ঢাকা শুক্রবার, ১৯শে জুলাই, ২০১৯ ইং | ৪ঠা শ্রাবণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | ১৫ই জিলক্বদ, ১৪৪০ হিজরী

সন্ধ্যা ৬:৩৫
সম্পাদকের কলামসম্পাদকের কলাম টপ

পহেলা বৈশাখ : নতুন করে স্বপ্ন দেখার দিন

পৃথিবীতে অনেক জাতিরই নিজস্ব সন নেই। কিন্তু আমাদের আছে। বাংলা সনের গোড়াপত্তন হয়েছে এ দেশের মানুষের জীবনধারা এবং প্রকৃতির সহিত নিবিড় সম্পর্কের ভিতর দিয়ে। বাংলা নববর্ষ এমন একটি সময় শুরু হয়, যখন বসন্তের দহনকাল শেষে গ্রীষ্মের বিচিত্র রসাল ফলসম্ভারে ভরে ওঠে প্রকৃতি। নতুন বছরের শুরুতে বৃক্ষরাজির মুকুলগুলি সবুজ কাঁচা হতে ক্রমশ পরিপূর্ণ হয়ে উঠতে শুরু করে। পহেলা বৈশাখ যেন সেই সবুজ আর কাঁচাদের আমন্ত্রণ জানানোর দিন।

ষড়ঋতুর এক অপূর্ব রূপ দেখতে পাওয়া যায় বাংলা সনের ভিতরে। চৈত্রে রবিশস্য, বৈশাখে বোরো ধান, জ্যৈষ্ঠে পাকা আম-কাঁঠাল, আষাঢ়-শ্রাবণে ঘনঘোর বর্ষা ও নদীজল ছলছল, শরতে কাশবনে বাতাসের দোলা, অগ্রহায়ণে নবান্নের উৎ্সব, পৌষে পিঠাপুলির ধুম, মাঘে কনকনে শীত-এ সবের ভেতর দিয়ে প্রকাশ পায় আমাদের লোকায়ত জীবনধারার অপরূপ চিত্র। আর এর শুরুতে বাংলা নববর্ষের ভেতর দিয়ে। নববর্ষের চিরাচরিত উৎ্সবের মধ্যে রয়েছে হালখাতা, চাষাবাদ, বীজ বপন, বৈশাখী মেলা, মধুমাসের মেলা ও আঞ্চলিক উৎসব। এই দিনে আনন্দঘন এবং উৎ্সবমুখর পরিবেশের মধ্য দিয়া অতীতের সব দায়দেনা মিটাইয়া নূতন বৎসরের যাত্রা শুরু করে বাংলাদেশের মানুষ। বাংলা নববর্ষ এমনই আবেগের। এ আবেগ জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের। তাই বাংলা নববর্ষ মহামিলনের দিন।

যদিও বাংলা নববর্ষ সৃষ্টি হয়েছে ফসলি সন ও খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে। মোগল সম্রাট আকবর প্রবর্তিত ‘তারিখ ইলাহি’ বা ‘আকবরি ফসলি সন’ হলো বঙ্গাব্দের উৎ্স। প্রথম দিকে মোগল শাসন পরিচালনা করা হতো হিজরি সাল বা  চান্দ্রবর্ষের আলোকে। অথচ মৌসুমি বায়ু প্রধান ভারতীয় উপমহাদেশে ফসল ও শস্য রোপণ চাষাবাদ ও ফসল তোলা-এসব কাজ চান্দ্রবর্ষ দিয়ে পরিচালনা করতে সমস্যার সৃষ্টি হতো। কারণ সৌরবর্ষের তুলনায় চান্দ্রবর্ষ প্রায় ১১ দিন কম। এদিকে আবার ফসলের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল রাজস্ব আদায় বিষয়টা। এ সমস্যা সমাধানে সম্রাট আকবর ইরান দেশের ‘তারিখ-ই-জালালি’ সৌরবর্ষ এবং সেই সময়ের জ্যোতির্বিদদের তত্ত্বাবধানে চান্দ্র ও সৌরবর্ষের সংমিশ্রণে প্রচলন করেন ‘তারিখ ইলাহি’ নামে নূতন এক অব্দের। সেই অব্দই পরবর্তীকালে চালু হয় বাংলায় ‘বঙ্গাব্দ’রূপে।

পহেলা বৈশাখ আমাদের ভিতরে পরমত সহিষ্ণুতা, সদ্ভাব, ভ্রাতৃত্ববোধ ও মনুষ্যত্বের দীক্ষা দেয়। আমাদের অন্তরকে বিকশিত করে, নিজের মাটিকে চেনায়, শেকড়কে চেনায়। বাংলাদেশের অনেক ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জাতিগোষ্ঠীও একই সময়ে উদযাপন করে তাদের নববর্ষ। এ বার্তা দেয় যে, আমরা আলাদা কেউ নই। এ কারণেই সমস্ত ভেদাভেদ ভুলে আমরা সবাই শরিক হই নববর্ষের উৎসবের শেকড়ের সাথে। নিরন্তর আশা-নিরাশা আনন্দ-বেদনায় বাংলা নববর্ষ তৈরি করে নতুন স্বপ্ন। দুর হোক  বিগত বছরের সমস্ত জরা-ব্যাধি। সবাই ভালো থাকুক, সুস্থ থাকুক। স্বপ্নপূরণের এই শুভক্ষণে সকলকে জানাই নববর্ষের শুভেচ্ছা ও প্রীতি।