• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ২২শে অক্টোবর, ২০১৯ ইং | ৭ই কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | ২১শে সফর, ১৪৪১ হিজরী

রাত ৪:৩২

বিতর্ক পিছু ছাড়ছে না ভিসিদের


বরিশালে উত্তাল আন্দোলন, শাহজালালের ভিসি দলীয় জনসভায় বসে থাকেন, উন্মুক্তে ছেলের নিয়োগের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় আইন পরিবর্তন, রাজশাহীতে জামাইকে নিয়োগে কেলেঙ্কারি, রোকেয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়েই থাকেন না ভিসি, কুমিল্লায় নৌকায় ভোট চেয়ে ভিডিও বার্তা, দীপু মনির নামফলক ভেঙে ফেলেন ভাসানীর ভিসি
জুলকার নাইন ও আকতারুজ্জামান;
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভাইস চ্যান্সেলরদের কেউ হলেন জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য, আবার কেউ যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য। কেউ কেউ অতি আওয়ামী লীগার হতে গিয়ে সর্বনাশ করে ছাড়ছেন। এতে শুধু তাদের মর্যাদাই ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে না, সমস্যা তৈরি হচ্ছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও। ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষার পরিবেশ। ব্যক্তি ও দলীয় স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। এ অবস্থায় খোদ উৎকণ্ঠায় বিশিষ্ট শিক্ষাবিদরা। সর্বশেষ ভিসি ড. এস এম ইমামুল হকের কারণেই সপ্তাহব্যাপী আন্দোলনে উত্তাল ছিল বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়। বন্ধ ছিল সব ধরনের ক্লাস পরীক্ষা। কারণ গত ২৬ মার্চ তিনি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের রাজাকারের বাচ্চা বলেছিলেন। পরে ভিসির পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনে নামে ছাত্র-ছাত্রীরা। বন্ধ হয়ে যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম। শেষে এক সপ্তাহ পর ভিসি আর বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবেন না শিক্ষার্থীদের এমন শর্তে তাকে ছুটি দিয়ে আজ চালু হচ্ছে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়।

গত মাসে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. এম রোস্তম আলীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে পদত্যাগ করেন সেখানকার প্রো-ভিসি মো. আনোয়ারুল ইসলাম। সকালে এক সিদ্ধান্ত নিয়ে বিকালে সেটি পাল্টানো অধ্যাপক ড. এম রোস্তম আলী তার সরকারি বাংলোকে রেস্ট হাউস হিসেবে মাসিক তিন হাজার ৮০০ টাকায় ভাড়া দেখিয়েছেন। দুর্নীতির দায়ে চাকরিচ্যুত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশলী আবদুর রহিমকে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন এই ভিসি। এ ছাড়া রসায়ন বিভাগে একজনকে লক্ষাধিক টাকা বেতনে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন তিনি। তার বিরুদ্ধেও আন্দোলনে নেমেছিল ছাত্ররা।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক এম আবদুস সোবহান মেয়ে ও মেয়ে জামাইকে নিয়োগ দিতে নিয়োগ নীতিমালা পরিবর্তন করেছেন। নীতিমালায় প্রার্থীর যোগ্যতা শিথিল করা হয়েছে। ফলে প্রভাষক হিসেবে ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগে উপাচার্যের মেয়ে সানজানা সোবহান ও আইবিএতে মেয়েজামাই এ টি এম শাহেদ পারভেজ নিয়োগ পেয়েছেন। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে প্রার্থীর ন্যূনতম যোগ্যতা সিজিপিএ ৩ দশমিক ৫ এবং একাডেমিক ফল প্রথম সাতজনের মধ্যে থাকার কথা। ভিসি আবদুস সোবহান তার দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতেই সিন্ডিকেট সভায় শিক্ষক নিয়োগে যোগ্যতা শিথিল করেন। ব্যাচে প্রথম সাতজনের মধ্যে থাকার বাধ্যবাধকতা তুলে দিয়ে ন্যূনতম যোগ্যতা নির্ধারণ করেন ৩ দশমিক ২৫।
বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাউবি) ভিসি অধ্যাপক ড. এম এ মাননান তার ছেলে জাহেদ মাননানকে নিয়োগ দিতে দফায় দফায় নিয়োগ বিধিমালা পরিবর্তন করেছেন। বাউবিতে সহকারী অধ্যাপক পদে আবেদন করলে নির্ধারিত যোগ্যতা না থাকায় বাতিল হয় জাহেদের আবেদন। কিন্তু বছরখানেক পর জাহেদ বাগিয়ে নিয়েছেন ওপেন স্কুলে সহযোগী অধ্যাপকের চাকরি! এমন অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন উপাচার্য পিতা অধ্যাপক ড. এম এ মাননান। ছেলেকে নিয়োগ দিতে তিনি দফায় দফায় সংশোধন করেছেন নিয়োগবিধি, শিথিল করেছেন যোগ্যতা।

রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযোগ ক্যাম্পাসে ধারাবাহিকভাবে অনুপস্থিতির। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক সূত্র মতে, তিনি ২০১৭ সালের ১৪ জুন এই বিশ^বিদ্যালয়ে উপাচার্য হিসেবে যোগদান করে গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৬২৩ দিনের মধ্যে ঢাকাতেই থেকেছেন ৪৭৮ দিন। অথচ ভিসি হিসেবে নিয়োগের শর্তাবলিতে সার্বক্ষণিক ক্যাম্পাসে থাকার কথা বলা হয়েছিল। ভিসি কলিমউল্লাহ ধারাবাহিকভাবে এই শর্ত লঙ্ঘন করছেন। কোনো কোনো দিন তিনি সকালের ফ্লাইটে ক্যাম্পাসে এসে ২-৩ ঘণ্টা অবস্থান করে ওইদিনই বিকালের ফ্লাইটে ক্যাম্পাস ত্যাগ করেছেন। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভেঙে পড়েছে চেইন অব কমান্ড।

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি ড. মো. আলাউদ্দিনের কা আরেক রকম। ২০১২ সালের ১৮ মার্চ ‘প্রত্যয় ৭১’ নামে ভাস্কর্য ও মুক্তমঞ্চের উদ্বোধন করেছিলেন তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি। ২০১৪ সালে দীপু মনি আর মন্ত্রীত্ব পাননি। তাই ভিসি ড. মো. আলাউদ্দিন উপাচার্য হিসেবে ডা. দীপু মনির নামফলক ভেঙে ফেলেন। কিন্তু এবার ডা. দীপু মনি শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ায় ভিসি ড. মো. আলাউদ্দিন আবার ডা. দীপু মনির নামফলক পুনরায় স্থাপন করেন। বিষয়টি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে বয়ে যায় হাস্যরসের। অবশ্য ভিসি আলাউদ্দিনের বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগও প্রচুর।

জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশের একটি ধারায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা বা কর্মচারীদের রাজনৈতিক মতামত প্রচার ও রাজনৈতিক সংগঠনে জড়িত হতে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কিন্তু সর্বশেষ সিলেট সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থী বদরউদ্দিন আহমদ কামরানের পক্ষে সিলেট শহরের আম্বরখানা এলাকার একটি রেস্তোরাঁয় নৌকা মার্কার সমর্থনে ভোট চান শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. ফরিদউদ্দিন। একই চিত্র দেখা গেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান আওয়ামী লীগ প্রার্থীর পক্ষে নেমেছিলেন নির্বাচনী প্রচারণায়। জাতীয় নির্বাচনে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ড. এমরান কবির চৌধুরী একাধিক ভিডিও বার্তার মাধ্যমে ভোট চেয়েছেন। এসব বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. ছিদ্দিকুর রহমান গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি যদি রাজনৈতিক কর্মীর মতো আচরণ করেন তাকে যোগ্য ভিসি বলা যাবে না। যিনি ক্লাসে শিক্ষাদান করবেন, শিক্ষা প্রশাসনে দায়িত্ব পালন করবেন তাকে দল-মতের ঊর্ধ্বে থাকতে হবে। তা না হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লেখাপড়ার মান বিনষ্ট হবে। তিনি বলেন, শিক্ষকদের নিরপেক্ষ থাকাই ভালো। কারণ অন্য মতাদর্শের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তারা সমান আচরণ করতে পারবেন না। কোনো শিক্ষক কোনো রাজনীতির মতাদর্শের হলেও সেই প্রভাব যেন ক্লাসে না পড়ে। তাহলে অন্য মতের শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।