• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ৯ই এপ্রিল, ২০২০ ইং | ২৬শে চৈত্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | ১৪ই শাবান, ১৪৪১ হিজরী

ভোর ৫:৫৭

বোনাসের নামে শেয়ারবাজার ব্যাংক পরিচালকরা লুটেছেন


শুধু ব্যাংক থেকে বেপরোয়া ঋণ নয়, শেয়ারবাজার থেকেও টাকা লুটে নিয়েছেন ব্যাংক মালিকরা (পরিচালক)। বাস্তবে মুনাফা না করলেও বেশকিছু ব্যাংক কাগজে-কলমে মুনাফা দেখিয়েছে। এরপর এ মুনাফার বিপরীতে বোনাস শেয়ার ঘোষণা করে ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন বাড়ানো হয়েছে।

পরবর্তীতে এসব শেয়ার বিক্রি করে টাকা লুট করা হয়েছে। অর্থাৎ বোনাস শেয়ার দিয়ে বাজার থেকে টাকা লুটেছেন ব্যাংক মালিকরা। অর্থনীতিবিদ ও বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বোনাস শেয়ার বিক্রিতে আপাতত আইনগত কোনো বাধা নেই।

তবে কোম্পানির উদ্যোক্তাদের এভাবে ঢালাওভাবে শেয়ার বিক্রি বাজারের তারল্য সংকটের অন্যতম কারণ। বোনাস শেয়ার ঘোষণা কোম্পানির বড় ধরনের একটি ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’। ফলে উদ্যোক্তাদের বোনাস শেয়ার বিক্রির বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করা উচিত বলে মন্তব্য করেন তারা।

জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম রোববার বলেন, ব্যাংকগুলোতে অনেক সমস্যা রয়েছে। শুধু রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক নয়, বেসরকারি ব্যাংকের অবস্থা আরও খারাপ। সামগ্রিকভাবে যা বাজারকে প্রভাবিত করেছে।

তিনি বলেন, বোনাস দিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান মূলধন বাড়ায়। এ মূলধন কাজে লাগাতে না পারলে কোম্পানির আয় বাড়ে না। উল্টো আরও দায় সৃষ্টি হয়। কোম্পানিগুলোকে নগদ লভ্যাংশ দিতে উৎসাহিত করা উচিত।

তিনি আরও বলেন, বোনাস শেয়ার বিক্রিতে আইনগত কোনো বাধা নেই কিন্তু ঢালাওভাবে পরিচালকরা শেয়ার বিক্রি করলে বাজারে তারল্য সংকট সৃষ্টি হয়।

বতর্মানে বাজারে তালিকাভুক্ত ৩০টি ব্যাংকের মধ্যে গত বছর ২৪টি ব্যাংকই বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ হিসেবে বোনাস শেয়ার দিয়েছে। এরপর অধিকাংশ ব্যাংকই বোনাস শেয়ার বিক্রি করে বাজার থেকে টাকা নিয়েছে।

ডিএসইর তথ্য অনুসারে মূলধনের বিবেচনায় বাজারে সবচেয়ে বড় কোম্পানি ন্যাশনাল ব্যাংক। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির মোট পরিশোধিত মূলধন ২ হাজার ৯২০ কোটি টাকা। শুরুতে এই ব্যাংকের মোট পরিশোধিত মূলধন ছিল ৮ কোটি টাকা। ২০১০ সালে বাজারে বড় দুর্যোগের আগে তা ৪৪১ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে।

ওই সময় ব্যাংকটির ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের প্রতিটি শেয়ারের দাম ছিল ২০১ টাকা। এরপর ধারাবাহিকভাবে বোনাস শেয়ার দিয়ে মূলধন ২ হাজার ৯২০ কোটি টাকায় নিয়ে আসা হয়েছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির লভ্যাংশ দেয়ার হার কমেছে। ১০ শতাংশ লভ্যাংশ দিতেও ২৯২ কোটি টাকা লাগে। এ কারণে প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারের দাম কমছে। বর্তমানে প্রতিটি শেয়ারের দাম ৬ টাকায় নেমে এসেছে।

একইভাবে নজিরবিহীনভাবে কমেছে অন্যান্য ব্যাংকের শেয়ারের দামও। এর মধ্যে ২০১০ সালের তুলনায় এবি ব্যাংকের শেয়ারের দাম ১৮১ টাকা থেকে ৭ টাকায়, সিটি ব্যাংক ১১৫ থেকে ১৬, ইসলামী ৯০ থেকে ১৬, পূবালী ১২২ থেকে ২০, রূপালী ২১৭ থেকে ২৫, উত্তরা ৩৫২ থেকে ২৩, আইসিবি ইসলামী ব্যাংক ২৪ থেকে ১, ইস্টার্ন ব্যাংক ১৮৮ থেকে ৩১, আল আরাফা ১১০ থেকে ১৪, প্রাইম ৯৯ থেকে ১৪, সাউথ ইস্ট ৭১ থেকে ১১, ঢাকা ব্যাংক ৮৬ থেকে ৯, এনসিসি ৮৪ থেকে ১১, সোস্যাল ইসলামী ৫৬ থেকে ১১, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক ৪৫০ থেকে ৫৮, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ৮২ থেকে ২৩, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক ৯২ থেকে ২৩, ব্যাংক এশিয়া ১২২ থেকে ১৬, মার্কেন্টাইল ব্যাংক ৬৮ থেকে ১০, এক্সিম ব্যাংক ৯০ থেকে ৮, ব্র্যাক ব্যাংক ১০০ থেকে ৩২, শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক ৯৬ থেকে ১৯, প্রিমিয়ার ব্যাংক ৭৪ থেকে ১০ এবং ফাস্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ৫১ থেকে ৮ টাকায় নেমে এসেছে।

এ ব্যাপারে ডিএসইর পরিচালক মো. রকিবুর রহমান বলেন, বর্তমানে বাজারের সবচেয়ে বড় খাত ব্যাংক ও ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান। এ খাতের অবস্থান মোট মূলধনের ২৭ শতাংশ। কিন্তু বর্তমানে খাত দুটির অবস্থা অত্যন্ত খারাপ; যা ইতিমধ্যে বিভিন্ন রিপোর্টে প্রকাশ হয়েছে।

তিনি বলেন, সংসদে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ব্যাংকের পরিচালকরা পৌনে ২ লাখ কোটি টাকার ঋণ নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নিয়েছেন। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে নামে-বেনামে এসব টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন তারা।

রকিবুর রহমান বলেন, শুধু আমানতকারীদের টাকাই নয়, এরপর শেয়ারবাজারে বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার বিক্রি করে টাকা নিয়েছেন এই পরিচালকরা। আইন পরিবর্তন করে দীর্ঘদিন তাদের পরিচালক পদে থাকার সুযোগ দেয়া হয়েছে। কিন্তু বাজারের চরম পতন হলেও তারা শেয়ার কিনছেন না। এটি আমাদের জন্য দুর্ভাগ্য।আরও পড়ুন