• ঢাকা
  • বুধবার, ২৩শে অক্টোবর, ২০১৯ ইং | ৮ই কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | ২৩শে সফর, ১৪৪১ হিজরী

সন্ধ্যা ৭:২৪

ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে ডেঙ্গু, ২১ দিনে সাড়ে ৪ হাজার হাসপাতালে ভর্তি


তরিক শিবলী

রাজধানী ঢাকায় ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়েই চলেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে মোট ২ হাজার ১১১ জন রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। কিন্তু চলতি মাসের গত ২১ দিনেই ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪ হাজার ৪৩৩ জন।
মারাত্মক রূপ ধারণ করেছে ডেঙ্গু। রোগের প্রাদুর্ভাব এবার অন্য বছরের তুলনায় অনেক বেশি। একই সঙ্গে পাল্টে গেছে রোগের ধরন। ডেঙ্গু শনাক্ত হওয়ার পরও রোগীর শরীরে থাকা জীবাণুর ধরন বুঝতে সময় লাগছে চিকিৎসকদের। ততক্ষণে রোগীর শরীরে থাকা ডেঙ্গুর জীবাণু দ্রুত আরেক রূপ ধারণ করছে। কিছু বুঝে উঠার আগেই আঘাত হানছে রোগীর ব্রেইন, হার্ট ও লিভারে। দ্রুত মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে আক্রান্তকে।
এবার ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত রোগীর মধ্যে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বেশি। জ্বরের মাত্রা কম, দৃশ্যমান র্যা শ বা দাগ না হওয়া এমনকি শরীরে পর্যাপ্ত ব্যথা না হওয়ায় অনেকেই বুঝতে পারছেন না যে তিনি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত কি না। হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যাওয়া অনেক রোগীর লক্ষণের সঙ্গে পূর্বের লক্ষণের মিল না থাকায় চিকিৎসকদের মধ্যেও সন্দেহ সৃষ্টি হচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর রাজধানীতে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত যারা হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণ করছেন তাদের তথ্য সংগ্রহ করে এই তথ্য দিয়েছে। রাজধানীর সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে ৪৭টি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান থেকে এই তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের জনসংখ্যার ৫০ ভাগ সাধারণ ও মারাত্মক ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন। এখন বছরে মারাত্মক ডেঙ্গুজ্বরে কমপক্ষে ৫ লাখ মানুষ আক্রান্ত হন। প্রতি মিনিটেই বিশ্বের কোথাও না কোথাও কেউ না কেউ ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। তাদের অধিকাংশই শিশু।
বছরে ২২ হাজার ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুসারে, গত জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত মালয়েশিয়ায় ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্তের সংখ্যা ৪৬ হাজার, মৃত্যু ৭৪ জন। একই সময়ে ফিলিপাইনে আক্রান্ত ৭২ হাজার, মৃত্যু ৩০৩ জন, সিঙ্গাপুরে আক্রান্ত ৩ হাজার ২৩৩ জন, ভিয়েতনামে আক্রান্ত ৬০ হাজার, মৃত্যু ৪ জন।
এদিকে ঢাকায় স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার অ্যান্ড কন্ট্রোল রুমের তথ্যে দেখা যাচ্ছে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গত ১৭ দিনে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্তের সংখ্যা ৩ হাজার ৮১ জন, মৃত্যু ৫ জন।

তবে মৃতের প্রকৃত সংখ্যা সম্পর্কে এখনই নিশ্চিত নয় সংশ্লিষ্টরা। তাছাড়া অধিদফতর থেকে শক সিনড্রোম বা হেমোরেজিক ফিবারে আক্রান্তের কোনো তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে না।

অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোলরুমের তথ্যানুযায়ী, রাজধানীতে গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২৮৫ জন। গত ১ থেকে ২১ জুলাই পর্যন্ত মাত্র তিন সপ্তাহে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪ হাজার ৪৩৩ জন।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসা হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত শনিবার এই হাসপাতালে ৩৬৯ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি ছিল। জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ঢাকা মেডিকেল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৪৬৯ জন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের সাবেক ডিন অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ বলেন, সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে এখন অনেক ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসার জন্য ভর্তি হচ্ছেন। আমরা প্রাইভেট চেম্বারেও ডেঙ্গু রোগী পাচ্ছি। যেসব রোগীর প্লাটিলেট ১ লাখের নিচে তাদের হাসপাতালে ভর্তি পরামর্শ দেওয়া হয়। আর যাদের প্লাটিলেট ১ লাখের বেশি তাদের ২৪ ঘণ্টা বা দুইদিন পর রক্ত পরীক্ষা করে প্লাটিলেট দেখার পরামর্শসহ প্রেসক্রাইব দিয়ে বাসায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

অধ্যাপক ডা. আবদুল্লাহ বলেন, এখন জ্বর হলেই ডেঙ্গুর বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। কারণ কোনো রোগীর প্লাটিলেট ১ লাখের নিচে এলে তাকে ডেঙ্গু হেমরেজিক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ডেঙ্গু হেমরেজিক হলে বাহ্যিক বা অভ্যন্তরীণ (মাড়ি, নাক অথবা মলের সঙ্গে) রক্তক্ষরণ শুরু হয়। মল ও প্রস্রাবের সঙ্গে রক্ত গেলে সেটি রোগী হয়তো বুঝতে পারে না। অধিক রক্তক্ষরণের ফলে অনেক রোগী শক সিনড্রোমে চলে যায়। এতে রোগীর শরীরের জলীয় উপাদান কমে যায়, রোগীর পালস পাওয়া যায় না, লিভার, কিডনি, ব্রেনসহ বিভিন্ন অঙ্গ আক্রান্ত হয়। একপর্যায়ে রোগীর হার্টফেইলিওর, ব্রেন হেমারেজ, কিডনি বিকল হয়ে যায়। ডেঙ্গু শক সিনড্রোম হলে রোগীর মৃত্যুও হতে পারে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, কেউ জ্বরে আক্রান্ত হলে ২ থেকে ৩ দিনের মধ্যে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে এবং পরীক্ষা করতে হবে। কোনোভাবেই দেরি করা যাবে না। অনেক রোগী আছেন এক হাসপাতালে ভর্তি হয়ে আরেক হাসপাতালে যাচ্ছেন ভর্তির জন্য, এটি বন্ধ করতে হবে। ডেঙ্গুজ্বর নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। এতে আক্রান্তদের চিকিৎসা প্রদানে আমাদের প্রস্তুতি রয়েছে।