• ঢাকা
  • বুধবার, ২৩শে অক্টোবর, ২০১৯ ইং | ৮ই কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | ২৩শে সফর, ১৪৪১ হিজরী

দুপুর ২:১১

প্রযুক্তির দাপটে হারিয়ে যাচ্ছে হস্তচালিত তাঁত


হাফিজুর রহমান শফিক;
ব্যাপকহারে কমে যাচ্ছে দেশের হস্তচালিত তাঁতের সংখ্যা। সেইসাথে কমেছে তাঁতির সংখ্যাও। সেই সঙ্গে এ পেশার সঙ্গে জড়িত মানুষের সংখ্যাও কমেছে। তারা প্রযুক্তির কল্যাণে চলে যাচ্ছে অন্য পেশায়। দেশে শিল্পের প্রসার ও প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে এই কুটির শিল্পের পরিসর।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জরিপে এমন চিত্র উঠে এসেছে। সম্প্রতি করা তাঁত শুমারির প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে এসেছে। শুমারির তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯০ সালে দেশে মোট ২ লাখ ১২ হাজার ৪২১টি তাঁত ছিল, যা ২০০৩ সালে হ্রাস পেয়ে ১ লাখ ৮৩ হাজার ৫১২টি হয়েছে। সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী ২০১৮ সালে এই সংখ্যা নেমে এসেছে ১ লাখ ১৬ হাজারে। অর্থাত্ ১৯৯০ সালের তুলনায় দেশে হস্তচালিত তাঁতের সংখ্যা কমে গেছে ৪৫ দশমিক ৩৯ ভাগ।

এই শিল্পের সংখ্যা ও বর্তমান পরিসংখ্যান সম্পর্কে জানতে চাইলে তাঁত শুমারির প্রকল্প পরিচালক মহিউদ্দিন আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেন, এবারের শুমারিটি কিছুটা ভিন্ন প্রকৃতির। শুমারিতে তাঁতিদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার চিত্র তুলে আনা হয়েছে। শুমারির প্রাথমিক ফলাফল তৈরি করা হয়েছে। শিগগিরই আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে।

সূত্র জানায়, সুদূর অতীতে দেশের কৃষি খাতের পরই গ্রামীণ অর্থনীতিতে তাঁতশিল্পে সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থান ছিল। ভারতীয় উপমহাদেশসহ ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের মসলিন, জামদানি, বেনারসির চাহিদা ছিল, যা মূলত এই হস্তচালিত তাঁতেই উৎপন্ন হতো। পরবর্তীকালে শিল্পবিপ্লব এবং আধুনিক প্রযুক্তির প্রসারের ফলে হস্তচালিত তাঁতের চাহিদা দিনদিন কমে আসে। পরিসংখ্যান ব্যুরোর শুমারিতে এই শিল্প ছোট হয়ে আসার আরও বেশকিছু কারণ উঠে এসেছে।

এ খাতের সংশ্লিষ্টরা জানান, নতুন প্রজন্মের মাঝে হস্তচালিত তাঁতকে পেশা হিসেবে নেওয়াটা নিরুত্সাহিত হচ্ছে। ফলে এই পেশায় দক্ষ জনবলের অভাব প্যাপক। ১৯৯০ সালে ৫৫ ভাগ পুরুষ এই শিল্পে থাকলেও ২০১৮ সালে এই হার ৪৪ ভাগে নেমে এসেছে। অবশ্য নারীর অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যহারে বেড়েছে। ৪৪ ভাগ থেকে ৫৭ ভাগে উন্নীত হয়েছে নারীদের অংশগ্রহণ। দেশে অর্ধেকের বেশি হস্তচালিত তাঁত রয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে। ভৌগোলিক পরিবেশ ও প্রযুক্তির ব্যবহারে সীমাবদ্ধতায় তারা এ শিল্প টিকিয়ে রেখেছে। বিবিএস সূত্র জানায়, দেশে বাগেরহাট, ভোলা, চাঁদপুর ও লক্ষ্মীপুর জেলায় তাঁত বা তাঁতি পাওয়া যায়নি।

কোথায় কত তাঁতঃ সংশ্লিষ্ট সংস্থার তথ্যানুযায়ী দেশে সংখায় সবচেয়ে বেশি হস্তচালিত তাঁত রয়েছে রাঙ্গামাটিতে ২৯ হাজার ২২৪টি বা ২৫ দশমিক ১৯ শতাংশ। এই অঞ্চলের পরেই খাগড়াছড়িতে ১৮ হাজার ১১৬টি (১৫.৬২%), বান্দরবানে ১৬ হাজার ৮৩০টি (১৪.৫১%) তাঁত রয়েছে। পাহাড়ি অঞ্চলের বাইরে দেশে সবচেয়ে বেশি হস্তচালিত তাঁত রয়েছে কুষ্টিয়ায় ১০ হাজার ৬৫৬টি (৯.১৯%), এর পরে সিরাজগঞ্জে ৯৭৬৬টি (৮.৪২%)। সিরাজগঞ্জ জেলাতে ২২৫টি কারখানা পাওয়া গেছে যেখানে বাণিজ্যিকভিত্তিতে হস্তচালিত তাঁত ব্যবহার হচ্ছে। নারায়ণগঞ্জে রয়েছে ৩৯৪৪টি তাঁত, বগুড়ায় ৩৩৭৫টি, টাঙ্গাইলে ৩২৯০টি, পাবনা ২৮৩৩টি, মৌলভীবাজার ২৪৯১টি, ঝিনাইদহে ১৮৯৯টি, ঢাকায় ১৩৮১, রাজবাড়িতে ১২৫৭টি এবং নরসিংদীতে রয়েছে ১১২৮টি তাঁত। এরমধ্যে টাঙ্গাইলে ২৪৭টি ও নরসিংদীদে ২৫টি শিল্পে হস্তচালিত তাঁত ব্যবহার হচ্ছে।

শুমারির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কালের বিবর্তনে পাওয়ার লুম বা কলের তাঁত ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে। এই খাতে বড় বড় আধুনিক শিল্পায়ন হচ্ছে। ফলে হস্তচালিত তাঁতিরা পিছিয়ে পড়েছে। হস্তচালিত তাঁত এখন আর বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার হচ্ছে না। শতকরা ৯৯ ভাগ হস্তচালিত তাঁত পারিবারিকভাবে উৎপাদন কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। তাছাড়া এই শিল্পে মূলধনের সল্পতা সহ বাজারজাত করার সমস্যা রয়েই গেছে।

সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা, সুতার মুল্য কমানো সহ হস্তশিল্পের ব্যাবহারে ব্যাপক ভাবে উৎসাহিত করা গেলে আবারো তাঁত শিল্প তার অতীত ঐতিহ্য ফিরে পাবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।