ঢাকা রবিবার, ১৮ই আগস্ট, ২০১৯ ইং | ৩রা ভাদ্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | ১৫ই জিলহজ্জ, ১৪৪০ হিজরী

রাত ৪:৩৬
টপ স্লাইডবিশেষ প্রতিবেদন

দেশী পশুতেই মিটবে কোরবানির চাহিদা

দাম হবে সহনীয়


তরিক শিবলী : আসন্ন ঈদুল আজহায় দেশে কোরবানীকৃত পশুর সংখ্যা দাঁড়াতে পারে ১ কোটি ১০ লাখ। যদিও বর্তমানে কোরবানির জন্য প্রস্তুত রয়েছে প্রায় ১ কোটি ১৮ লাখ পশু। ৩০ লাখ গরু এবং ৬৯ লাখ ছাগল-ভেড়া কোরবানি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর সবটাই দেশীয় উৎস থেকে পাওয়া যাবে।

সে হিসাবে আসন্ন কোরবানির ঈদে উদ্বৃত্ত থেকে যেতে পারে আট লাখ পশু। বাড়তি এ মজুদের পাশাপাশি খামারিদের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে এবারের ঈদে সীমান্তপথে বৈধ-অবৈধ সব ধরনের উপায়ে কোরবানিযোগ্য গবাদিপশু আমদানি বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
দেশে গবাদিপশু উৎপাদন গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এর ফলে গত ছয় বছরে গরুর আমদানি নির্ভরতা কমেছে প্রায় ৯৫ শতাংশ। বিশেষ করে পশু কোরবানির ক্ষেত্রে চাহিদা ও উৎপাদন থাকছে প্রায় সমপর্যায়ে। এবারের ঈদেও এর ব্যত্যয় ঘটবে না বলে ডিএলএস সূত্রে জানা গেছে। সংস্থাটির তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে নিবন্ধিত-অনিবন্ধিত মিলিয়ে গবাদিপশুর মোট খামারের সংখ্যা ১ লাখ ৩৬ হাজার। আসন্ন ঈদুল আজহায় কোরবানির জন্য এসব খামারে গরু ও মহিষ প্রস্তুত রয়েছে ৪৬ লাখ। ছাগল ও ভেড়া প্রস্তুত রয়েছে ৭২ লাখ। সব মিলিয়ে ১ কোটি ১৮ লাখ পশু প্রস্তুত রয়েছে। এর মধ্যে কোরবানি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে ১ কোটি ১০ লাখ পশুর।
এ বিষয়ে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. হীরেশ রঞ্জন ভৌমিক বলেন, বাড়তি মজুদের সম্ভাবনায় খামারিদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় কোরবানিযোগ্য গবাদিপশুর আমদানিকে নিষিদ্ধ করেছে। পাশাপাশি সারা দেশে কোরবানির হাটে স্বাস্থ্যসম্মত পশুর সরবরাহ ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের যাবতীয় উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কোরবানির জন্য ৪০ লাখ গরু এবং ৬৯ লাখ ছাগল-ভেড়া সরবরাহের পূর্ণ প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। বাজারে সুস্থ সবল ও হৃষ্টপুষ্ট পশু সরবরাহ নিশ্চিত করতে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট মাঠকর্মীরা ইউনিয়ন ও গ্রাম পর্যায়ে আগে থেকে এই প্রস্তুতির কাজ শুরু করেছেন বলে তিনি জানান।
পরিসংখ্যান বলে, এর আগে গত বছরের ঈদুল আজহায় দেশে কোরবানিযোগ্য গবাদিপশুর মোট সংখ্যা ছিল ১ কোটি ১৫ লাখ। এর মধ্যে কোরবানি হয়েছিল ১ কোটি ৫ লাখের কাছাকাছি। সে হিসাবে এবার কোরবানির পশু উদ্বৃত্তের সংখ্যাও হবে গত বছরের তুলনায় তিন লাখ বেশি।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, এই মুহূর্তে দেশে গরু ও মহিষ মজুত আছে আড়াই কোটি। এর মধ্যে গাভী বা বকনা এক কোটি ২০ লাখ। বাকি এক কোটি ৩০ লাখ এঁড়ে ও দামড়া। এই এক কোটি ৩০ লাখের মধ্যে একবছর বয়সী গরু রয়েছে ৬৫ লাখ। বাকি ৬৫ লাখ কোরবানি করা যেতে পারে, তবে সব গরু বাজারে আসবে না।
ঈদ সামনে রেখে এ সমীকরণ মেলাতে ব্যস্ত সরকার, খামারি, গরু ব্যবসায়ী এবং ক্রেতা সাধারণ। আবার এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশের চামড়া শিল্পও। কেননা, কোরবানিতেই সংগৃহীত হয় সারা বছরে মোট চাহিদার অর্ধেক চামড়া।
গত বছরের মার্চ মাসে সীমান্ত এলাকা পরিদর্শনকালে অবৈধভাবে গরু পাচার বন্ধে কঠোর নির্দেশনা দেন ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং। এরপর থেকে সীমান্ত দিয়ে গরু আসা কমতে থাকে। গত কোরবানিতে ভারত থেকে গরু সরবরাহ ছিল তুলনামূলকভাবে অনেক কম। তবে এত কিছুর পরও বৈধ-অবৈধ পথে গরু এসেছে এবং এখনও আসছে।
২০১৪ সালে ভারতের তত্কালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের (বর্তমানে প্রতিরক্ষামন্ত্রী) গোরক্ষা নীতির ধারাবাহিকতায় দেশটি থেকে গরু আমদানিতে ভাটা পড়ে। এরই ভিত্তিতে গরু-ছাগল পালনে স্বয়ম্ভরতা অর্জনের ওপর জোর দেয় সরকার। স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদন বাড়ায় বর্তমানে এ আমদানি নির্ভরতা কাটিয়ে উঠছে বাংলাদেশ।
সূত্রমতে, রাজশাহী, যশোর, খুলনা, সিলেট এবং চট্টগ্রামের সীমান্তবর্তী ৩১টি করিডোর দিয়ে প্রতিদিনই আসছে ভারতীয় গরু। অবৈধপথে গরু আসা থেমে নেই। সীমান্তের বিভিন্ন পথে প্রচুর গরু এসে থাকে। এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না বলে মনে করছেন গরু ব্যবসায়ীরা।
বর্তমানে বাজারে ছোট আকৃতির গরু বিক্রি হচ্ছে ৪০-৫০ হাজার টাকা। মাঝারি আকৃতির গরু ৫৫-৮০ হাজার এবং বড় গরু ৮৫ হাজার থেকে এক-দেড় লাখে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া কিছু গরু সাড়ে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে ছোট আকৃতির মহিষ বিক্রি হচ্ছে ৫০-৮০ হাজার টাকা। মাঝারি আকৃতির মহিষ ৮৫ হাজার থেকে এক-দেড় লাখ এবং বড় মহিষ বিক্রি হচ্ছে দুই-তিন লাখ টাকায়। এছাড়া ছোট খাসি বিক্রি হচ্ছে ৬-১০ হাজার টাকায়। মাঝারি আকৃতির খাসি ১১-২০ হাজার এবং বড় আকৃতির খাসি বিক্রি হচ্ছে ২১-৩০ হাজার টাকায়। তবে এবারের কোরবানি ঈদে গরু-মহিষের দাম ১০ ভাগ কমতে পারে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।
তারা বলছেন, এবার ছোট আকৃতির গরুর দাম হতে পারে ৩৫-৪৫ হাজার টাকা। মাঝারি আকৃতির গরু ৫০-৬৫ হাজার টাকা এবং বড় গরু বিক্রি হতে পারে ৭০ হাজার থেকে শুরু করে দুই লাখ বা তারও বেশি দামে। অন্যদিকে ছোট আকৃতির মহিষ বিক্রি হতে পারে ৪০-৬০ হাজার টাকায়। মাঝারি আকৃতির মহিষ বিক্রি হতে পারে ৬৫ থেকে এক লাখ টাকায় এবং বড় আকৃতির মহিষ বিক্রি হতে পারে দেড় লাখ থেকে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত। তবে খাসির দাম অপরিবর্তিত বা কিছুটা বাড়তেও পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এছাড়া বাজারে ২-৩ লাখ টাকায় দুম্বা, ৮-১০ লাখ টাকায় উট পাওয়া যাচ্ছে। ঈদের বাজারে দুম্বা বা উটের দাম অপরিবর্তিত থাকতে পারে বা কিছুটা বাড়তেও পারে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।