• ঢাকা
  • শুক্রবার, ১৮ই অক্টোবর, ২০১৯ ইং | ৩রা কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | ১৭ই সফর, ১৪৪১ হিজরী

রাত ২:৪৭

নীতিমালা ছাড়াই সিলেটে গড়ে উঠেছে দুই শতাধিক মহিলা মাদ্রাসা


সিলেট প্রতিনিধি : সিলেটে কোনো ধরনের নীতিমালা ছাড়াই গড়ে উঠেছে দুই শতাধিক মহিলা মাদ্রাসা। খোদ সিলেট নগরীর বিভিন্ন পাড়ায় গড়ে ওঠেছে অসংখ্য আবাসিক ও আনাবসিক মহিলা মাদ্রাসা। এসব মাদ্রাসার অধিকাংশই কওমী মাদ্রাসা বোর্ডগুলোরও নিয়ন্ত্রণে নেই।

যদিও সংশ্লিষ্ট মহল মাদ্রাসা গুলোকে মহিলা মাদ্রাসা হিসেবে প্রচার করছেন। কিন্তু যারা পড়ালেখা করছে তারা শিশু ও তরুণ। অধিকাংশ শিক্ষার্থীরাই এতিম ও দরিদ্র পরিবারের। বিবাহিতদের এসব মহিলা মাদ্রাসায় ভর্তি করা হয় না বলে জানিয়েছেন মাদ্রাসাসংশ্লিষ্টরা।

সিলেট বিভাগের কওমী মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড আযাদ দ্বীনী এদারায়ে তা’লীম বাংলাদেশের ওয়েবসাইট থেকে জানা যায়, সিলেট বিভাগের ৪ জেলায় তাদের অধীনে ৭২৭টি মাদরাসা ও ৮৪টি মহিলা মাদরাসা রয়েছে।

কওমী মাদ্রাসার সর্ববৃহৎ শিক্ষাবোর্ড বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ ওয়েব সাইটে তাদের নিয়ন্ত্রণে ২০১৯ সালের সিলেট বিভাগের মাদ্রাসার সংখ্যা (পুরুষ ও মহিলা) উল্লেখ করেছে ১০৬১টি। সিলেটের বহুল প্রচারিত দৈনিক সিলেটের ডাক পত্রিকায় প্রকাশিত ৯ জুলাই তাদের প্রতিবেদক সাঈদ নোমান এক তথ্যে এসব বিস্তারিত তুলে ধরেন।

এদিকে কওমী মাদ্রাসাপরিচালনার সাথে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সিলেট বিভাগে দুই হাজারের অধিক কওমী মাদ্রাসারয়েছে। এর মধ্যে মহিলা মাদ্রাসাহবে প্রায় ৫ শতাধিক। এসব মহিলা মাদ্রাসাআলাদা কোনো নিয়ম নীতি ছাড়াই চলছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সিলেট নগরীতে ৩০ থেকে ৪০টি মহিলা মাদ্রাসারয়েছে। অধিকাংশ মাদ্রাসাই নগরীর বিভিন্ন পাড়ায় বাসাভাড়া নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। বাসার দু-তিন রুম ভাড়া নিয়ে কোনো নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে একের পর এক এসব মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে।

শিক্ষা নিয়ে কাজ করেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিলেটের এমন কয়েকজন ব্যক্তি জানান, বর্তমানে আশংকাজনক হারে শিশুরা পাশবিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। আর এই নির্যাতন কওমী মাদ্রাস াগুলোতেও হচ্ছে। অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোতে সরকারের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে এবং নতুন প্রতিষ্ঠান করতে অনেক নিয়ম নীতি মেনে প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে করতে হয়। কিন্তু, মহিলা মাদ্রাসা গুলো যার যেমন ইচ্ছে প্রতিষ্ঠা করছে। এসব প্রতিষ্ঠানে শিশু নির্যাতনের হার দিন-দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে বলেও তাদের অভিমত।

একজন অভিভাবক জানান, ধর্মীয় আবেগ থেকে তিনি তার মেয়েকে সিলেট নগরীর একটি মহিলা মাদ্রাসায় ভর্তি করিয়েছিলেন। কিন্তু কিছু দিন পর তিনি দেখলেন এ মাদ্রাসায় শিশুর পড়া- লেখার পরিবেশ অত্যন্ত খারাপ। তাই তিনি শিশুটিকে আর সেখানে দিচ্ছেন না।

সিলেটের মহিলা মাদ্রাসাগুলোর জন্য আলাদা কোনো নিয়ম নীতি নেই বলেও জানালেন, আযাদ দ্বীনী এদারায়ে তা’লীম বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা আব্দুল বছির। তিনি বলেন, আগে মহিলা মাদ্রাসা তারা বোর্ডের অন্তর্ভূক্ত করতেন না। কিন্তু বর্তমান যুগের সাথে তাল মিলাতে এবং নারীদের শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠায় গত বছর থেকে তারা মহিলা মাদ্রাসাকে আযাদ দ্বীনী এদারায়ে তা’লীম বাংলাদেশের অন্তর্ভূক্ত করেছেন। এ পর্যন্ত ৮৪টি মহিলা মাদ্রাসাতাদের অধীনে এসেছে। তবে অনেক মাদ্রাসাএর বাইরে রয়ে গেছে।

মাওলানা আব্দুল বছির জানান, সাধারণ মাদ্রাসা বোর্ডের অন্তর্ভূক্ত করতে গেলে মাদ্রাসার জমির দলিল, কমিটি ও সদস্য সংখ্যা, শিক্ষক ও শিক্ষার্থী সংখ্যার কাগজ বোর্ড কর্তৃপক্ষ বরাবরে জমা দিয়ে অন্তর্ভূক্ত হওয়ার জন্য একটি আবেদন করতে হয়। এরপর সবকিছু যাচাই বাছাই করে তাদের অন্তর্ভূক্ত করা হয়। তবে মহিলা মাদ্রাসাগুলোর জন্য এইসব নিয়ম ছাড়াও আরো কিছু নিয়ম রাখতে হবে। এ নিয়ে আমাদের চিন্তা ভাবনা চলছে। আমরা মহিলা মাদ্রাসাগুলোর জন্য আলাদা নীতিমালা প্রণয়নের চিন্তা করছি।

গত সোমবার বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত এই ছয় মাসে বাংলাদেশে ৩৯৯জন শিশু ধর্ষণ ও ধর্ষণ চেষ্টার শিকার হয়েছে বলে জানিয়েছে বেসরকারি সংস্থা মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন। তাদের এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, ধর্ষণের পর একজন ছেলে শিশুসহ মোট ১৬জন শিশু মারা গেছে। ছয়টি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত ৪০৮টি সংবাদ বিশ্লেষণ করে সংস্থাটি এই তথ্য পেয়েছে। প্রতিবেদনের আরো বলা হয়, অন্তত ৪৯টি শিশু (৪৭ জন মেয়েশিশু ও ২ জন ছেলেশিশু) যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে। এর আগে ২০১৮ সালে ৩৫৬টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছিল বলে জানিয়েছিল সংস্থাটি। এর মধ্যে মারা গেছে ২২ জন এবং আহত হয়েছে ৩৩৪ জন।

শিশু ধর্ষণের ঘটনা আংশকাজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করে মানবাধিকার কর্মী এডভোকেট জাকিয়া জালাল জানান, আমরা শিশুদের সুরক্ষা দিতে পারছি না। এখন আর বাসার আঙ্গিনা, স্কুল, মাদ্রাসাও মক্তবে শিশুরা নিরাপদ নয়।তিনি বলেন, সম্প্রতি নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলায় ধর্ষণ মামলায় গ্রেফতার কেন্দুয়া পৌরশহরের একটি মহিলা কওমি মাদ্রাসার অধ্যক্ষ আবুল খায়ের বেলালী আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। সেটা কতো ভয়াবহ।

ওই অধ্যক্ষ আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে দুই শিশুকে ধর্ষণ করার কথা স্বীকার করেছেন। এর আগে মাদ্রাসার আরও ছয় ছাত্রীকে ধর্ষণ করেছেন বলেও স্বীকারোক্তি দিয়েছেন বেলালী।

সংবাদপত্র থেকে জানলাম, ওই অধ্যক্ষ মাদ্রাসাটির একটি কক্ষে থাকতেন। আবাসিক হওয়ায় ওই মাদ্রাসাটিতে বেশ কয়েকজন এতিম-অসহায় শিক্ষার্থী থেকে লেখাপড়া করে আসছিলো। তিনি বলেন, এসব মাদ্রাসায় যথাযথ তদারকি না থাকায় ও আমাদের দেশে ধর্ষণ মামলা বিচারের দীর্ঘসূত্রতার জন্য আসামীরা পার পেয়ে যাচ্ছে। তাই এই অপরাধ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।

এ বছর জানুয়ারী মাসে সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার রাজাগঞ্জ ইউনিয়নের জামেয়াতুল ইসলাম লিলবানাত খালপার টাইটেল মহিলা মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষক হাফিজ কবির আহমদ (৪০) মাদ্রাসার তৃতীয় শ্রেণির এক শিশু ছাত্রীকে মাদ্রাসার দ্বিতীয় তলার একটি নির্জন কক্ষে নিয়ে জোরপূর্বক ভাবে ধর্ষণ করেন। মেয়েটি শিক্ষকের কাছে যৌন হেনস্থার কথা পরিবারের কাছে গিয়ে বলায় মাদ্রাসায় আসা বন্ধ করে দেয়া হয়। পরে শিশুর পরিবার তাকে সিলেট ওসমানী হাসপাতালে ওসিসি বিভাগে ভর্তি করেন। ডাক্তারী পরীক্ষায় শিশুটিকে যৌন হেনস্থার প্রমাণ পাওয়ার পর এ ঘটনায় কানাইঘাট থানায় অভিযুক্ত শিক্ষক কবির উদ্দিনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। পুলিশ শিক্ষক কবির আহমদকে গ্রেপ্তার করে।

এ বিষয়টি নিয়ে আযাদ দ্বীনী এদারায়ে তা’লীম বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা আব্দুল বছির বলেন, আলেমদের দ্বারা এসব অপকর্ম মেনে নেওয়ার মতো নয়। দু একজনের জন্য পুরো আলেম সমাজ কলঙ্কিত হচ্ছেন। কানাইঘাটের মহিলা মাদ্রাসাটি আমাদের বোর্ডের অধীনে নয়। শুনেছি, একজন ব্যক্তি এই মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে নিজের মতো করে পরিচালনা করছেন।

মাওলানা আব্দুল বছির বলেন, নিরাপত্তার জন্য আবাসিক মহিলা মাদ্রাসা না করাই ভালো। ভারতের দেওবন্দ গিয়ে দেখেছি-সেখানে মহিলা মাদ্রাসা আবাসিক নয়। মেয়েদের গাড়ি করে আনা হয় আবার ক্লাস শেষে পৌঁছে দেওয়া হয়। এ ছাড়া মহিলা মাদ্রাসাগুলোতে সার্বক্ষনিক মহিলা শিক্ষক থাকতে হবে। মাদ্রাসা পরিচালনার জন্য একজন পুরুষ মুহতামীম থাকবেন।

মদন মোহন কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ড. আবুল ফতেহ ফাত্তাহ বলেন, শিশু ধর্ষণ বাড়ার কারণ হচ্ছে আমাদের নৈতিক ও সামাজিক অবক্ষয়ের ফল। আইনের শাসন সহজ পথে না চলার কারণে ও কড়াকড়িভাবে প্রতিফলিত না হওয়ায় আমরা ভারসাম্যহীন সমাজের পথে যাচ্ছি। এসব অপকর্ম প্রতিরোধে মানুষকে উচ্চকন্ঠ হতে হবে। নৈতিক শিক্ষার সাথে বিবেকবোধ জাগ্রত করে সম্মিলিতভাবে সামাজিক কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত হতে হবে। তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানে শিশু নির্যাতনের শিকারের অন্যতম একটি কারণ হলো অযোগ্যদের দ্বারা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা। প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টরা সৎ না অসৎ এটা এখন দেখা হয় না। অসৎরাই দাপটের সাথে সকল স্থান দখল করে আছে। তিনি আরো বলেন, মাদ্রাসা শিক্ষা বিশেষ করে কওমী মাদ্রাসার কোনো বাধ্যবাধকতা না থাকায় ইচ্ছে মতো যেখানে সেখানে গড়ে উঠছে এসব প্রতিষ্ঠান। ধর্মীয় বিষয় জড়িত থাকায় মানুষ এসবে নাক গলাতে চায় না।

বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা সিলেট মহানগর শাখার সভাপতি এডভোকেট আতিকুর রহমান বলেন, আইনের প্রয়োগ সঠিকভাবে হচ্ছে না। যার কারণে শিশুর প্রতি যৌন হয়রানী ও সহিংসতার মতো ন্যাক্কারজনক ঘটনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ ব্যাপারে শিশু সুরক্ষা আইনের যথাযথ প্রয়োগ প্রয়োজন। সেই সাথে শিশু নির্যাতন বন্ধে সামাজিক সচেতনতা দরকার।

ব্লাস্ট সিলেটের কোঅর্ডিনেটর এডভোকেট ইরফানুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশে এখনো ‘ধর্ষণ’ সংজ্ঞায়িত করা হয় ১৮৬০ সালের দন্ডবিধি অনুযায়ী। ধর্ষণের মামলা চলাকালীন বিভিন্ন বিব্রতকর পরিস্থিতি এবং বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা আইনের আশ্রয় নিতে অনীহা তৈরি করে। জামিন অযোগ্য অপরাধ হওয়ার পরও অনেক ক্ষেত্রে জামিন পেয়ে যাচ্ছে অভিযুক্তরা। ধর্ষণ মামলায় সাক্ষ্য আইনের সাহায্য নিতে হয়। এছাড়া বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণের সন্নিবেশ ঘটাতে গিয়ে বিচারের দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়।

এডভোকেট জাকিয়া জালাল বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে বলা আছে, ১৮০ দিনের মধ্যে মামলা প্রক্রিয়া শেষ করতে হবে। কিন্তু,এমন অনেক নজির আছে যে, বছরের পর বছর ধরে মামলা চলছে। এক সময় বাদী-বিবাদী আপস মীমাংসা করে ফেলে। তাই মামলাকে শেষ পর্যন্ত আর নেওয়া যায় না। এর ফলে অধিকাংশ ধর্ষণ মামলার ফলাফল ব্যর্থ হয়।