• ঢাকা
  • রবিবার, ৫ই জুলাই, ২০২০ ইং | ২১শে আষাঢ়, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ | ১৩ই জিলক্বদ, ১৪৪১ হিজরী

সকাল ৭:৩১

পানি খেলে কি পেটে গিয়ে মরবে করোনাভাইরাস?


সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইউনিসেফের বরাত দিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে কভিড-১৯ নিয়ে এক কথিত পরামর্শ; তাতে বলা হয়েছে, ঘন ঘন পানি খেলে নভেল করোনাভাইরাস সরাসরি পেটে পৌঁছে যাবে, তারপর পাকস্থলীর অম্লরস একে ধ্বংস করে ফেলবে।

এই পরামর্শ কতটুকু বিজ্ঞানসম্মত- তা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করে বিবিসি বলেছে, এটা নিছকই গুজব। ঘন ঘন পানি পান করলেই করোনাভাইরাস মরছে না।

কী করলে কভিড-১৯ থেকে রেহাই মিলবে তা নিয়ে অনলাইনে ছড়িয়ে পড়েছে নানা টোটকা। কোথাও বলা হয়েছে- আইসক্রিম খাওয়া যাবে না কোনোভাবেই।

জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক তহবিল ইউনিসেফ থেকে এই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে- এমন কথা কোথাও কোথাও বলা হলেও তা মোটেও সত্যি নয় বলে জানাচ্ছে বিবিসি।

এর মধ্যে ব্লিচিং পাউডার পানিতে গুলে খাওয়ার গুজবটিকে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে বিবিসির প্রতিবেদনে।  

গত প্রায় তিন মাস ধরে বিশ্বে ছড়িয়ে পড়া এ ভাইরাস কেড়ে নিয়েছে ১৩ হাজারের বেশি লোকের প্রাণ, আক্রান্ত হয়েছে তিন লাখের বেশি মানুষ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ভাইরাস নিয়ে গুজব আর আতঙ্ক ক্ষতির ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে বহুগুণ। 

ঘন ঘন পানি পানে কভিড-১৯ রোগের ভাইরাস পেটে গিয়ে মরে যাবে বলে যে গুজব ছড়িয়ে পড়েছে, সেটি বিজ্ঞানসম্মত দেখাতে একটি যুক্তিও তুলে ধরা হয়েছে।

তাতে বলা হয়েছে, আমাদের মুখ ও গলা সব সময় আর্দ্র রাখা জরুরি। তাই প্রতি ১৫ মিনিট পর পর পানি পান করতে হবে। তাতে মুখে বা গলায় থাকা ভাইরাস পানির সাথে খাদ্যনালী বেয়ে পাকস্থলীতে নেমে যাবে। পরে পাকস্থলীর এসিড সেই ভাইরাসকে ধ্বংস করে ফেলবে।

তবে অনলাইনের এই তথ্যকে নাচক করে দিয়েছেন লন্ডন স্কুল অফ হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিকাল মেডিসিনের ক্লিনিকাল এপিডেমিওলজিস্ট কল্পনা সাবাপাঠী।

বিষয়টা ব্যাখ্যা করে তিনি বিবিসিকে বলেন, সংক্রমণ যখন শুরু হয় তখন হাজার হাজার বা লাখ লাখ ভাইরাস শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। তাই পানি খেয়ে সামান্য কিছু ভাইরাস পেটে চালান করে দিলেই এ থেকে মুক্তি মিলছে না। 

“তাছাড়া এই ভাইরাস ততক্ষণে নাকের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তে পারে। ভাইরাস যদি তখন শ্বাসনালীকে সংক্রমিত না করেও থাকে, তবুও এই শঙ্কা থেকেই যায় যে অন্য কোনোভাবে তা শরীরে প্রবেশ করবে। কেউ কেউ ভাইরাস লেগে থাকা আঙ্গুল দিয়ে মুখ স্পর্শ করলেও আক্রান্ত হবেন; নাক আর চোখ স্পর্শ করলেও। ”

তবে মূল ঝুঁকিটা অন্যখানে। কেউ হাঁচি দিলে বাতাসে যে কফের কণা ছড়িয়ে পড়ে তাতে হাজারো ভাইরাস থাকতে পারে। নিঃশ্বাস নিতে গিয়ে অন্য কেউ তা থেকে সংক্রমিত হতে পারেন সহজেই।

পাকস্থালীতে থাকা এসিডের পিএইচ মাত্রা থাকে এক থেকে তিন; যা একটি ব্যাটারিতে থাকা এসিডের মত শক্তিশালী এবং স্টিলকেও দ্রবীভূত করতে সক্ষম।

গবেষকরা বলছেন, নতুন করোনাভাইরাস দ্রবীভূত এসিডে খুব একটা কাবু হয় না। ভাইরাসটি পাকস্থলীতে শুধু যে টিকে থাকে তাই নয়, বরং অন্ত্রে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এভাবেও একজন ব্যক্তি কভিড-১৯ এ আক্রান্ত হতে পারেন।   

আক্রান্তদের মধ্যে কিছু বমি ও ডায়রিয়ায় অসুস্থ রোগীর খবর জানার পর চীনা বিশেষজ্ঞরা হুঁশিয়ার করেন, তাদের পরিপাকতন্ত্রও সংক্রমিত হয়েছে।

তাদের দাবি, এখন পর্যন্ত কোনো গবেষণাতেই প্রমাণ হয়নি যে পানি পানে কভিড-১৯ সংক্রমণ ঠেকানো যায়। মানুষকে আতঙ্কিত করা ছাড়া ওই গুজব আর কোনো কাজে আসবে না।

তবে ১৫ বছর আগের একটি গবেষণার তথ্য তুলে ধরে বিবিসি লিখেছে, জাপানে পানি দিয়ে কুলকুচি করা একটি জনপ্রিয় চর্চা এবং এর মধ্যে দিয়ে শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ রোধ করা যায় বলে মনে করা হয়।

ওই গবেষণায় দেখা যায়, টানা দুই মাস যারা প্রতিদিন তিন বেলা পানি দিয়ে কুলকুচি করেছেন, তাদের মধ্যে শ্বাসতন্ত্রে জটিলতা দেখা দিয়েছে অন্যদের চেয়ে কম। তবে এই পদ্ধতি করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রেও পুরোপুরি কার্যকর হবে এমনটা জোর গলায় বলতে চান না বিশেষজ্ঞরা।

সাবাপাঠী বিবিসিকে বলেন, ১৫ মিনিট পর পর পানি খেতে বলার ওই পরামর্শ  আপাতদৃষ্টিতে ক্ষতিকর বলে মনে হয় না; তবে এসব তথ্য সার্বিকভাবে নভেল করোনাভাইরাসের এই সময়ে প্রকৃত সুরক্ষা নির্দেশনা থেকে মানুষকে বিভ্রান্ত করে। মানুষ ভাবতে শুরু করবে যে এভাবেই বোধহয় তারা সুরক্ষিত থাকবে।

এই সময় মেলামেশা কমিয়ে সামাজিক দূরত্ব রক্ষার পাশাপাশি ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার নিয়ম মেনে চলাই সুরক্ষা দেবে। সাবাপাঠীর পরামর্শ, পানি ভর্তি গ্লাসের বদলে হাতে তুলে নিন সাবান। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ওয়েব সাইটে বলা আছে, একজন ব্যক্তির প্রতিদিন আট গ্লাস পানি পান করা দরকার। তবে পানি খেলে নভেল করোনাভাইরাস শরীর থেকে বেরিয়ে যাবে, এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি এখনও।