• ঢাকা
  • বুধবার, ২০শে নভেম্বর, ২০১৯ ইং | ৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | ২১শে রবিউল-আউয়াল, ১৪৪১ হিজরী

রাত ২:২৮

ফেসবুক আইডি।। সায়ন্তী লিমা


০১

এখন আমার বয়স ৮০ বছরের উপরে হবে, ঠিকমতো চোখে দেখিনা। সপ্তাহ খানেক আগে হাসপাতালে ছিলাম নয়দিন। বয়স হয়ে গেছে একটার পর একটা অসুখ লেগেই থাকে। ডাক্তার জানিয়েছে কিডনিতে একটু সমস্যার কথা। তার উপর ডায়াবেটিকস। বেশ ভালোই বুঝতে পারছি আর বেশিদিন বাঁচব না। ছেলে আর ছেলের বউয়েরাই জানে আমার কী হয়েছে ওদের ডাক্তার খুব ভালো করেই বলে দিয়েছে হয়ত, যে আমি আর বেশিদিন বাঁচব না। আর এই কারনেই ইদানীং সবাই আমার খুব যত্ন নেয়, কেউ কেউ আবার দুঃখী দুঃখী মুখ করে আমার দিকে তাকায়, যারা তাকায় তারা হয়তো একটু বেশিই ভালোবাসে আমায় এই যেমন আমার ছোট ছেলেটা, হাসপাতাল থেকে ফিরে থেকেই ওর চোখ-মুখ ঠিক লাগছেনা আমার কাছে। আমার দিকে ভালো করে তাকাতে পারে না কিন্তু আমি ওর চোখের দিকে হাসপাতাল থেকে ফিরে থেকেই খেয়াল করছি। ও ওর চোখের জল লুকোতে গিয়ে আমাকে একটা নজর দেখতে চেয়েও আর তাকাতে পারে না। আমার ছোট ছেলেটা আমাকে একদম চোখের আড়াল হতে দিত না।একটু দেখতে না পেলেই কেমন পাগলের মতো কাঁন্নাকাটি শুরু করে দিত ওর জন্য একটু বাথরুম গিয়েও শান্তি পেতাম না। বড্ড মায়ের পাগল ছেলেটা আমার, ছোটবেলায় ওকে যখন স্কুলে নিয়ে যেতাম, ওকে ক্লাসে বসিয়ে রেখে আমি বাইরে বসে ওর স্কুল ছুটির অপেক্ষায় থাকতাম। ওর সে কী কান্ড ক্লাসরুমের জানলা দিয়ে কতবার যে উঁকি মারত আমাকে এক নজর দেখার জন্য। ছেলেটার বিয়েটা দিয়ে যদি মরতে পারতাম তবেই নিশ্চিন্ত হতাম, কতবার বলেছি এখন পড়াশোনা শেষ করে ভালো চাকুরী করছিস। এখন বিয়েটা করে ফেল। নাহ্ তার সেই এক কথা এত তারাতারি বিয়ে করবেনা। কেনো কে জানে!!

০২

সায়নটাও আগের মতো কাছে এসে আর এটা-সেটা নিয়ে বিরক্ত করেনা। আমার সাথে হাসি-তামাশা করাটা ছেড়েই দিয়েছে ভার্সিটি থেকে ফিরে এসে আগেই আমার সাথে কত গল্প তার, কোন বান্ধবীকে আজ দেখতে কেমন লেগেছিলো কোন ম্যাডাম আজ কেমন করে সেজে এসেছিলো আগামীকাল বন্ধুদের সাথে কোথায় ঘুড়তে যাওয়ার প্লান আছে এই সবকিছু এসে আমাকে না বলা অবধি ও স্বস্তি পেত না। সেই সায়ন এখন কেমন যেনো নিশ্চুপ হয়ে গেছে, আমি না ডাকলে আর কাছে আসে না। আর আগের মতো জড়িয়ে ধরে এটা সেটা বলে না আমার দিকে সায়নটাও ভালো করে তাকাতে পারে না। সায়ন আমার বড় ছেলের একমাত্র সন্তান দু,টো মেয়ের পর সায়ন জন্ম নিয়েছে ওর মা আমাকে তেমন সহ্য করতে না পারলেও ওরা তিন ভাই-বোন আমাকে খুব ভালোবাসত। কিন্তু সায়ন একই রকম থাকলেও তিন্নি আর রিমি পাল্টে গেছে এখন। ওরা ওদের মতো ব্যস্ত।

০৩

একা বেলকনিতে চেয়ার পেতে বসে থাকতে ভালো লাগছেনা চশমাটা চোখে দিয়ে নাতি সায়নের রুমে গেলাম। আজ ছুটির দিন ও বাসায় আছে, চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালাম তারপর ধীরগতিতে সায়নের রুমে চলে গেলাম। একা একা দাঁড়াতে এখন অনেকটা কষ্ট হয়। নাতির নামটা আমিই রেখেছি আগেই বলেছি আমাকে নাতি-নাতনীদের মধ্যে সায়নই বেশি ভালোবাসে ও দেখতে অনেকটা ওর দাদুর মতই হয়েছে,ওর দাদু মারা গেছে সাত বছর গত হলো। ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত ছিলো সে। সায়ন যেদিন থেকে শুনেছে ও দেখতে ওর দাদুর মত হয়েছে সেদিন থেকে আমার প্রতি ওর ভালোবাসাটা আরো কয়েকগুন বেড়ে গিয়েছে। কখনো নতুন জামা-কাপড় পরে বাইরে যাওয়ার আগে আমার সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলত, দেখো তো দাদুর মত লাগছে কী না?? পাগল এাকটা। ওর রুমে গিয়ে দেখি ও ফেসবুক চালাচ্ছে আমাকে দেখে ও ঠোঁটের কোনে জোর করেই একটু হাসি ছড়িয়ে বলল দাদি যে বসো এখানে বসে ল্যাপটপে কিছু একটা করো অনেক বেলা হলো, আমি সকালের নাস্তাটা করে আসি, আমার দিকে না তাকিয়েই কথাগুলো কাঁপা গলায় বলল। আমি বুঝতে পারলাম সবই আমার কাছ থেকে দূরে যাওয়ার বাহানা। সায়ন যে সকালের নাস্তাটা আরো আগেই করেছে সেটা আমি দেখেছি। আমিও একটু হাসলাম এবং বললাম যাও, সায়ন দ্রুত তার রুমটা আমাকে ছেড়ে দিয়ে চলে গেলো। ল্যাপটপে সায়নের ফেসবুক লগইন করা দেখে আমারো ফেসবুক চালাতে ইচ্ছে হলো, সেই কবে ফেসবুক লগইন করেছিলাম মনে নেই। অনেক কষ্টে পাসওয়ার্ডটা মনে করে ফেসবুক লগইন করলাম। লগইন হওয়ার পরেই যা দেখতে পেলাম, আমার নাতির বয়সী কয়েকজন রিকোয়েস্ট পাঠিয়ছে কেউ কেউ আবার এস এম এস ও করেছে। এস এম এস এ লেখা… আমি সেলিব্রেটি এক্সসেপ্ট প্লিজ, আমি লাইকার এক্সসেপ্ট প্লিজ ইত্যাদি।

০৪

বন্ধু তালিকায় ঢুকে দেখি ৪৫০ জন বন্ধু এই বন্ধুগুলো বানাতে প্রায় ছয় বছর লেগেছে আর এখন নাতিরা ছয়দিনেই পাঁচ হাজার বন্ধু বানায়। দিন অনেক বদলেছে যে। চ্যাট অন করে দেখি মাত্র তেত্রিশ জন লাইনে আছে, একটাও পরিচিত না। তারপর আবার বন্ধু তালিকাতে ঢুকলাম আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধুর আইডি তে ঢুকে দেখলাম অনেকদিন হল লগইন করে না। এতদিন হাজার ব্যস্তাতার মাঝে তার কোনো খোঁজ-খবর নেয়া হয়নি। খবর নিয়ে জানতে পারলাম অনেকদিন হলো ওপারে চলে গেছে কিন্তু সযত্নে পড়ে আছে তার ফেসবুক আইডি। যে বন্ধুটি সবসময় লাইক কমেন্টস নিয়ে ব্যাস্ত থাকত তার শেষ স্টাটাসে এখনো ভালো ভালো কমেন্টস পড়ে, এসব নিয়ে পড়ে থাকার জন্য শিক্ষকদের কাছে ও অনেক বকাঝকা খেতো কারন ছাত্র ভালো হওয়া সত্ত্বেও পরীক্ষার খাতায় ভালো নম্বর তুলতে পারত না সে। অনেক বছর হলো সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে ছেলেটা। যে বান্ধবী সারাক্ষন পেজ নিয়ে ব্যস্ত থাকত শুনেছি সেও ক্যান্সারে আক্রান্ত। কে জানে!! কবে আবার তার বিদায় ঘন্টা বাজে। এখন যে বান্ধবীর কথা বলছি তার নাম রত্না খুবই সুন্দরী ছিলো, যাকে দেখলেই প্রেমে পড়ার মতো। একে তো সুন্দরী তার উপর সে খুব সাজগোজ করত, দিনে কত ছেলে যে ওর প্রেমে পড়ত তার কোনো ইয়াত্তা নেই শিক্ষকরাও এই তালিকা থেকে বাদ পরত না। রত্না এতে বেশ আনন্দই পেতো। কে জানে, সেই সুন্দর মুখাবয়বের কী হাল হয়েছে!! সুস্থ থাকলে তাকে এক নজর দেখে আসতাম। এইবার আসি আমার কথায়, যে সারাদিনই প্রায় ফেসবুকে পড়ে থাকতাম সেই আমি বর্তমানে খুবই অসুস্থ। ফেসবুকের প্রতি আর আসক্তি নাই। আগের মতো আর সাহিত্য চর্চাটা হয় না আমার সাহিত্য চর্চার কারনে দেশজুড়ে সবার ভালোবাসা পেয়েছি। শিক্ষকরা চোখ বুঝে বিশ্বাস করতেন আমাকে, মনে মনে এসব নিয়ে নিজেকে নিয়ে খুব গর্ববোধ হয়। জীবনের এই শেষ দিনগুলোতে আর সাহিত্য চর্চাটা করতে পারছিনা। নিজের অসুস্থতার সাথে লড়াই করে সময় পার করছি। ফেসবুকে চেনা অচেনা অনেকের আইডিই নষ্ট হয়ে গেছে, জানা অজানা অনেকেই মারা গেছে। কিন্তু পড়ে আছে তাদের প্রিয় ফেসবুক আইডি। সায়নের দাদুর সাথে চ্যাট করা মান অভিমানের এস এম এস গুলো দেখেই হেসে উঠলাম। সায়নের দাদু কিছু হলেই মেয়েদের কেঁদে বুক ভাসাতো বিষয়টা নিয়ে আমি খুব মজা নিতাম তাকে কথা শোনাতাম। যখনই মনে হলো সে আর ধরিত্রীর মাঝে বেঁচে নেই মুহূর্তেই গাঁ শিউরে উঠে চোখের জলে বন্যা বইতে লাগল। জীবনের শেষ সময়েও সে বেশ খানিকক্ষন কেঁদেছিলো এই ভেবে যে তার মৃত্যুর পর আমার কী হবে!!??? এইতো জীবন….! একদিন আমিও চলে যাবো পড়ে থাকবে এই স্মৃতিবিজড়িত ফেসবুক আইডি, তারপর আস্তে-আস্তে তলিয়ে যাবো। কেউ আর আগের মতো খুঁজবে না। কারোর কাছে আর বিরক্তির কারন হব না। চোখের পানি মুছে লগ আউট করলাম। এই হয়তো জীবনের শেষ ফেসবুক চালানো…..। (সমাপ্ত)

লেখিকা : আরেফিন সায়ন্তী লিমা।

ন/ক/র