• ঢাকা
  • সোমবার, ১৬ই সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং | ১লা আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | ১৬ই মুহাররম, ১৪৪১ হিজরী

বিকাল ৪:৪৪

ক্রিকেট তপস্যায় মহসিনের স্বপ্নপূরণ


নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশ হুইল চেয়ার ক্রিকেট টিম এখন পর্যন্ত ৫টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে অংশগ্রহণ করেছে। এর মধ্যে তিনটিতে চ্যাম্পিয়ন, দুটিতে রানারআপ হয়। এ দলের অর্জনের পেছনে যার সবচেয়ে বেশি ভূমিকা তিনি হলেন গাজীপুরের মহসিন। পুরো নাম মো. মহসিন। বাংলাদেশ হুইল চেয়ার ক্রিকেট টিমের প্রতিষ্ঠাতা ও ক্যাপ্টেন। যিনি একাই তার লালিত স্বপ্নকে ঈপ্সিত লক্ষ্যে নিয়ে গেছেন।

এ সফলতার পেছনে রয়েছে এক দীর্ঘ কাহিনী। প্রথম থেকেই শুরু করা যাক। মাত্র ছয় মাস বয়সে মহসিনের পোলিও হয়। বাসার পাশেই প্রাইমারি স্কুল। ছোটবেলায় মহসিন দেখত ছোট ছোট বাচ্চারা ক্রিকেট খেলত। ওই অবস্থায় খেলা শুরু করে সে। শারীরিক সমস্যার কারণে প্রথম দিকে কেউই তাকে খেলায় নিতে চাইত না। অনেকেই তিরস্কার করত। বলত এই ছেলেকে নিয়ে কি হবে। ও তো ভালো খেলতে পারবে না।

জীবিকার তাগিদে প্রথমে মহসিন দোকান চালাত। তার দোকানটি ছিল ফোন-ফ্যাক্সের। এভাবেই চলতে থাকল। হাল ছেড়ে দেয়নি। ২০১০ সালে ফেসবুকে হুইল চেয়ারে বসা ছবি পোস্ট করে মহসিন। ইন্ডিয়ার এক ভদ্রলোক ছবিটি দেখেন। নাম হারুনুর রশীদ। তিনি ‘ভারতের ডিসেবল স্পোর্টিং সোসাইটি’-এর ফাউন্ডার।

তিনি বললেন, তোমাদের বাংলাদেশে একটি টিম কর। তিনি আরো জানালেন, শারীরিকভাবে ৪০% ডিসেবল হলেই সে এই টিমে খেলতে পারবে। এই টিমের আলাদা স্পোর্টস হুইল চেয়ার থাকবে। এই উৎসাহে সবার সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করল মহসিন। কিন্তু কোনো সঠিক পথ খুঁজে পাচ্ছিলেন না।

অনেক ভেবেচিন্তে গেলেন সিআরপিতে। সাহায্য চাইলেন। সেখানে মিজানুর রহমান কিরণের সহায়তায় সিআরপির ভেলরির সঙ্গে দেখা করলেন মহসিন। এরই মধ্যে ২০১৩ সালে হারুনুর রশীদ বাংলাদেশে আসেন। সিআরপির সঙ্গে হারুনুর রশীদের আনুষ্ঠানিক আলাপের পর সিদ্ধান্ত হয় বাংলাদেশ ভারতের টিমের সঙ্গে খেলবে। এটি হবে ফ্রেন্ডলি ম্যাচ। কিন্তু এ ম্যাচে বাংলাদেশের পক্ষে কারা খেলবে। মহসিন ফেসবুকে খেলোয়াড় খোঁজা শুরু করলেন।

এভাবে মোট ৩২ জনের টিম হলো। সিআরপিতে ক্যাম্প করা হলো। সে বছর ভারতের টিম বাংলাদেশে এলো। বাংলাদেশের ৩২ জন খেলোয়াড়ের মধ্য থেকে চূড়ান্তভাবে ১৬ জনকে বাছাই করা হয়। বিকেএসপিতে প্রথম ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। ভারতের সঙ্গে তিনটির মধ্যে দুটি ম্যাচ হারে বাংলাদেশ। হারুনুর রশীদ মহসিনকে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন। অনেক খুঁজেও ক্রিকেট বোর্ডের কারো সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি মহসিন। তখন ফেসবুকে জাভেদ আলী শাওন নামে একজনের সঙ্গে পরিচয় হয়। উনি বাংলাদেশ ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে যুক্ত।

জাভেদ আলী শাওন মহসিনকে ক্রিকেটার নাইমুর রহমান দুর্জয়, আকরাম খানের নাম্বার দিলেন। মহসিন তাদের সঙ্গে সার্বিক বিষয়টি শেয়ার করলেন। তারা জানালেন, এ বিষয়ে বিশেষ কিছুই জানেন না। তারা বললেন, এভাবে হবে না, প্রথমে তোমাদের কিছু করে দেখাতে হবে।

পরে মহসিন বাংলাদেশ ব্লাইন্ড ক্রিকেট টিম নিয়ে যারা কাজ করেন তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তারা জানান, সংগঠন করতে গেলে ৭০-৮০ হাজার টাকা লাগবে।

এরই ধারাবাহিকতায় প্যারা অলিম্পিকের ইঞ্জিনিয়ার মাকসুদুর রহমানের সঙ্গে দেখা করে মহসিন পুরো বিষয় খুলে বলেন। পরে ড. শেখ আবদুল সালামকেও (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্নালিজমের প্রফেসর) জানানো হলো। ২০১৪ সালের ঘটনা। পরে নতুন একটি সংগঠন হলো। নাম বাংলাদেশ ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন ফর ফিজিক্যাল চ্যালেঞ্জড। সংগঠনের প্রেসিডেন্ট হলেন ড. শেখ আবদুল সালাম, সেক্রেটারি মাকসুদুর রহমান। মহসিন জয়েন্ট সেক্রেটারি। এ নামে সংগঠনটি কাজ করবে। এ সংগঠনের সঙ্গে হারুনুর রশীদের আলোচনা হয়। তিনি প্রস্তাব দেন, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত ৫টি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলবে।

এখন বাংলাদেশ দলের খেলোয়াড় গোছানোর পালা। মহসিন ফেসবুকে আরো খেলোয়াড় সংগ্রহ করলেন। মোট ৬২ জন খেলোয়াড় পাওয়া গেল। ক্রিকেট কোচ জসীমউদ্দীন বাংলাদেশ দলের কোচ হলেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্জেন্ট জহুরুল হক মাঠে ৬২ জনের মধ্য থেকে শেষ পর্যন্ত ১৬ জনকে নির্বাচিত করা হলো। এই দলের ভারত সফরের জন্য মহসিন নিজের দোকান বিক্রি করে ২৫ হাজার টাকা দেন। আরো স্পন্সরের ব্যবস্থা হলো। ভারতের মাটিতে বাংলাদেশ দল তাদের হারিয়ে ২-১-এ সিরিজ জেতে। মহসিনের নেতৃত্বে বাংলাদেশ দল ‘তাজমহল ট্রফি’ জেতে। জুন মাসে বাংলাদেশ দল দেশে ফিরে আসে।

জুলাই মাসের ১৬ তারিখে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই দলকে ডাকেন। তাদের সংবর্ধনা দেওয়া হয়। মহসিন ও তার দল ট্রফিটা নিয়ে যায়। প্রধানমন্ত্রী দেখে খুব খুশি হন। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মহসিনের কথা হয়। প্রধানমন্ত্রীকে জানানো হয় মহসিনের কারণেই আজ বাংলাদেশ দল এই সম্মান বয়ে এনেছে। সেদিনের কথা এখনো ভুলতে পারেন না মহসিন। বলেন, ‘ওই দিনটা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্ত। প্রধানমন্ত্রী আমার মাথায় হাত দিয়ে দিলেন। প্রধানমন্ত্রী প্রত্যেক খেলোয়াড়কে এক লাখ করে টাকা দিলেন। আমাদের অ্যাসোসিয়েশনে এক কোটি টাকা অনুদান দিলেন। আমাদের মাঠ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেন।’

এভাবে মহসিনের দল যখন মিডিয়ায় আলোচিত হয় তখন তার সঙ্গে যোগাযোগ করে আইসিআরসির মাহফুজুর রহমান। মাহফুজুর রহমান মহসিনদের নিয়ে একটা ট্যালেন্ট হান্ট আয়োজন করতে চাইলেন। পরবর্তী সময়ে তারা ইংল্যান্ড থেকে ডিসেবল ক্রিকেটের কোচ মার্টিনকে নিয়ে এলেন। বাংলাদেশে তিন দিনের একটা ওয়ার্কশপ হয়। সেখানে জানানো হয়, নিয়মানুযায়ী ডিসেবল ক্রিকেট টিমে হুইল চেয়ার খেলোয়াড় থাকতে পারবে না।

এক অর্থে এ সিদ্ধান্ত শুনে মহসিন হতাশ হলেও উদ্যোম কিন্তু কমে যায়নি। মহসিন সিদ্ধান্ত নিলেন শুধু হুইল চেয়ার ক্রিকেট টিম করবেন। মহসিন ইমাগো স্পোর্টস ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট নামে একটি ফার্মের অ্যাম্বাসেডার হন। তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় ন্যাশনাল লিগের আয়োজন করা হয়। মোট চারটি দল ছিল। সেগুলো হলো- ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী। প্রতি টিমে আটজন করে খেলোয়াড় ছিল। খুলনা টিম জয়ী হয়।

মোট ৩২ জনের মধ্য থেকে হুইল চেয়ার ক্রিকেট দলের জন্য চূড়ান্তভাবে ১৪ জন নির্বাচিত হয়। ২০১৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিমনেসিয়াম হলে ইন্ডিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশ হুইল চেয়ার ক্রিকেট টিমের সঙ্গে প্রথম খেলা অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ ২-১-এ সিরিজ জেতে। এটাই প্রথম ইন্টারন্যাশনাল হুইল চেয়ার ক্রিকেট টুর্নামেন্ট যাতে বাংলাদেশ জয়ী হয়।

২০১৭ সালে এ জয়ের সুবাদে জয় বাংলা ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড পান মহসিন। ২০১৮ সালে বাংলাদেশ দল নেপালে খেলতে যায়। ত্রিদেশীয় সেই টুর্নামেন্টে শুধু স্পোর্টস হুইল চেয়ার না থাকার কারণে বাংলাদেশ দল রানারআপ হয়।

২০১৮ সালে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশ দল মোট ছয়টি ম্যাচ খেলে পাঁচ ম্যাচে জয়ী হয়। ইউএস অ্যাম্বাসির প্রজেক্ট ‘ড্রিমস অন হুইলস’ পৃষ্ঠপোষকতায় ট্যালেন্ট হান্টের আয়োজন করা হয়। সেই হান্টে পুরো বাংলাদেশ থেকে ২০০’রও বেশি হুইল চেয়ার খেলোয়াড় পাওয়া যায়। মোট ক্লাব আছে চারটি। সেগুলো হলো- ঢাকা, চিটাগাং, রংপুর, রাজশাহী। আরো নতুন করে দুটি ক্লাব হচ্ছে। সেগুলো হলো- ময়মনসিংহ, খুলনা।

বাংলাদেশ দলের মূল লক্ষ্য ২০২০ সালের ‘হুইল চেয়ার ক্রিকেট ‘বিশ্বকাপ’। যেটি ইংল্যান্ডে হবে। বিশ্বকাপে মোট ৭টি দেশ খেলবে। দলগুলো হলো- বাংলাদেশ, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, আফগানিস্তান, ইংল্যান্ড, ভারত। খেলা হবে সব আউটডোরে।

মহসিন বলেন, ‘আমরা বিশ্বকাপ টার্গেট করে এগোচ্ছি। সবাই দোয়া করবেন। তবে আমাদের এত দূর আসার পেছনে যাদের নাম উল্লেখ না করলেই নয় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড, ইয়াং বাংলা, নাইমুর রহমান দুর্জয়, জাহিদ হাসান রাসেল, সামিট পাওয়ার, বাংলাদেশ বিমান, বেক্সিমকো, ইমাগো স্পোর্টস। তাদের প্রতি আমরা বিশেষ কৃতজ্ঞতা জানাই।’ অচিরেই ক্রিকেট বোর্ড থেকে মোট ২০টি স্পোর্টস হুইল চেয়ার পাবে দলটি।

একনজরে বাংলাদেশ হুইল চেয়ার ক্রিকেট টিম

মো. মহসীন (অধিনায়ক), নূর নাহিয়ান (ভাইস ক্যাপ্টেন), মো. মিঠু, সাজ্জাদ হোসেইন, মো. লিটন মৃধা, আহাদুল ইসলাম, মো. রিপন উদ্দীন, খন্দকার মইনউদ্দীন আহমেদ, মো. আসিফ হোসেইন, মো. মহিদুল ইসলাম, মো. রাজন হোসেইন, মো. মোরশেদ আলম, মো. রামীম শেখ, জাভেদ আহমেদ, স্বপন দেওয়ান।