• ঢাকা
  • রবিবার, ১৭ই নভেম্বর, ২০১৯ ইং | ২রা অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | ১৯শে রবিউল-আউয়াল, ১৪৪১ হিজরী

সকাল ৮:১৫

ডেঙ্গু মহামারীর শঙ্কায় দেশ


তরিক শিবলী

* ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা সাড়ে তিন লাখ ছাড়িয়েছে
*দুই সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন ও আতিকুল ইসলাম সমালোচনায়
*২৪ ঘন্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৯২৪ জন রোগী
*এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ২৬ জনের মৃত্যু
*আসন্ন ঈদে প্রায় অর্ধকোটি লোক ঢাকা ছাড়বে তখন ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কায় দেশ

আগের সব রেকর্ড ভেঙে এবার মাত্র ২৪ ঘন্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৯২৪ জন রোগী। যা এইবছরের একদিনে সর্বোচ্চ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ইমার্জেন্সি অপারেশনস সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের প্রাপ্ত প্রতিবেদনে সোমবার এ তথ্য জানানো হয়েছে।
চলতি বছরের এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে ২৬ জনের । বিশেষ করে রাজধানীতে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়েই চলছে। এর সংখ্যা এতটাই বেড়েছে যে, এরই মধ্যে ডেঙ্গু রোগী সাড়ে তিন লাখ ছাড়িয়ে গেছে।
ভরা মৌসুমে বা আগস্ট মাসে এ পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার তথ্য বিশ্লেষণ করে অনুমিত সংখ্যা নিশ্চিত হওয়া গেছে। ডেঙ্গু আক্রান্ত সব রোগী সরকারি নজরদারির মধ্যেও নেই।এসুযোগে সারা দেশে ডেঙ্গু জ্বর মহামারি আকার ধারণ করছে। সামনে প্রায় দুই মাস ডেঙ্গুর ঝুঁকি রয়েছে। বছরের প্রথম ৫ মাস ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব কম হলেও জুন ও জুলাই মাসে আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে।
কয়েক বছরের তুলনায় এবার রাজধানীসহ সারাদেশে ডেঙ্গু জ্বর মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। ঢাকায় ডেঙ্গুজ্বরের প্রকোপ অতীতের যেকোন সময়ের তুলনায় বেশি। ফলে ডেঙ্গুজ্বর নিয়ে মানুষের মাঝে প্রবল উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
আসন্ন ঈদে যখন প্রায় অর্ধকোটি লোক ঢাকা ছাড়বেন তখন দেশের বিভিন্ন জায়গায় ডেঙ্গু রোগীদের ছড়িয়ে পড়ার সঙ্কা রয়েছে। আর এতে করে এ রোগে আরো বেশি মানুষ আক্রান্ত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ কথা বিবেচনা করে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীদের ঢাকা না ছাড়ার পরামর্শ দিয়ে বিশেষজ্ঞরা। তাছাড়া মশা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ ও প্রয়োজনীয় ওষুধ ছিটাতে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
ঢাকার বাইরে ৬১১ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক ডা. সানিয়া তহমিনা। তিনি বলছেন, বিষয়টি উদ্বেগজনক। ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে দফতরে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ তথ্য জানান।
ডা. সানিয়া তহমিনা বলছিলেন, ঢাকার বাইরে ডেঙ্গু ছড়িয়ে যাওয়া ঠেকাতে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। আজকে থেকে ডেঙ্গু পরীক্ষার কিট ঢাকার বাইরে পাঠানো হচ্ছে। শাহজালাল বিমানবন্দর, বেনাপোল, চট্টগ্রামে ডেঙ্গু পরীক্ষার ব্যবস্থার পাশাপাশি সচেতনতামূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, গতকাল স্বাস্থ্য অধিদফতর বেসরকারি হাসপাটাল, ক্লিনিকগুলোর জন্য যে মূল্য নির্ধারণ করছে, তা পালন করা হচ্ছে কি না, তা তদারকি করার জন্য ১০টি মনিটরিং টিম কাজ করছে।

জানা গেছে, ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা সহজসাধ্য করতে সরকারি হাসপাতালে এ রোগের পরীক্ষা ও ওষুধপত্র বিনামূল্যে করার ঘোষণা দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। একই সঙ্গে বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিকগুলোতে ডেঙ্গু পরীক্ষার ফি সর্বোচ্চ ৫ শ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি দেশের ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্যালাইন ও ওষুধের দাম না বাড়াতে অনুরোধ করা হয়েছে।
সরকারি হিসাবে বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি আছেন ২৯২১ জন ডেঙ্গু রোগী। এর মধ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (ঢামেক) ৫৪০ জন, মিটফোর্ড হাসপাতালে ২২৪, ঢাকা শিশু হাসপাতালে ৯৪, সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২১৭, হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট হাসপাতালে ২০৭, বারডেমে ৩৯ জন।
এছাড়া ঢাকার বাইরে গাজীপুরে ৭৩ জন, মুন্সীগঞ্জে ৭, মানিকগঞ্জে ১৯, কিশোরগঞ্জে ৫৪, নারায়ণগঞ্জে ১৩, চট্টগ্রামে ৫৭, ফেনীতে ৫১, কুমিল্লায় ১, চাঁদপুরে ৩৭, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ১০, লক্ষ্মীপুরে ৮, নোয়াখালীতে ৯, কক্সবাজারে ৬ জন ভর্তি আছেন। খুলনায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৩১ জন, কুষ্টিয়ায় ৩২, যশোরে ২২, ঝিনাইদহে ১১, বগুড়ায় ৬০, পাবনায় ২৯, সিরাজগঞ্জে ৮, নওগাঁয় ২, রাজশহীতে ৩৮, বরিশালে ৩৫ এবং সিলেটে ১৩ জন।
এদিকে ডেঙ্গু রোগীর পরীক্ষার জন্য প্রাইভেট হাসপাতালে ৫০০ টাকার বেশি যেন নিতে না পারে, তা তদারকি করতে সরকারকে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট
ব্যাপক আকারে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ায় ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন ও আতিকুল ইসলাম সমালোচনায় রয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে দল সমর্থিত দুই মেয়রকে অভয় দিয়ে নার্ভাস না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোহাম্মদ নাসিম।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কথা কম বলে মশা নিধনে মনোযোগী হতে ঢাকার দুই মেয়রকে পরামর্শ দিয়ে ১৪ দলের মুখপাত্র মোহাম্মদ নাসিম বলেন, সিটি করপোরেশনের মেয়রদের বলব, অহেতুক, অযৌক্তিক কথা না বলে ডেঙ্গুর উৎস, মশা দমনে সমন্বিতভাবে কাজ করুন। কম কথা বলে ডেঙ্গু জ্বরের কারণ এডিস মশার উৎস ধ্বংস করতে কাজ করুন।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন রাজধানীর ডেঙ্গু পরিস্থিতি ‘উদ্বেগজনক’বলে স্বীকার করেছেন।
গত মাসে ঢাকায় ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবের পর থেকেই তা ‘নিয়ন্ত্রণে’আছে বলে দাবি করে আসছিলেন মেয়র সাঈদ খোকন।
ডেঙ্গু আক্রান্তের তথ্য নিয়ে সংবাদমাধ্যমে আসা প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করার পাশাপাশি ডেঙ্গু নিয়ে ‘ছেলেধরার মতো গুজব’ছড়ানো হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে থাকা ঢাকা দক্ষিণের মেয়র এবার সাংবাদিকদের বললেন, প্রতিদিনই ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। ডেঙ্গু পরিস্থিতি দিন দিন অবনতির দিকে‘তবে আমরা জানপ্রাণ দিয়ে চেষ্টা করছি যাতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন।সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় অচিরেই আমরা নগরীকে ডেঙ্গুমুক্ত করতে সক্ষম হব।’
মেয়র সাঈদ খোকন হাসপাতালের পুরুষ ও শিশু ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন ডেঙ্গু আক্রান্তদের খোঁজ নেন।ডেঙ্গুতে ভয় পাওয়ার ‘কিছু নেই’ বলে তাদের আশ্বস্ত করেন তিনি।
পরে ডেঙ্গু আক্রান্তের খবর দেয়ার পাশাপাশি সুস্থ রোগীদের তথ্য তুলে ধরতে সাংবাদিকের প্রতি আহ্বান জানান সাঈদ খোকন।
তিনি বলেন, ‘রোগী বৃদ্ধির খবর প্রকাশের পাশাপাশি সুস্থ হয়ে ফিরে যাওয়াদের খবর প্রকাশ করলেও ভালো হয়। এতে মানুষের মাঝে সুস্থ হয়ে ওঠার ব্যাপারে বিশ্বাস তৈরি হবে।’
আগামী সোমবার থেকে সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিনামূল্যে ‘অ্যারোসল’সরবরাহের ঘোষণা দেন তিনি।