• ঢাকা
  • শনিবার, ১৪ই ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং | ২৯শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | ১৬ই রবিউস-সানি, ১৪৪১ হিজরী

সকাল ৬:৪২

রাইড শেয়ারিংয়ে ঝুঁকি কমাতে চাই যথাযথ নীতিমালা


সাহাদাৎ রানা : সম্প্রতি রাজধানীতে ছিনতাইয়ের ঘটনায় একজন ‘পাঠাও’ চালক নিহত হয়েছেন। তিনি অ্যাপসভিত্তিক রাইড শেয়ারিং পাঠাওয়ের মোটরসাইকেল চালক ছিলেন।

ধারণা করা হচ্ছে, নিহত চালক পাঠাও অ্যাপ ব্যবহার না করে অন্য অ্যাপ বা চুক্তিভিত্তিক যাত্রীসেবায় যুক্ত ছিলেন। অ্যাপ ব্যবহার করে সেবা প্রদান বা গ্রহণ করলে অনাকাক্সিক্ষত এমন ঘটনা ঘটলে অপরাধী চিহ্নিত করার কাজ কিছুটা সহজ হয়।

কিন্তু চুক্তিভিত্তিক যাত্রীসেবায় তা হয়ে পড়ে কঠিন। পাঠাও চালকের এমন মৃত্যুর ঘটনায় অ্যাপসভিত্তিক রাইড শেয়ারিং বিষয়ে উঠেছে বেশকিছু প্রশ্ন। সবার আগে নিরাপত্তার প্রশ্ন। যাত্রী ও সেবা প্রদানকারী উভয়ের।

তবে এর আগে একটু পেছনে ফিরে তাকানো যাক। জানা যাক আমাদের দেশে অ্যাপসভিত্তিক রাইড শেয়ারিং শুরুর ইতিহাস। মূলত ২০১৬ সালে ঢাকায় প্রথম শুরু হয় অ্যাপসভিত্তিক রাইড শেয়ারিং যাত্রী সুবিধা। প্রথমে একটি কোম্পানি শেয়ারিংয়ের এ সেবা শুরু করলেও লাভের অঙ্ক বেশি হওয়ায় ধীরে ধীরে এর সঙ্গে যুক্ত হয় আরও প্রায় ৫-৬টি প্রতিষ্ঠান। নতুন সেবার এ বিষয়টি খুব অল্প সময়ে রাজধানীর মানুষ লুফে নেয়। এমন সেবা দ্রুত জনপ্রিয় হওয়ার পেছনে রয়েছে আরও কয়েকটি কারণ। প্রধান কারণ, রাজধানীর মানুষ গত কয়েক দশক ধরে যানজটের যন্ত্রণায় ছিল নাকাল। নির্দিষ্ট গন্তব্যের উদ্দেশে বের হয়ে দীর্ঘ সময় পর পৌঁছানো কর্মজীবী মানুষের কাছে নিত্যদিনের ঘটনা। সেই যন্ত্রণা থেকে কিছুটা হলেও পরিত্রাণ আসে অ্যাপসভিত্তিক রাইড শেয়ারিং চালুর পর। মানুষ মোবাইল ফোনের মাধ্যমে অতি সহজে অ্যাপসের সহায়তায় নির্দিষ্ট মোটরসাইকেল বা প্রাইভেট কারের সুবিধা নিয়ে দ্রুত পৌঁছে যাচ্ছেন নিজ গন্তব্যে। এটা ছিল নাগরিকদের জন্য নতুন ঘটনা।

তাই ডিজিটাল এ সুবিধা নিতে খুব একটা দেরি করেনি যানজটে অতিষ্ঠ মানুষ। এর ফলে ভাড়া কিছুটা বেশি হলেও সবাই আগ্রহী হয় অ্যাপসভিত্তিক এ সেবায়। ডিজিটালি ভাড়া পরিশোধের সুবিধা থাকায় লাভবান হচ্ছেন যাত্রী এবং সেবা প্রদানকারী দুই পক্ষই। এতে চালক ও যাত্রীর মধ্যে ভাড়া নিয়ে কথা কাটাকাটির সুযোগ নেই। বিভিন্ন অ্যাপের মাধ্যমে মানুষ মোটরসাইকেলে যাতায়াত করতে পারছেন কম সময়ে। তাই ঢাকার অনেক মানুষই এখন যাতায়াতের জন্য মোটরসাইকেল ব্যবহার করে থাকেন। এতে যে শুধু যাত্রীদের উপকার হচ্ছে তা নয়, অ্যাপসভিত্তিক শেয়ারিং পেশায় যুক্ত হওয়ায় হাজার হাজার যুবকের উপার্জনের ব্যবস্থাও হয়েছে। এসব মোটরসাইকেল চালকের মধ্যে বেকার ছাড়াও বিভিন্ন পেশার মানুষ যুক্ত হয়। কারণ অন্য কাজের পাশাপাশি দিনের একটা নির্দিষ্ট সময় দেয়ার সুযোগ আছে এখানে। এতে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন তারা। এটি একদিকে যেমন আমাদের জন্য স্বস্তির, তেমনি বিপরীতে এর কিছু অস্বস্তির দিকও রয়েছে।

নিয়মনীতি না থাকায় দিন দিন এর নেতিবাচক বিষয়গুলো অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছে যাচ্ছে। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ সম্প্রতি পাঠাও চালক নিহত হওয়ার ঘটনা। এমন ঘটনার পেছনে রয়েছে আরও কয়েকটি কারণ। শুরুতে নিয়ম মেনে অ্যাপসভিত্তিক পদ্ধতিতে রাইডাররা যাত্রীসেবা দিতে আগ্রহী হলেও এখন এই প্রবণতা দিন দিন কমছে। কারণ প্রতিদিনই বাড়ছে মোটরসাইকেল নিবন্ধনের সংখ্যা। বর্তমানে গাড়ি ও মোটরসাইকেল মিলিয়ে রাজধানীতে ৭৫ থেকে ৮০ হাজার চালক রয়েছে। এবং প্রতিদিনই কয়েকশ’ চালক যুক্ত হচ্ছেন এই শেয়ারিংয়ে। তবে এর মধ্যে মোটরসাইকেল চালকই সিংহভাগ। প্রথমে ঢাকা শহরে বসবাসরত যুবকরা এর সঙ্গে জড়িত থাকলেও অর্থ উপার্জনের উদ্দেশ্যে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বাইকাররা ঢাকা আসছেন ভাড়াভিত্তিক অ্যাপে বাইক চালাতে। তাদের আগমনেই মূলত সংকটের শুরু। কারণ ঢাকার বাইরে থেকে যারা আসছেন, তাদের অধিকাংশের নেই যথাযথ প্রশিক্ষণ। জানা নেই, ট্রাফিক আইনও। এতে করে প্রতিনিয়ত নগরে ঘটছে দুর্ঘটনা। এর আগে কয়েকটি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে।

মোটরসাইকেলের সংখ্যা মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধি পাওয়ায় সড়কে চলা অন্য যানবাহন ও সাধারণ পথচারীদের চলাচলের ক্ষেত্রে বিরক্তির কারণ হচ্ছে। শুধু তাই নয়, রাইড শেয়ারিং নিয়ে রয়েছে আরও অসংখ্য ভোগান্তি। রাইড শেয়ারিং মোটরসাইকেল চালকরা বেশি লাভের আশায় এখন অ্যাপ ব্যবহার না করে চুক্তিভিত্তিক যাত্রীদের গন্তব্যে পৌঁছে দিতে বেশি আগ্রহী। এতে যাত্রী ও চালক দুই পক্ষের নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ছে। পাশাপাশি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন যাত্রী ও অ্যাপসভিত্তিক প্রতিষ্ঠান। এ ক্ষেত্রে শুধু লাভবান হচ্ছেন সংশ্লিষ্ট চালকরা। এখন রাজধানীর প্রধান মোড়গুলোয় দলবেঁধে বসে থাকেন বাইকচালকরা। তারা অ্যাপের সহায়তা না নিয়ে সরাসরি যাত্রীকে চুক্তির কথা বলেন। কেউ চুক্তিতে যেতে না চাইলে অন্য বাইকচালকরাও এ ক্ষেত্রে একযোগ হয়ে যাত্রীকে বাধ্য করেন চুক্তিতে যেতে। চুক্তিতে ভাড়া হাকেন নির্দিষ্ট অঙ্কের চেয়ে বেশি। অনেক সময় মানুষ তার প্রয়োজনের কথা বিবেচনা করে বাধ্য হয়ে ওঠেন। এতে যাত্রীর নিরাপত্তার ভয় থাকে সবচেয়ে বেশি। রয়েছে চালকের নিরাপত্তার ভয়ও।

এ ছাড়া রয়েছে বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো। রাজধানীর বাইরে থেকে এসে যারা রাইড শেয়ারিং করছেন, তাদের অধিকাংশই রাজধানীর রাস্তায় বাইক চালানোর মতো দক্ষ নন। মানছেন না ট্রাফিক আইনও। রাস্তা না চিনে তারা নিজেদের ইচ্ছামতো বাইক চালান। যাত্রী এ ক্ষেত্রে কোনো পরামর্শ দিলে তার সঙ্গে অসদাচরণ করেন। নারী যাত্রীদের সঙ্গেও খারাপ আচরণের অভিযোগ রয়েছে অ্যাপসভিত্তিক মোটরসাইকেল চালকদের বিরুদ্ধে। দুঃখের বিষয় এসব অভিযোগ সেবা প্রদানকারী সংস্থাটির কল সেন্টারে জানিয়েও তেমন কোনো লাভ হয় না। সত্যি বলতে, আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হল কোনো কিছুর নীতিমালা না করেই তার অনুমোদন দিয়ে দেয়া। অ্যাপসভিত্তিক রাইড শেয়ারিংয়ের ক্ষেত্রেও সেটা হয়েছে। ফলে তা নিজেদের ইচ্ছামতো পরিচালনা করছে প্রতিষ্ঠানগুলো। নীতিমালা না থাকায় তারাও যথেচ্ছাচার করছে। হেলমেট বাধ্যতামূলক করার পর তা যেন শুভঙ্করের ফাঁকিতে পরিণত হয়েছে।

কারণ যাত্রীর জন্য নামকাওয়াস্তে একটা হেলমেট রাখা হয়, যা মানসম্মত তো নয়ই, উপরন্তু মাথাকে প্রোটেক্ট করার জন্য আদৌ উপযুক্ত নয়। পুলিশের কেস খাওয়া এড়ানো আর গাড়িতে তেল নেয়াই যেন এর মূল উদ্দেশ্য! যাত্রীর সেবা দেয়া উদ্দেশ্য নয়। এখন প্রশ্ন হল, এ থেকে উত্তরণের উপায় কী? বাস্তবতা হল এমন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ একেবারে কঠিন নয়। কারণ এ সিস্টেম যে কেবল বাংলাদেশে আছে তা নয়, পৃথিবীর অনেক দেশেই রয়েছে। তাই এ ক্ষেত্রেও সেই মডেল অনুসরণ করা যেতে পারে।

তবে সবার আগে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রথমে নিশ্চিত করতে হবে একটি যথাযথ নীতিমালা। এরপর অবশ্যই বাইকার ও ড্রাইভারদের ড্রাইভিং ও নেভিগেশনে পারদর্শিতার ওপর যথাযথ প্রশিক্ষণ দিয়ে তবেই তাদের অ্যাপস রাইড শেয়ারিংয়ের লাইসেন্স প্রদানের মাধ্যমে রাস্তায় নামার অনুমতি দিতে হবে। তাদেরকে গাড়ি ও বাইক চালানোর সময়সীমা বেঁধে দেয়া এবং চুক্তিভিত্তিক চালানো বন্ধ করার ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি সার্ভিস মনিটরিংয়ের বিষয়েও মনোযোগী হতে হবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে।

সাহাদাৎ রানা : সাংবাদিক

ন/ক/র