে আনা হয় তা দিয়ে অজুর কাজই চলে না। ঢাকা ওয়াসার ফোন নাম্বারে বেশ কয়েকবার অভিযোগ দিয়েও কাজ হয়নি। রাজধানীর পশ্চিম রামপুরায়ও এক সপ্তাহ ধরে পানি নেই। কর্তৃপক্ষের কাছে বারবার ধরনা দিয়েও ব্যর্থ হওয়ায় বিক্ষোভে নেমেছে এলাকাবাসী। তারা জানান, ওয়াসা পানির ব্যবসা করছে, তারা বলছে পাঁচশ’ টাকার গাড়ি এক হাজার টাকা দিলে পাব। এই রমজান মাসে আমাদের কষ্ট হচ্ছে। এলাকা এখন মরুভ‚মি হয়ে গেছে।

রাজধানীর আদাবরের একাধিক বাসিন্দা জানান, অল্প সময়ের জন্য পানি আসে। দুয়েক বালতি পানি ভরার পর পানি চলে যায়। আর যে পানি পাওয়া যায় সে পানি নোংরা হওয়ার কারণে তা দিয়ে কিছুই করা যায় না। রান্নাবান্নার কাজে একেবারেই ব্যবহার করা যায় না। তাদের অভিযোগ, এক মগ পানি দিয়েও আমরা অজুু করি। গোসলের তো নামই নেই। এমনিতেই গরম, তার ওপর যদি এরকম পানির সমস্যা থাকে তাহলে কীভাবে চলবে।

ঢাকা ওয়াসা মোডস জোন-৩-এর সহকারী প্রকৌশলী আবুল কালাম জানান, গরমের কারণে পানির চাহিদা প্রায় দুই থেকে তিনগুণ বেড়ে গেছে। ফলে আমরা সব জায়গায় সমানভাবে পানি দিতে পারছি না। এজন্য সমস্যাটা হচ্ছে।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে ঢাকা ওয়াসার পরিচালক (কারিগরি) একেএম শহীদউদ্দিন বলেন, এখন পানির চাহিদা একটু বেশি। আর গরমের কারণে পানির উৎপাদন কমে যায়, পানির লেয়ার নিচে নেমে যায়। পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় প্রতি মিনিটে প্রায় তিন হাজার লিটারের পরিবর্তে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র এক হাজার লিটার। তিনি বলেন, পাম্পের ওপর চাপ কিছুটা বেড়েছে। অনেক সময় বৈদ্যুতিক সমস্যার কারণে মোটর পুড়ে যায় অথবা একটা তার পুড়ে যায়, সেখানে আমাদের হাত থাকে না। প্রতিদিনই ৮-১০টি পাম্প নষ্ট হয়ে যায় এবং এ গুলো ঠিক করতে সব মিলিয়ে ১৬-১৮ ঘণ্টা সময় লাগে। আর এই সময়টাতে সংশ্লিষ্ট এলাকায় পানির সংকট সৃষ্টি হয়। তখনই হইচই পড়ে। যেসব এলাকায় পানি সংকটের কথা জানতে পারছি, সঙ্গে সঙ্গে সংকট মোকাবেলার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে ওয়াসার পরিচালক বলেন, সোমবার রামপুরা ও শেওড়াপাড়ার পানি সংকটের সমাধান করা হয়েছে। তিনি বলেন, ওয়াসার সক্ষমতার আলোকে বিদ্যমান পানি সংকট সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। আশা করছি, নগরবাসীর কষ্ট দ্রæত অনেকাংশে লাঘব হবে।