• ঢাকা
  • শনিবার, ১৯শে অক্টোবর, ২০১৯ ইং | ৪ঠা কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | ১৯শে সফর, ১৪৪১ হিজরী

দুপুর ১২:৪৮

ছাত্রলীগের কোন্দলে ঝিনাইদহ ভেটেরিনারি কলেজ অনির্দিষ্টকালের বন্ধ ঘোষনা


সমস্যায় জর্জরিত ও আইনি জটিলতায় অনিশ্চয়তার মুখে শিক্ষার্থীরা

ঝিনাইদহ সংবাদদাতা: ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল আর আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সংঘর্ষে অনির্দিৃষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে গেছে সমস্যায় জর্জরিত ঝিনাইদহ সরকারী ভেটেরিনারি কলেজ। গত দেড়মাস ধরে অচলাবস্থায় পড়ে আছে শিক্ষা কার্যক্রম। অনিশ্চয়তার মুখে শিক্ষার্থীরা। আছে আইনি জটিলতাও। দ্রুত সমাধানের উপায়ও দেখছেননা কেউ।এ অবস্থায় কলেজটিতে সেশনজটসহ নানা জটিল সমস্যায় পড়ার আশঙ্কা করছে শিক্ষার্থীরা।

জানা গেছে, কলেজটির শিক্ষাকার্যক্রম শুরুর পর থেকেই বিভিন্ন দাবীতে ছাত্রদের আন্দোলন চলে আসছিল। প্রথমে তারা কলেজটিকে স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় করার দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। পরে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পৃথক ফ্যাকাল্টি করার দাবি করে। এ নিয়ে তারা বিক্ষোভ সমাবেশ ও সড়ক অবরোধ কর্মসূচিও পালন করে। শিক্ষার্থীদের অব্যাহত দাবির মুখে আর ছাত্রলীগের নেতৃত্বের প্রকাশ্য দ্বন্দ্বের এক পর্যায়ে কলেজর সার্বিক অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। আন্দোলনের মুখে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা বিবেচনায় গত ১মার্চ থেকে কর্তৃপক্ষ কলেজটি অনিদর্িৃষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষনা করে।

এদিকে কলেজ স্থাপন প্রকল্পের মেয়াদ গত ৩১ ডিসেম্বর শেষ হয়ে যায়। তারপরও মন্ত্রণালয় থেকে এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি। একারনে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় অনুষদভূক্ত কিংবা স্বতন্ত্র কলেজ হিসেবে এগোতে পারছে না প্রতিষ্ঠানটি।

কলেজ সূত্রে জানা যায়, ঝিনাইদহ শহর থেকে ৯ কিলোমিটার দূরে হলিধানি এলাকায় দুটি প্রকল্পের আওতায় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে কলেজটি স্থাপিত হয়। এরপর ২০১৩-২০১৪ শিক্ষাবর্ষে ছাত্র ভর্তি করে একাডেমিক কার্যক্রম শুরু করা হয়। সে সময়ে স্থানীয় ৬ জনকে অতিথি শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ দেয়া হয়। ডেপুটেশনে আসা ১৯ জন কর্মকর্তা পাঠদান ও একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করেন। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানে ৬টি ব্যাচে বিভিন্ন বিভাগে সাড়ে ৩ শতাধিক শিক্ষার্থী রয়েছে।

কলেজের ছাত্র প্রনব সাহা জানান, দক্ষ প্রাণী চিকিৎসক হওয়ার আশায় এই কলেজে ভর্তি হয়েছিলাম। তবে সে স্বপ্ন এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। কলেজটিতে আছে সুন্দর অবকাঠামো । তবে নেই দক্ষ ও পর্যাপ্ত শিক্ষক। শিক্ষা উপকরণেরও অভাব রয়েছে। ল্যাবরেটরি আছে কিন্তু রাসায়নিক উপকরণ নেই। ইন্টার্ন প্রাণী চিকিৎসকদের কোনো সম্মানী ভাতার ব্যবস্থাও নেই।

কলেজের ছাত্রী ইসরাত জাহান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় সমমর্যাদার এই কলেজটিতে কোনো অধ্যাপক কিংবা সহযোগী অধ্যাপক নেই। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের জেলা ও উপজেলা ভেটেরিনারি সার্জন ও অতিথি শিক্ষক দিয়ে একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। অন্যদিকে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের আন্ডারগ্রাজুয়েশন লেভেল শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার আইনি কোনো বৈধতাও নেই। আবার কলেজটি পরিচালনার কোনো সুনিদর্িৃষ্ট নীতিমালাও নেই। যার ফলে শিক্ষাকার্যক্রম শুরুতেই নানা সমস্যার সম্মুখীন। এ অবস্থা চলতে থাকলে সেশনজট আরও বাড়বে বলে অভিযোগ । এমন অবস্থায় নিজেদের ভবিষৎ নিয়েও শংকা প্রকাশ করেন তিনি।

যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. আনোয়ার হোসেন জানান, ঝিনাইদহ ভেটেরিনারি কলেজটি যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত। শিক্ষার্থীদের অনেক দিনের দাবি অনুষদভূক্ত করার। আমাদের দিক থেকে কোনো সমস্যা নেই। কলেজটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে হস্তান্তর করলে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের মাধ্যমে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষদভূক্ত হয়ে যাবে। এর মাধ্যমে কলেজটি বিশ্ববিদ্যালয় আইনে পরিচালিত হবে।

এদিকে গত ২৫ ফেব্রুয়ারী শিক্ষার্থীরা মূল আন্দোলনের দাবির সাথে আরও কয়েকটি দাবি যুক্ত করে। এরপর তারা প্রশাসনিক ও একাডেমিক ভবনের তালা ঝুলিয়ে কলেজটি অচল করে দেয়। শিক্ষক-কর্মচারী এবং শিক্ষার্থীদের মাঝে ভয়ভীতি ছড়িয়ে পড়ে। এসময় ছাত্ররা দুটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে পড়ে। একপক্ষের নেতৃত্ব নেয় কলেজটির ছাত্রলীগ নেতা লুবান মাহমুদ মিশুক ও অন্যপক্ষের নেতৃত্ব দেন ফাহিম হোসেন।

কলেজটি যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে করার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়াকে কেন্দ্র করে শুরু হয় ছাত্রলীগের মধ্যে বিরোধ। ঘটে সংঘর্ষের ঘটনা। এতে আহত হয় প্রায় ১০ জন ছাত্র। অবশেষে কলেজ কর্তৃপক্ষ প্রশাসনের সাথে পরামর্শ করে কলেজটি ১ মার্চ থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষনা করে।

কলেজের ছাত্র ওবাইদুল্লাহ বলেন, ছাত্রলীগের দ্বন্দ্বের কারণে আমাদের মত সাধারণ শিক্ষার্থীর লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গেছে। ক্লাস হচ্ছে না। পরীক্ষা হচ্ছে না। পিছিয়ে পড়ছি আমরা। তাই দ্রুতই ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার।

অপর শিক্ষার্থী সোহাগ তালুকদার জানান, প্রায় দেড় মাস যাবৎ কলেজটি বন্ধ রয়েছে। ক্লাস-পরীক্ষা হচ্ছে না। এতে আমাদের সেশনজটসহ নানা সমস্যায় পড়তে হবে। দ্রুত এ সমস্যা সমাধান করে কলেজটি চালু করার দাবী জানান তিনি।

এদিকে ঝিনাইদহ ভেটেরিনারি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ড. অমলেন্দু ঘোষ বলেন, শিক্ষার্থীদের দাবীর বিষয়টি লিখিতভাবে প্রাণি সম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে জানিয়েছি। এরপর মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত আসার উপর সমাধান নির্ভর করছে। তবে তা সময় সাপেক্ষ ব্যাপার।

অন্যদিকে ছাত্রলীগের দু’পক্ষের সংঘর্ষের ঘটনায় দুটি মামলা হয়েছে। বিবাদমান দু’পক্ষকে এক টেবিলে আনা যাচ্ছে না। তবে আশা করছি দ্রুত এ সমস্যা সমাধান করে কলেজটি চালু করা যাবে।

কলেজের সাধারণ শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং শিক্ষানুরাগীরা ঝিনাইদহে গড়ে ওঠা দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সম্ভাবনাময় কলেজটি দ্রুত বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষদ হিসাবে ঘোষনা ও ছাত্রলীগের দ্বন্দ্ব নিরসন করে অবিলম্বে শিক্ষা কার্যক্রম চালুর আহ্বান জানান। এ অঞ্চলের সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা দক্ষ প্রাণী চিকিৎসক গড়ার কারিগর হিসেবে খ্যাতি পাবে প্রতিষ্ঠানটি।