• ঢাকা
  • শুক্রবার, ২০শে সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং | ৫ই আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | ২০শে মুহাররম, ১৪৪১ হিজরী

দুপুর ১:২৫

কুমিল্লায় দেশ সেরা আত্মনির্ভরশীল নারী মুরাদনগরের পারুল


কুমিল্লা (উত্তর) জেলা প্রতিনিধি : নারী সমাজের বোঝা নয়। কল্যাণের অগ্রযাত্রা ও আত্মনির্ভরতায় সৃষ্টি ও মমত্বের এক অপূর্ব সংমিশ্রন নারী। নারী অবজ্ঞা, উপেক্ষা বা ফেলে দেওয়ার নয়। দেশ জাতি ও সমাজ নির্মাণে এখন পুরুষের পাশাপাশি সমান তালে নারীরাও এগিয়ে চলেছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে আত্মনির্ভরশীল শ্রেষ্ঠ নারী হিসেবে জাতীয় পুরস্কার গ্রহণ ও অসাধারণ জীবনের গল্প রচনা করেছেন যে নারী, তিনি কুমিল্লা জেলার মুরাদনগর উপজেলার নবীপুর পূর্ব ইউনিয়নের বাখরনগর গ্রামের কাউছার আলমের স্ত্রী পারুল আক্তার(৩৫)। ২০০৪ সালে অভাবের সংসারে মাত্র বিশ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে নার্সারী কাজ করে সংসার চালাতে শুরু করেন তিনি। নিজের দক্ষতা ও মেধা দিয়ে কাজের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি শতাধিক নারী-পুরুষকে আত্ম নির্ভরশীল ও স্বাবলম্বী করে তুলেছেন তিনি। বর্তমানে তার এই নার্সারীর নাম দেন সবুজ নার্সারী।

প্রতিদিন তার কাছে প্রশিক্ষণ নিতে আসছে এলাকার যুবক-যুবতিরা। তার কর্মকান্ডে মুগ্ধ হচ্ছেন সবাই। বাড়ছে তার নার্সারীর চারা গাছের চাহিদা। পারুল আক্তার শুধু নিজের অবস্থানের পরিবর্তন করেই ক্ষান্ত নন, স্বপ্ন দেখেন অসহায় নারীদের পাশে দাঁড়ানোর।

বাখরনগর গ্রামের ইউনুছ মিয়ার মেয়ে পারুল আক্তার। প্রায় ২০ বছর আগে একই গ্রামে বিয়ে হয় পারুলের। বিয়ের পর থেকে স্বামী কোন কার্জকর্ম করতে না পারায় ছেলে মেয়েদের দুই বেলা খাওয়ানোর মতো আয় হতো না। অনের বাড়িতে জিয়ের কাজ করে চার সন্তানসহ ছয় জনের সংসার চালাতে খুব হিমশিম পেতে হতো। ছেলে মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ জোগাতে পারত না। এমনকি না খেয়ে কাটাতে হয়েছে দিনের পর দিন। ২০০৪ সালে স্থানীয় এক এনজিও থেকে নার্সারী নিয়ে সেখান থেকেই ২০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে শুরু হয় তার জীবন সংগ্রাম। নিজেকে আত্ম নির্ভরশীল করতে তার বুদ্ধি, কর্মদক্ষতা ও মেধা দিয়ে সুদক্ষ হাতে শুরু হয় নার্সারী ব্যবসা। এই নার্সারী কাজ করে সংসার চালাতে শুরু করে পারুল। এতে করেই আস্তে আস্তে তার অবস্থার পরিবর্তন শুরু হয়। বর্তমানে তিন বিঘা জমি নিয়ে চলছে তার নার্সারী। এখানে কি পাল, চেড়ী, মিরাক্কেল, এভিলিও, পাসীমন, মেঙ্গু সিটি, অলিফ, কীউই, আইনক্রীম ড্রিঙ্কস অরেঞ্জ লংগান, এডোকাডের মতো দেশি-বিদেশি শতাধীক জাতের চারা গাছ রয়েছে। এই নার্সারীতে দৈনিক ১৫ জন লোক কাজ করে। এখন মাসি আয় তার ৭০/৮০ হাজার টাকা। সংসারে আর নেই কোন প্রকার সমস্যা। এখন স্বামী সংসার নিয়ে অর্থনৈতিক ভাবে সাফল্য অর্জন করেছে পারুল। তবে স্থানীয় এনজিও সংস্থা অনেকটাই সহায়ক হিসেবে ভূমিকা রেখেছে তার জীবনে। সে সময় দৃঢ় মনোবল ও সাহসই ছিল তার বড় সঙ্গী।
পাশাপাশি এলাকার শত শত দুঃস্থ লোকদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। তার কাছে কাজ শিখে স্বাবলম্বী হয়েছেন অনেক নারী-পুরুষ।

পারুল আক্তার বলেন, “নারী হিসেবে ব্যবসা করার বিষয়টি সমাজ খুব সহজ ভাবে মেনে নেয় না। তাও আবার গ্রামের মত জায়গা। স্বামী ছাড়া পরিবার থেকে সে সময় কেউ পাশে দাঁড়ায়নি। স্বামীর তেমন কোন সম্পদ না থাকায় সে সময় অর্থই বড় বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়।” ২০ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে নার্সারী কাজ করে সংসার চালাতে শুরু করি। আমি কয়েক শতাধীক নারী পুরুষকে কাজ শিখিয়েছি। আজ অনেকে স্বাবলম্বি হয়েছেন। তবে এ ব্যবসাকে আরো বড় পরিসরে নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছে রয়েছে। সংগ্রাম করে এ পর্যন্ত এসেছি। বাকি জীবনটাও সংগ্রাম করে কাটিয়ে দেব অসহায়দের পাশে থেকে। সরকার আমার মতো এক নারীকে দেশ সেরা পদক দিয়ে নারী সমাজের সন্মান উজ্জল করেছেন।”

স্বামী আবু কাউছার বলেন, ‘আমি স্বামী হিসেবে সংসারের দায়ীত্ব নিতে পারিনি। আমার স্ত্রী পারুল নিজের কর্মদক্ষতায় আত্ম নির্ভরশীল নারী হিসেবে দেশ ও এলাকার মান উজ্বল করেছে। এজন্য সরকারকে ধন্যবাদ জানান তিনি।

মুরাদনগর উপজেলার পরিষদের চেয়ারম্যান ড. আহসানুল আলম সরকার কিশোর বলেন, সমৃদ্ধ দেশ গড়তে বৈসম্যহীন সমাজ গঠনে নারী উন্নয়নের বিকল্প নেই। জননেত্রী শেখ হাসিনা নারী উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছেন। জয়িতা খুজে বের করার মাধ্যমে নারী উন্নয়ন আরও সহজ হবে। পারুল আক্তার দেশ সেরা নারী খেতাবে ভূষিত হয়ে নারী সমাজকে জাগ্রতসহ মুরাদনগর উপজেলার মান উজ্জল করেছেন।’

পারুল আক্তার- ‘সবুজ নার্সারীর’ মাধ্যমে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা যুবক যুবতিদের এনে আত্ম নির্ভরশীল করতে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। প্রশিক্ষনের মাধ্যমে যুব সমাজ স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি নিজের ও দেশের অর্থনৈতিক ভাবে পরিবর্তনে বিপ্লব ঘটাচ্ছেন।