• ঢাকা
  • বুধবার, ২৩শে অক্টোবর, ২০১৯ ইং | ৮ই কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | ২৩শে সফর, ১৪৪১ হিজরী

সকাল ৮:৫১

পর্যটকদের হাতছানি দেয় রূপের রাণী রাউজান


এম.কামাল উদ্দিন, রাউজান : শত বছর আগের বাংলা সহিত্যের খ্যাতিমান কবি দৌলত কাজী। তিনি ছিলেন রাউজানের গর্বিত সন্তানদের একজন। নিজের জন্মভূমি রাউজানের আলো বাতাস আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে বিমুদ্ধ কবি তার লেখা একটি কাব্যে লিখেছেন-‌

রাজার কুমারী এক নামে ময়নাবতী

ভূবন বিজয়ী কন্যা জগতে পার্বতী,

কি কহিব কুমারীর রূপের প্রসঙ্গ

অঙ্গে লীলায় যে বান্ধিছে অনঙ্গ।

কবি এই লেখায় গোটা রাউজানকে তুলনা করেছেন রাজার কুমারীর সাথে। শত বছর আগে কবির চোখে দেখা এই রাউজানের প্রকৃতির সাজ আজো অম্লান। এর সাথে রয়েছে গর্ব করার মত রাউজানের ইতিহাস ঐতিহ্য। এ যুগে এসেছে আরো সমৃদ্ধ। হয়েছে বর্তমান সাংসদের মেধা ও শ্রমে বিষ্ময়কর আধুনিক সব সৃষ্টি। সবদিক থেকে বলা যায় গোটা রাউজান এখন অনুপম সাজে সজ্জিত দেশে একটি অনন্য উপজেলা।

রূপের রাণী এই রাউজান এখন উম্মূখ হয়ে আছে দেশ বিদেশি পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণে। বলা যায় রাউজানে আগে থেকে রয়েছে দেশি বিদেশি পর্যটকদের আনাগোনা। এখানে বিভিন্ন সময় আসা যাওয়া করেন জাপান, কোরিয়া, থাইল্যান্ড, আরব আমিরাত, ওমান, ভারত, নেপাল, শ্রীলংকা, যুক্তরাস্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, কানাডা, ভারতসহ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের পর্যটক। তারা কেউ আসেন রাউজানের সৌন্দর্য্য উপভোগে, আবার কেউ আসেন রাউজানের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান সমূহ তীর্থস্থান মর্যাদার বিশ্বাস থেকে। অনেকেই রাউজানের ঐতিহাসিক স্থাপনা, উপমহাদেশ খ্যাত বিপ্লবীদের জন্ম ভূমি ও শ্মশানে নিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এই উপজেলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য উপভোগ করেন। তারা বার বার এখানে আসার নিজেদের ইচ্ছের কথা প্রকাশ করেন।

সচেতন মহল মনে করেন রাউজানকে যারা ঘুরে দেখেছেন তাদের কাছে রাউজান একটি আধুনিক পর্যটন স্পট। যেখানে রয়েছে নদী-পাহাড় এর বৈচিত্রময় রূপ। ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকা বিভিন্ন স্থাপনা, উপমহাদেশ খ্যাত বিপ্লবী ও পীর আউলিয়া, সাধু সন্ন্যাসীদের জন্মস্থান ও স্মৃতিসৌধ। যেসব স্থাপনা ও প্রতিষ্ঠানে এখনো দেশ বিদেশের অনেক খ্যাতিমান ব্যক্তির কাছে শ্রদ্ধার জায়গা। যারা এখনো ছুটে আসেন এই রাউজানকে পূন্যভূমি মনে করে।

তবে দুঃখজনক হলেও সত্য যে, রূপের রাণী রাউজানকে দেশের ট্যুরিজম বোর্ড আবিস্কার করতে ব্যর্থ হয়েছে। তাদের হয়ত ধারণা নেই রাউজানের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনা দেখতে প্রতিবছর আসেন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক দেশ বিদেশের পর্যটক। সচেতন মহল মনে করেন সরকারের পর্যটন বিভাগ রাউজানকে ট্যুরিজম স্পট হিসাবে তালিকাভূক্ত করা উচিত। তারা মনে করেন পর্যটন বিভাগের দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গ সমগ্র রাউজান ভ্রমন করা উচিত। এই উপজেলার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও পাহাড় নদীর সৌন্দর্য্যের বিবেচনায় রাউজান হতে পারে দেশের অন্যন্য একটি পর্যটন ক্ষেত্র। উপজেলার ভৌগলিক ও প্রাকৃতিক দিক থেকে অনুপম সৌন্দর্য্যের লীলা ভূমি এই উপজেলার দক্ষিণ-পশ্চিমে কর্ণফুলী- হালদা নদীর বহমান পানির কুল কুল ধ্বনী, উত্তরের সর্তা খালে পাহাড়ী পানির ঝর্ণধারা বিমোহিত করে পর্যটকদের। পূর্বের পাহাড় টিলার সারি সারি বৃক্ষরাজি আর ঝোপ ঝাড়ে আশ্রিত পশুর পাখির কুঞ্জন পর্যটকদেেেরন দেয় এক স্বর্গীয় অনুভূতি ইতিহাস ঐতিহ্যের দিক থেকে বিশ্বব্যাপী এই উপজেলার মর্যাদা সবার উপরে। এই উপজেলায় রয়েছে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সিপাহীসালার মাস্টার দা খ্যাত সূর্য সেনসহ তার সাহসী সহচরদের বাস্তুভিটা। তাদের স্মৃতি সৌধ রয়েছে নোয়াপাড়া, উরকিরচর, বাগোয়ানসহ বিভিন্ন ইউনিয়নে। যাদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনে এখনো ছুটে আসেন ভারত উপমহাদেশের অনেক জ্ঞানী গুনি। হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম গুরু তারাচরণ সাধুর জন্মস্থান এই রাউজানে। এই সাধকের নামে পশ্চিম বঙ্গে রয়েছে বিশাল আশ্রম ও কমপ্লেক্স। এই সাধু জন্মস্থান উপজেলার উরকিরচর ইউনিয়নের পশ্চিম গুজরা গ্রামে। অনেকেই আসে তার পৈত্রিক ভিটায় শ্রদ্ধা নিবেদনে। এই রাউজানের জন্ম মহাকবি নবীণ সেনের। পশ্চিম গুজরায় বিশাল এলাকা জুড়ে পড়ে রয়েছে জমিদারপুত্র মহাকবি নবীণ সেন এর বাস্তুভিটা। তার বাড়ির পাশে পূর্বগুজরায় কবির শ্মাশানে এখন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে দৃষ্টিনন্দন বিশাল কমপ্লেক্স। যেখানে ছুটে আসেন কবি বক্তরা প্রতিবছর। পূর্ব গুজরা হোয়ারা পাড়ায় বৌদ্ধ নেতা বিশুদ্ধানন্দ মহাথের প্রতিষ্ঠিত বিশ্বখ্যাত বৌদ্ধ মন্দির। এখানে বিভিন্ন সময় ভ্রমনে এসেছেন বিশ্বের অনেক প্রভাবশালী নেতা ও রাস্ট্র প্রধান। এখনো বিভিন্ন সময় আসেন দেশ বিদেশের খ্যতিমান বৌদ্ধ নেতৃবৃন্দ ও পর্যটকরা। বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের প্রাচীণ বৌদ্ধ মন্দির পাহাড়তলীর মহামুনির খ্যতি বিশ্ব জুড়ে। এখানে প্রায় আসেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পর্যটকগণ। এই গ্রামটিকে ঘিরে রয়েছে রাউজানের সাংস্কৃতিক বলয়। এই গ্রামে জন্ম ড.বেণী মাধব বড়ুয়ার। পাহাড়তলীতে অবস্থিতি বিশ্বখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। এখানেও আসেন বিভিন্ন দেশের নামি দামি ব্যক্তিবর্গ। এই প্রতিষ্ঠানের অদুরে প্রাকৃতিক সৌন্দের্য্যের অভ্যন্তরে বিশাল এলাকাজুড়ে প্রতিষ্ঠিত আছে জগৎপুর আশ্রম। এটি হিন্দু সম্প্রদায়ের পবিত্রস্থান। রয়েছে অনাথ আশ্রম। দেশ বিদেশের পর্যটকগণ এখানে বিভিন্ন সময় ছুটে আসেন। উপভোগ করেন প্রাকৃতি সৌন্দর্য্য। প্রাচীণ ইতিহাসের জীবন্ত হয়ে আছে কদলপুরের লস্কর উজির দির্ঘি। বিশাল এই দীঘি নিয়ে এখনো চলে গবেষনা। উপজেলার কাপ্তাই সড়কের পাশ্বে আরো গড়ে উড়ে ২৬ মেগাওয়ার্ড বিদ্যূৎ কেন্দ্র,আলোচিত এসব প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম শহর থেকে মাত্র ৮ থেকে ১০ কিলোমিটারের মধ্যে। সহজ যোগাযোগ মাধ্যম কাপ্তাই সড়ক পথ। রাউজানের উত্তরাংশ রয়েছে চট্টগ্রাম-রাঙ্গামাটি মহাসড়ক। এই সড়ক পথে রাউজানের প্রবেশ মুখে রয়েছে দৃষ্টিনন্দন হালদা সেতু। পূর্বমূখি সড়কের গহিরা চৌমুহনী থেকে উত্তরমূখি অদুদিয়া সড়কটি চলে গেছে উপমহাদেশের অন্যতম অধ্যাত্মিক সাধক সম্রাট এর জন্ম সার্থক মাইজভান্ডার দরবারে। এই পথে রাউজানের নোয়াজিশপুর ইউনিয়নের সড়ক পাশে রয়েছে ইতিহাসের সাক্ষী বিশাল ঈশা খাঁ দিঘি। পূর্বমূখি রাঙ্গামাটি সড়কের দুপাশে আধুনিক জনসেবামূখি সব স্থাপনা। এই সড়ক পথে রয়েছে শান্তিরদ্বীপ নামের একটি সমবায় সমিতি। যেখানে এসেছিলেন ফাদার পিচ ফায়ার নামে এক নোবেল বিজয়ী বেলজিয়ামের নাগরিক। তাকে এনেছিলেন এলাকার বিশিষ্ট রাজনীতিক মরহুম একেএম ফজলুল কবির চৌধুরী। এই সড়কের সাথে উপজেলা প্রশাসনের সবকটি প্রতিষ্ঠান। সড়ক পথে রাউজানের শেষাংশের পার্ব্বত্য জেলা সীমান্তের আগে দৃষ্টিনন্দন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য। সারি সারি বৃক্ষরাজির মধ্যে কোকিলের কুহুতান, বৃক্ষ ঢালে পাখির কিচিমিচির শব্দ। বনের ফাঁকে ফাঁকে বন্য পশুর দৌড় ঝাপ। ঝোপঝাড়ে ঝাড়ের ফাঁকে পশুর দৌড় ও পাখির কুঞ্জনে এই পথের পথিকরা সৌন্দর্য্য উপভোগে থমকে দাঁড়ায়। সৌন্দর্য্যে লীলা ভূমি এই এলাকাটি রাউজান রাবার বাগান নামে পরিচিত। সৌন্দর্য্য পিপাসুরা যাত্রপথে এখানে দাঁড়িয়ে উপভোগ করেন সৃষ্টির অপূর্ব রূপ। কেউ কেউ গাড়ি থামিয়ে নারী শিশুদের নিয়ে বসে পড়েন এখানে। এখানে ভ্রমন পিপাসুদের সেবায় স্থানীয় ভাবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে গিরী ছায়া নামের একটি আধুনিক রেঁস্তোরা। এখানে দেশ বিদেশের পর্যটকদের রূচি সম্মত সব খাবার তৈরীর মত উপকরণ থাকে প্রস্তুত। পর্যটকরা এখানে বসে বিশ্রাম নেয়। শীতের মৌসুমে রাউজানের বিভিন্ন স্পটে ছুটে আসেন দেশের বিভিন্নস্থানের শত শত সৌন্দর্য্য পিপাসু পর্যটক। তারা এখানে এসে আয়োজন করেন বনভোজন। অনেকেই ঘুরে দেখেন উপজেলার বিভিন্নস্থানের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। রাউজানের মধ্যে আরো একটি বিষ্ময়কর প্রাকৃতিক সৃষ্টি হালদা নদী। এই নদীকে বলা হয় মাছে মা। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র এই নদী। বছরের একাধিকবার এই নদীতে মা মাছ ডিম দিয়ে থাকে। প্রায় ২৮ কিলোমিটার এই নদীর দুধারে জনবসতি। নদী পথে চলে নৌকা সাম্পান। মাঝি মল্লার কণ্ঠে শুনা যায় ভাটিয়ালী গানের সুর। ইতিহাস ঐতিহ্য সমৃদ্ধ সৌন্দর্য্যের রাণী এই উপজেলাকে নিয়ে রয়েছে হাজারো রূপকথা। এই উপজেলায় জন্ম চট্টগ্রামের রপকথার মহারাণী মলকাবানুর। যার নামে রয়েছে অনেক গান, হয়েছে ছায়াছবি। উপমহাদেশ খ্যাত চলচিত্র শিল্পি শাবানার বাড়িও এই উপজেলায়। উপজেলার বিভিন্ন স্থানে এখনো অক্ষত রয়েছে মোগল সা¤্রাজ্যের স্মৃতিবহ বহু স্থাপনা। যেগুলো নিয়ে এখনো চলছে বিভিন্ন পর্যায়ে গবেষনা কর্ম। এই রাউজান আরো সমৃদ্ধ হয়েছে দৃষ্টিনন্দন সব অবকাঠামো সৃষ্টিতে। গত দেড় যুগে এসব প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী। তিনি নিজের মত করে সাজিয়েছেন এই রাউজানকে আধুনিক পর্যাটনের সব চাহিদা পূরণে উপযোগি করে। এলাকাবাসী দাবি রাউজানকে সরকারি ভাবে ঘোষনা করা হউক পর্যটন এলাকা হিসাবে।

ন/ক/র