ঢাকা মঙ্গলবার, ২৩শে এপ্রিল, ২০১৯ ইং | ১০ই বৈশাখ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | ১৭ই শাবান, ১৪৪০ হিজরী

দুপুর ১২:০৫
সম্পাদকের কলামসম্পাদকের কলাম টপ

কি হবে ভারতের পরিনতি

শুধু বাংলাদেশ নয়, লোকসভার নির্বাচনকে ঘিরে পৃথিবীর সব দেশের নজর এখন ভারতবর্ষের দিকে ।পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গনতান্ত্রিক এ দেশটির ১৭তম লোকসভা নির্বাচনের প্রথম দফায় ১১ এপ্রিল ভোটগ্রহণ শুরু হবে। শেষ হবে আগামী ১৯ মে। সাত দফায় অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল ঘোষণা করা হবে ২৩ মে। লোক সভায় মোট ৫৪৩টি আসনে ভোট গ্রহন করা হবে।

ভারতের ফরমাল ভাষায় বললে, এটা (ফেডারেল) ইউনিয়ন ভারত রাষ্ট্রের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষের নির্বাচন। ভারতের রাজনীতিতে সবদল, বিভিন্ন সংগঠন, গ্রুপ, বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যক্তিত্ব- সবাই যা কিছু  করেছেন বা বলেছে তা আসন্ন এই নির্বাচনকে ঘিরেই ঘটছে। এর সব কিছুই এই নির্বাচনের ফলাফলকে কিভাবে পছন্দের রাজনৈতিক দলের পক্ষে প্রভাবিত করতে পারে- সে কথা মনে রেখেই করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে ভারতের দুই বিরোধীপক্ষ-বিজেপি এবং কংগ্রেস একে অপরের প্রতি আত্রুমনাত্মকভাবে কথা বলছেন। গতকাল সোমবার  বিজেপি নিজেদের নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করেছে। ইশতেহারে দলটি অযোধ্যার রামমন্দির নির্মাণের অঙ্গীকার করেছে ।ইশতেহারের নাম দেয়া হয়েছে ‘সংকল্পপত্র’। ৪৫ পাতার ইশতেহারের ‘নতুন ভারত’ গড়তে ৭৫টি অঙ্গীকার করা হয়েছে।বিজেপির ইশতেহারের মূলমন্ত্র হলো জাতীয়তাবাদ, হিন্দুত্ববাদ ও উন্নয়ন। বিজেপির ইশতেহার প্রকাশের পর বিরোধী দল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা হয়েছে।দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘ভারতবাসীর মনে আছে বিজেপির সাবেক প্রতিশ্রুতিগুলোর কথা। প্রত্যেক নাগরিককে ১৫ লাখ রুপি করে দেয়ার কথা ছিল তাদের। দুই কোটি মানুষের কম সংস্থানের কথা ছিল। কিন্তু কোনো প্রতিশ্রুতিই রাখতে পারেনি বিজেপি। দেশের জনগণ বিজেপিকে ক্ষমা করবে না।

পশ্চিমবঙ্গের মখ্যমন্ত্রী ও তৃণমুল কংগ্রেস নেত্রী মমতা ব্যনার্জি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বেলেছন, ‘নরেন্দ্র মোদিকে শুধু প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে নয় রাজনীতি থেকেও উচিত ছুড়ে ফেলে দেয়া।দুই প্রধান দলের কথার্বাতা শুনে মনে হচ্ছে, ভারতের রাজনীতি ভবিষ্যতের জন্য খুব একটা ভালোর দিকে যাবে না’।

ভারতের  রাজনৈতিক দলগুলো সমাজের নানা দল ও জোট গড়ে এক ইতিবাচক ঘোঁট পাকিয়ে চূড়ান্তভাবে দুটি বৃহত্তর জোটের পক্ষ হিসেবে হাজির হয়। এভাবে দুটি পক্ষ হিসেবে পুরো ভারতকে মেরুকরণ করে নিতে পছন্দ করা এক রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। যেমন মোটা দাগে গত ৩০ বছরের ‘ফেনোমেনা’ হলো, কংগ্রেসকে কেন্দ্রে রেখে ইউপিএ (ইউনাইটেড প্রগ্রেসিভ অ্যালায়েন্স) আর ওদিকে বিজেপিকে কেন্দ্রে রেখে এনডিএ (ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স) বলে দু’টি জোট আমরা দেখে আসছি। এবারও তাই হয়েছে। জোটের নেতৃত্ব নিয়ে এবার আগেই বিতর্ক ওঠার মূল কারণগুলোর প্রথমটা হলো, ২০১৪ সালে নির্বাচনে কংগ্রেস খুবই খারাপ ফল করেছিল। এর আগে কংগ্রেস সরকারে বা বিরোধী দলে যেখানেই থাক, জোট গঠন করে থেকেছে। কিন্তু তখন কংগ্রেস দলের আসন সংখ্যা কখনো ১১৪-এর নিচে যায়নি। অথচ গত  নির্বাচনে তা নেমে আসে ৪৮ আসনে, যা মোট আসনের ১০ শতাংশেরও কম। ফলে প্রথম সর্বভারতীয় দল হিসেবে কংগ্রেস এবারই অন্যান্য আঞ্চলিক দলের আসন সংখ্যার কাতারে নেমে আসে। যেমন, মমতার তৃণমূল দলের লোকসভায় আসন যা রয়েছে। এ ছাড়া লোকসভায় আঞ্চলিক দলগুলোর আসন সংখ্যার দিক দিয়ে একক দল হিসেবে মমতার দলই সবচেয়ে বড় (৪২ আসন)। ফলে বৃহৎ কংগ্রেস দল যেন মমতার আঞ্চলিক দলের কাতারে নেমে গেছে।

 এবারের নির্বাচনে বিজেপি ও নরেন্দ্র মোদির অবস্থা খুব শোচনীয় হতে পারে। কেন? কারণ মোদির পারফরম্যান্স। ভারতের রাজ্য বা প্রাদেশিক নির্বাচনে কেন্দ্র সরকার অর্থনীতিতে ভালো বা মন্দ করছে কি না এর তেমন প্রভাব পড়তে দেখা যায় না বললেই চলে। এটা মোদি সরকারের গত চার বছরে বিভিন্ন রাজ্য নির্বাচনের বেলায় দেখা গেছে। কিন্তু গত দুইবার কেন্দ্রের নির্বাচনে দেখা গেছে- আগের (কংগ্রেস ২০০৪-০৯) সরকারের অর্থনৈতিক সাফল্যের কারণে পরের বারও কংগ্রেস বিপুল ভোট পেয়েছে। আবার ইউপিএ-টু (২০০৯-১৪) সরকারের ব্যর্থতা দেখিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী (বিজেপি) দল ভোটে নিজের জন্য ভালো করার সম্ভাবনা জাগাতে পেরেছে। এ দুটি ক্ষেত্রেই নির্বাচনে মূল ফ্যাক্টর ছিল অর্থনৈতিক সাফল্য প্রদর্শন।  এবারের নির্বাচনে, বিজেপির মোদির আবার জয়লাভের সম্ভবনা থাকলেও গতবারের মত নয়-এটা বলা যায়। অর্থনীতিতে সাফল্যের বিচারে একটু পুরান বড় ইস্যু আছে। শুধু তাই নয়, নতুন দগদগে ইস্যুও আছে যা সামনের কয়েক মাসে ‘আরো দগদগে ঘা’হয়ে ওঠেছে।

একটু পুরনো ইস্যুটা হলো, মোদির ‘নোট বাতিলের’ সিদ্ধান্ত। মোদি সরকারের বিরাট ব্যর্থতা বলতে অবশ্যই সামনে আসবে ‘নোট বাতিলের’ সিদ্ধান্ত। ভারতের মুদ্রায় সবচেয়ে বড় নোট ছিল ৫০০ ও ১০০০ রুপির। এই দুই ধরনের সব নোটই বাতিল বলে ঘোষণা করেছিলেন মোদি। পুরান নোট ব্যাংকে দিলে বদলে নতুন নোট দিয়েছেন ঠিকই। কিন্তু নাম ঠিকানাসহ কে জমা দিচ্ছেন, তা বলতে হচ্ছে। তবে সবচেয়ে বিরক্তিকর হলো, মানুষের ব্যবসাবাণিজ্য, অফিস অথবা দিনমজুরি সব ধরনের কাজ ফেলে ব্যাংকে লাইন দেয়ায় সামগ্রিক অর্থনৈতিক তৎপরতায় বহু কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়েছিল। এতে ব্যবসাবাণিজ্যসহ সব অর্থনৈতিক তৎপরতা ও লেনদেন-বিনিময়ে ব্যস্ততা যে পর্যায়ে আগে ছিল অর্থনীতির সেই সাজানো বাগান এবার অর্ধেক হয়ে, বড় স্থবিরতার দিকে গড়াতে থাকে। মোদি আশ্বাস দিয়েছিলেন, রুপি বদলে নিতে আসলে নগদ রুপিতে সম্পদ রাখা কিংবা ট্যাক্স ফাঁকির সব এবার ধরা পড়বে। সরকারের অনুমান ছিল, ৮৫ শতাংশের বেশি রুপির মালিক ধরা পড়ার ভয়ে আর তা বদলে নিতে আসবে না, ফলে প্রায় ২৪০ হাজার কোটি রুপি রাষ্ট্রকে ফেরত দিতে হবে না, তাই বিপুল লাভ হবে। কিন্তু সবাইকে হতাশ করে দেখা গেল, ৯৯ শতাংশ ছাপানো মুদ্রাই ফেরত এসেছে। অর্থাৎ মাত্র ১ শতাংশ ফেরত আসেনি। এর মানে, সারা ভারতের জনগোষ্ঠীকে কষ্ট দিয়ে, বিশেষ করে গরিব মানুষকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিয়েও কোনো সুফল মেলেনি।

মোদির আর একটি ব্যর্থতা হলো , মোদি গত নির্বাচনে আশ্বস্ত করেছিলেন- কংগ্রেসের প্রথম জমানার (২০০৪-০৯) মতো ভালো অর্থনীতি তিনি গড়বেন। এ ছাড়া আর আরো বেশি কাজ সৃষ্টি করবেন। তার দেয়া নতুন টার্গেট ছিল, বছরে দুই কোটি লোকের কাজ সৃষ্টি করা। কিন্তু সমালোচকরা বলছেন, বাস্তবে দেখা যাচ্ছে উলটো গত চার বছর ধরে গড়ে ৭০ লাখ করে কর্মসংস্থান কমেছে। এটা কাজ সৃষ্টির ক্ষেত্রে গত আট বছরে সর্বনিম্ন। এছাড়াও ইরানের তেল বিক্রির ওপর মার্কিন অবরোধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল সরবরাহের বিপুল ঘাটতি, এই অভাবই দাম বৃদ্ধির কারণ। ২০১৬ সালে গড়ে ৩০ ডলারে নেমে আসা জ্বালানি তেল কিনেছিল ভারত। আর এখন তা ৮৪ ডলার এবং এ দাম ক্রমবর্ধমান।

অর্থনৈতিক সাফল্যের ইস্যু চাপা দেয়া বা পেছনে ফেলে দেয়ার উপায় নিশ্চয় মোদি-অমিত খুঁজবেন, তা বলাই বাহুল্য। এই আলোকেই অমিত শাহের মুসলমান নিধন, বাংলাদেশীদের ‘উইপোকা-তেলাপোকা’ বলে তুচ্ছ করে সম্বোধন এবং মুসলমানদের ‘অনুপ্রবেশকারী’ বলে গালাগালি- এসব কিছু ভরতের জনগন নিশ্চয় দেখবেন। বহুত্ববাদে বিশ্বাসী ভারতবর্ষের জনগন কি বিজেপির মতো একটি মৌলবাদী হিন্দুত্ববাদী দলকে আবরো ক্ষমতায় বসাবেন–এর উত্তর মিলবে আগামী মে মাসের ২৩ তারিখে।