• ঢাকা
  • সোমবার, ৬ই জুলাই, ২০২০ ইং | ২২শে আষাঢ়, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ | ১৪ই জিলক্বদ, ১৪৪১ হিজরী

সকাল ৭:৩০

বাউফলের তৈরি মৃৎশিল্প দেশ পেড়িয়ে বিদেশে


মো:ফিরোজ,বাউফল (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি: পটুয়াখালী জেলার বাউফল উপজেলার যে কোন পাল পাড়ায় ঢুকলেই দেখা যায়, মাটির শিল্প তৈরিতে নারী -পুরুষরা সারাক্ষণ কর্ম ব্যস্ত। দিন মজুরীতেও বহু নারী-পুরুষ কাজ করছে। পালপাড়ার এ কর্ম ব্যস্ততা দেখে মনে হয় তারা পূর্ব পুরুষের হারানো পেশাকে আবার সগৌরবে ফিরে পেয়েছে। উপজেলার মদনপুরা বিলবিলাস , কনকদিয়া , বগা, ও রাজনাগর এলাকায় ৫ শতাধিক পরিবার মৃৎ শিল্প পেশার সাথে জড়িত ছিল। বিশেষ করে ওই সময় মদনপুরার পাল পাড়াকে মৃৎশিল্প নগরী বলা হত। তখন দেশের মৃৎশিল্পের চাহিদার একটি বিরাট অংশ অত্র এলাকা থেকে মিটানা হত। সে সময় পালেরা গার্হস্থ্য জীবনের নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী যেমন হাড়ি, পাতিল, কলস , থালা, বাসন , জলকান্দা জালের কাঠি ইত্যাদি তৈরি করত।

কিন্তু এলোমুনিয়াম, ষ্টিল, টিন , প্লাস্টিকও মেলামাইন সামগ্রী বাজার দখল করে নেয়ায় মাটির তৈরি জিনিস পত্র বিলুপ্তির পথে ধাবিত হতে থাকে। বিশেষ করে স্বাধীনতার পর মাটির শিল্প একেবারেই অবহেলিত অবস্থায় পড়েছিল। ফলে বহু পাল পরিবার তাদের পৈত্রিক পেশা ছেড়ে দিয়ে অন্য পেশায় চলে যায় । আবার অনেকে ভারতেও চলে যায়। এ অবস্থায় থেকে কিভাবে বর্তমানে পালদের জীবনের মোড় ঘুরেছে, এ প্রসঙ্গে জানতে চাওয়া হলে এখানকার প্রবীণ মৃৎ শিল্পী বিশ্বেশ্বর পাল( ৫৭) জানান, ৭০ দশকের শেষ দিকে সাবেক প্রেসিডেন্ট জিউর রহমান বাউফলে সফর কালে মৃৎশিল্পের ছোট একটি মেলা পরিদর্শন করে মুগ্ধ হন। ওই সময় এ জাতীয় মেলা ঢাকায় করার পরামর্শ দেন তিনি । সারা দেশের পালদের সংগঠিত করতে বেশ কিছু সময় লেগে যায়। ৮৪ সালে শিশু একাডেমী প্রাঙ্গনে মৃৎশিল্পের প্রথম মেলা বসে।

ওই মেলায় বাউফলের মৃৎ শিল্পীদের তৈরি একটি ষ্টল স্থান পায়। এরপর মৃৎশিল্পকে রক্ষায় এগিয়ে আসে চারুও কারু কলা ইনষ্টিটিউটের কিছু উদ্যোগী ছাত্র এবং বিসিক । বিদেশী ক্যাটালগ দেখে সময়োপযোগী করে নতুন ডাইস, রং বার্নিসে মৃৎশিল্পের আকার ও সাজ শোভা পরিবর্তন করা হয়। এর পর তাদের আর পিছনের দিকে তাকাতে হয়নি। ক্রমাগত এর চাহিদা বাড়তে থাকে । সাথে সাথে বিেেদশে রপ্তানির বাজার সৃষ্টি হয়। তাদের পৈত্রিক পেশা যখন বিলুপ্তির পথে তখন তারা কোন উপয়ান্তর না পেয়ে মাটির দ্বারা ফুলের টব, খেলনা, এবং বিভিন্ন জীব জানোয়ারের ছবি, মণীষীদের ছবি বানিয়ে বৈশাখী মেলায় বিক্রি করত। এমনকি বরিশাল শহরে গিয়ে টাউন হলের সামনে ফটপাতে বসত। বাউফলের মৃৎশিল্পীদের সেই দুঃখ-কষ্টের জীবন এখন আর নেই । তাদের জীবন জীবিকার মোড় বদলে গেছে। তারা বর্তমান যুগের রুচি ও চাহিদা অনুযায়ী ঘর ও ঘরের ড্রইং রুম সাজানোর জন্য নিত্য নতুন ডিজাইনের বিলাস সামগ্রী তৈরি করে থাকেন। তাদের তৈরি বিলাস সামগ্রী ঢাকার আড়ং , হীডবাংলাদেশ, কোর দ্যা জুট ওয়ার্কস ও ঢাকার হ্যান্ডিক্রাফটস এ সরবরাহ করা হয়।

ওই সকল সংস্থা থেকে বিদেশে রপ্তানি করা হয়। বাউফলের মৃৎ শিল্পীরা রং ও ডিজাইন হাতে করে থাকে। তাদের রং ও ডিজাইন অপূর্ব। বাউফলের মদনপুরা, বিলবিলাস, কনকদিয়া ও বগা পালপাড়া থেকে প্রতিদিন লঞ্চ ও বাস যোগে তাদের উৎপাদিত পণ্য ঢাকায় পাঠানো হয়।আর সেখান থেকে রপ্তানি করা হচ্ছে বিদেশে। পাল পাড়ার মাটির তৈরি মৃৎশিল্প বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে থেকে নান্দনিক বৈচিত্রের শৈল্পিক সম্ভার নিয়ে এখন বিশ্ব বাজারের বিপনীতে ঠাঁই নিয়েছে। মৃৎশিল্পীদের মাটির তৈরি দৃষ্টিনন্দন বিলাস সামগ্রী ইটালি, কানাডা, অষ্ট্রোলিয়া, ফ্্রান্স, ডেনমার্ক, ইউকে, স্পেন, জাপান , ইউএস এ ও নিউজীল্যান্ডে বেশ চাহিদা থাকায় ওই সমস্ত দেশে রপ্তানি করা হয়।