• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ১৯শে নভেম্বর, ২০১৯ ইং | ৪ঠা অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | ২১শে রবিউল-আউয়াল, ১৪৪১ হিজরী

বিকাল ৪:১০

যেভাবে রোহিঙ্গাদের নেতা হয়ে উঠেছেন ‘মুহিবুল্লাহ’


নিজস্ব প্রতিবেদক : রোহিঙ্গা ইস্যুতে বর্তমানে আলোচিত একটি নাম মুহিবুল্লাহ। রোহিঙ্গাদের যত সংগঠন ও নেতা রয়েছেন এদের সবাইকে ছাপিয়ে গেছে মুহিবুল্লাহ ও তার সংগঠন আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যানরাইটস। ইউএনএইচসিআরের কক্সবাজার অঞ্চলে নিয়োজিত কিছু কর্মকর্তার সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক থাকা মুহিবুল্লাহ এখন উখিয়া-টেকনাফের ৩২ রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরের একচ্ছত্র আধিপত্য নিয়ে আছেন।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র গিয়ে সাক্ষাৎ করে আসার পর প্রত্যাবাসন কর্মসূচি প্রায় এককভাবে ঠেকিয়ে দিয়ে মুহিবুল্লাহ বিদেশি এনজিওগুলোকেও তার হাতের মু’ঠিতে নিয়ে নিয়েছেন। পরে লাখো রোহিঙ্গার সমাবেশ ঘটিয়ে আলোচনার তুঙ্গে এনেছেন নিজেকে।

সবার প্রশ্ন- কে এই মুহিবুল্লাহ? কীভাবে তিনি হঠাৎ ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গার এত বড় নেতা হয়ে গেলেন? জানা যায়, গত আগস্টের প্রথম সপ্তাহে রোহিঙ্গা ক্যা’ম্পে হঠাৎ করেই খবর আসে ২২ আগস্ট প্রত্যাবাসের দিনক্ষণ ঠিক করেছে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার।

বিদেশি বার্তা সংস্থা রয়টার্সের মিয়ানমার থেকে প্রকাশ করা এই খবরে শুধু উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যা’ম্পগুলোয় নয়, কক্সবাজার শহরে থাকা বিদেশি এনজিওগুলোর মধ্যেও তো’লপাড় সৃষ্টি হয়। কারণ, তখন পর্যন্ত কক্সবাজারে অবস্থান করা কেউই এই দিনক্ষণের কথা জানতেন না। কারণ, মিয়ানমার থেকেই পুরোপুরি এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। বার্তা সংস্থার খবর প্রকাশের পরপরই তৎপর হয়ে ওঠে এনজিওগুলো। যোগাযোগ শুরু হয় আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যানরাইটসের নেতা মহিবুল্লাহর সঙ্গে। ইংরেজিতে দক্ষ মহিবুল্লাহর সেদিন থেকেই একদণ্ড অবসর নেই।

রোহিঙ্গাদের বক্তব্য জানার চেষ্টা থেকেই ম’দদ পায় মুহিবুল্লাহর সংগঠন এআরএসপিএইচ। ইংরেজি ভাষা ও রোহিঙ্গাদের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগে দক্ষ মুহিবুল্লাহ ধীরে ধীরে প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠেন বিদেশিদের। ২০১৮-এর জুলাইয়ে র‌্যাব একবার মুহিবুল্লাহকে আ’টক করে উখিয়া থানায় নিয়ে যায়। কিন্তু প্রশাসনের নির্দেশে কোনো প্রকার রেকর্ড ছাড়াই তাকে থানা থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এরপর গত এক বছরে জাতিসংঘ মহাসচিবসহ যত বিদেশি প্রতিনিধি রোহিঙ্গা ক্যা’ম্পে গেছেন তাদের প্রত্যেকের সঙ্গেই রোহিঙ্গা প্রতিনিধি হিসেবে মুহিবুল্লাহ ও তার সঙ্গীদের সাক্ষাৎ করানো হয়েছে।

এই মুহিবুল্লাহই মিয়ানমারের পররাষ্ট্র সচিবকে রোহিঙ্গা ক্যা’ম্পে সংলাপের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। গত জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ১৭ দেশের যে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ২৭ প্রতিনিধি সাক্ষাৎ করেন সেখানেও যোগ দেন মুহিবুল্লাহ। যুক্তরাষ্ট্রে এ সফর ও এর আগে একাধিক দফায় মধ্যপ্রাচ্য সফর করলেও মহাসমাবেশের আগে মুহ্বিুল্লাহর বিদেশযাত্রা নিয়ে তেমন কোনো আলোচনা হয়নি। মহাসমাবেশের পর সমা’লোচনা হলে কক্সবাজার প্রশাসনের সূত্রগুলো জানায়, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত আডটপাসের ওপর ভিসা ইস্যু করে নিজ দায়িত্বে সফর আয়োজন করে যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্য দেশগুলো। পরে ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও তার এক্সিটপাসে বিদেশযাত্রার বিষয়টি নিশ্চিত করে।

প্রশ্ন ওঠে, মাত্র কয়েক ঘণ্টার প্রস্তুতিতে কীভাবে এত বড় মহাসমাবেশের আয়োজন করলেন মুহিবুল্লাহ ও তার সংগঠন। এর উত্তরে মুহিবুল্লাহ জানান, বিভিন্ন ক্যা’ম্পে তার সংগঠনের দুই হাজার নেতা-কর্মীকে মোবাইল ফোনে নির্দেশনা পৌঁছে দেওয়া হয়। এরপর কর্মীরা ঘরে ঘরে গিয়ে মহাসমাবেশে উপস্থিত হওয়ার কথা জানান। এ কারণেই দুর্গ’ম ও দীর্ঘ পথ পার হয়ে আশ্রিত রোহিঙ্গারা যথাসময়ে সমাবেশস্থলে উপস্থিত হয়েছেন বলে দাবি মুহিবুল্লাহর।

কিন্তু রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর বিভিন্ন সূত্রের দাবি, একসময় স’শস্ত্র আন্দোলনে সম্পৃক্ত থাকায় এখন পর্যন্ত রোহিঙ্গা ক্যা’ম্পগুলোয় যত ক্যা’ডার আ’শ্রয় নিয়েছেন তার প্রত্যেকেই মুহিবুল্লাহর সঙ্গে যোগাযোগ র’ক্ষা করে চলেন। তাদের নিয়েই ক্যা’ম্পে গোপ’নের রাজনৈতিক সংগঠনের তৎপরতা চালানো হয়। বিকাল ৪টার পর থেকে সক্রিয় হয়ে ওঠা স’শস্ত্র সন্ত্রা’সীরা রাতে অবা’ধে চলাচল করে এবং অ’ত্যাচার-নি’র্যাতন চালাতে থাকে। তাদের ভয়ে স’ন্ত্রস্ত থাকেন সাধারণ রোহিঙ্গারা। এ কারণে বেশির ভাগ সাধারণ রোহিঙ্গাই রাত ৮টার পর দরজা-জানালা ব’ন্ধ করে ক্যা’ম্পের ঘরের মধ্যেই থাকেন। কিন্তু ক্যা’ম্পগুলোয় হৈ-হ’ট্টগোল থাকে প্রতি রাতেই।

স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি, ক্যা’ম্পগুলোয় মুহিবুল্লাহবিরোধী অন্য একটি স’শস্ত্র গ্রুপও সক্রিয় রয়েছে। কিন্তু তারা সংখ্যায় কম, আর্থিকভাবে দুর্বল ও অ’স্ত্রশস্ত্রও তেমন নেই। এ কারণে মুহিবুল্লাহ গ্রুপের সমর্থিত ক্যাডাররা তাদের ‘কাফির’ বা বিশ্বাসঘা’তক অভিহিত করে হ’ত্যা করেছে। এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ৩২ জন ‘মোনাফেক’ হ’ত্যার স্বীকার হয়েছেন এদের হাতে। সূূত্রের খবর, আরেক পক্ষ থেকে মোনাফেক দাবি করে হ’ত্যার বাইরে আরও কমপক্ষে ১০ রোহিঙ্গা হ’ত্যার শিকার হয়েছে প্রভাবশালী গ্রুপটির কথার অবাধ্য হওয়ায়।

সাধারণ রোহিঙ্গাদের মধ্যে শিক্ষিতদের তিনজন প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার পক্ষে কথা বলতে গিয়ে খু’ন হয়েছেন। তবে এটা গত বছরের ৫ নভেম্বরের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার আগে। এমনকি প্রভাবশালী গ্রুপটি নিজেদের আধিপ’ত্য বিস্তার করতে খু’নের বাইরেও হু’মকি-নি’র্যাতন চালায় হামেশায়। এমনকি বিদেশি এনজিগুলোর সাহায্য-সহযোগিতা বিতরণ প্রক্রিয়ার ওপর নি’য়ন্ত্রণ থাকা গোষ্ঠীটি ত্রাণও ব’ন্ধ রাখে বিরোধি’তাকারী পরিবারগুলোর।

জানা যায়, গোপনে স’শস্ত্র গ্রুপটি পরিচালনা করা হলেও প্রকাশ্যে থাকে আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যানরাইটস। তাই তাদের কোনো কথার অবাধ্য হতে চায় না বা পারে না সাধারণ কোনো রোাহিঙ্গাই।