• ঢাকা
  • শনিবার, ২২শে ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ইং | ৯ই ফাল্গুন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | ২৭শে জমাদিউস-সানি, ১৪৪১ হিজরী

সকাল ৬:২৭

কঠোর ব্যবস্থার মধ্যেও থেমে নেই ইয়াবা পাচার


নিজস্ব প্রতিবেদকঃ কক্সবাজার জেলার সীমান্ত উপজেলা টেকনাফে আশাতীত মাদক ও অস্ত্রবাজদের সাথে বন্দুকযুদ্ধ, আটক ও মামলা হওয়া সত্ত্বেও থেমে নেই ইয়াবা পাচার। একদিকে ইয়াবা পাচার অন্যদিকে তাদের সাথে পুলিশের কথিত বন্দুকযুদ্ধ, আটক ও মামলায় রীতিমতো আতঙ্ক ও উদ্বেগের মাঝে রয়েছে টেকনাফবাসী। তবে সীমান্ত উপজেলার পুলিশ, র‌্যাব, ও বিজিবি বলছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর থেকে কঠোরতর অভিযানের কারণে প্রায় ৭০ পার্সেন্ট ইয়াবা ব্যবসা কমে এসেছে।

জানা গেছে, গত ১৬ ফেব্রুয়ারি জল্পনা কল্পনা অবসান ঘটিয়ে ১০২ জন ইয়াবা ব্যবসায়ী আনুষ্ঠানিকভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আত্মসমর্পণ করেছেন। কিন্তু বন্ধ হয়নি ইয়াবার পাচার।

টেকনাফ থানা পুলিশের উদ্যোগে ইতিমধ্যে মাদক, জঙ্গি, সন্ত্রাস বিরোধী সভা সেমিনার প্রতিটি ইউনিয়ন ও পৌরসভায় চলমান রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় আগামি ৮ এপ্রিল হোয়াইক্যংয়ে মাদক বিরোধী সভার মাধ্যমে শেষ করা হবে এ সভা। পাশাপাশি ওয়ার্ড পর্যায়েও কমিটি করার উদ্যোগ নিয়েছে টেকনাফ থানা পুলিশ। এর পরেও আগের মতোই প্রতিনিয়ত আসছে ইয়াবা। তাই এখনো উদ্বেগ ও উৎকন্ঠা কাটেনি এলাকাবাসীর। তাদের দাবি ইয়াবা ব্যবসায়ীদের একাংশ আত্মসমর্পণ করলেও এখনো ধরা ছোঁয়ার বাইরে বেশিরভাগ ব্যবসায়ী। অনেক গডফাদার আছে যারা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। অথচ ইয়াবার তালিকায় এই প্রভাবশালী গ্রুপটিই সবার উপরে। তাদের থামানো না গেলে টেকনাফ ইয়াবা মুক্ত হবে না।

উল্টো আত্মসমর্পণের আশায় টেকনাফে যুক্ত হতে পারে নতুন নতুন ব্যবসায়ী। এই সমস্যা সমাধানে দ্রুতই তালিকার সবাইকে আইনের আওতায় এনে ইয়াবা ব্যবসার কিছুটা হলেও লাগাম টানা সম্ভব বলে মনে করেন স্থানীয়রা।

পাশাপাশি সীমান্তে নজরদারি বাড়ানো হলে ইয়াবার চালান আসা সম্ভব না। এজন্য বিজিবি ও কোস্ট গার্ডকে আরো সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তালিকা অনুযায়ী, টেকনাফের শীর্ষে রয়েছে সাবেক এক সাংসদের নাম। তার পরিবারের ১২ জন সদস্য আত্মসমর্পণ করেছেন। এমনকি টেকনাফ উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও তার ছেলে পৌরসভার কাউন্সিলর প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এছাড়াও টেকনাফ উপজেলার ভাইসচেয়ারম্যান মৌলভী রফিক উদ্দিন, বাহারছড়া ইউপি চেয়ারম্যান মৌলভী আজিজ উদ্দিনসহ ওই তালিকায় নাম থাকা বেশিরভাগ প্রভাবশালী রয়ে গেছেন ধরাছোয়ার বাইরে। এলাকাবাসীর দাবি তালিকা নাম থাকলেও যারা গ্রেপ্তার হয়নি তারাই নিয়ন্ত্রন করছে ইয়াবা ব্যবসা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক টেকনাফের বেশ কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, ইয়াবা ব্যবসা করে রাতারাতি ধনি হওয়ার আশায় টেকনাফের বেশিরভাগ লোক এ ব্যবসায় নাম লেখায়। বর্তমানে এটি অনেকটা হ্রাস পেয়েছে। কিন্তু কিছু প্রভাবশালী মহল ঠিকই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে টেকনাফের যে দুর্নাম সারা দেশে ছড়িয়ে পড়িয়েছে সেটি থেকে আমরা বেড় হতে পারছি না। কোথায় গিয়ে টেকনাফের পরিচয় দিতে মন চায় না। একমাত্র আইনশৃঙ্খলা বাহিনী চাইলেই এই সমস্যা থেকে আমাদের মুক্তি দিতে পারে।

আত্মসমর্পেেণর বিষয়ে তারা বলেন, যারা আত্মসমর্পণ করেছে তাদেরকে আমরা স্বাগত জানাই। কিন্তু তারা বেড় হয়ে আর ইয়াবা ব্যবসা করবে না এর গ্যারান্টি কে দিবে। আর তাদের সেন্ডিকেটগুলোই বা কোথায়? তাদেরকেও আইনের আওতায় এনে টেকনাফকে ইয়াবামুক্ত ঘোষণা করা হোক। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, আবারো দ্বিতীয় ধাপে আত্মসমর্পণ করবে ইয়াবা ও হুন্ডি ব্যবাসায়ীরা। এ নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে দফায় দফায় যোগাযোগ করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।

হোয়াইক্যং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ মাওলানা নুর আহমদ আনোয়ারী বলেন, আত্মসমর্পণ ইয়াবা পাচারের বন্ধের শেষ বিষয় বা সমাধান নয়। ইয়াবা পাাচার বন্ধ করতে হলে সীমান্তে ও জলপথে নিশ্চিদ্র টহল ও কঠোর নজরদারী বাড়াতে হবে। অন্যথায় কখনো ইয়াবা পাচার বন্ধ হবেনা।

সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নুর হোসেন বলেন, বড় বড় ইয়াবা কারবারী গা ঢাকা দিলেও যাদের নূন্যতম আইন সর্ম্পর্কে ধারণা নেই তারাই মূলত ইয়াবা পাচার করছে এখনো। তারা এখনো ইয়াবা পাচার অব্যাহত রেখেছে। সেক্ষেত্রে তাদের মোটিভেশনের প্রয়োজন রয়েছে। সেই সাথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদিচ্ছা ও আন্তরিকতা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। নুর হোসেন আরো বলেন, প্রতিটি ওয়ার্ডে মাদক বিরোধী কমিটি গঠনের লক্ষ্যে ৫০ থেকে ৫৫ জন সচেতন লোকজন নিয়ে এ কমিটি গঠন করা হবে। সেখানে আওয়ামীলীগ. যুবলীগ ও ছাত্রলীগকে জড়িত করা হবে।

টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশ বলেন, টেকনাফের কোনো ইয়াবা ব্যবসায়ীকেই ছাড় দেয়া হবে না। আগের তুলনায় টেকনাফে ৭০ শতাংশ চালান কমে গেছে। পর্যায়ক্রমে আরো কমে আসবে। তিনি আরো জানান, যে কোন মূল্যে ইয়াবা পাচার কমানো হবে। এরই প্রেক্ষিতে প্রতিটি ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, পৌরসভা, উপজেলায় মাদক বিরোধী কমিটি গঠন করা হচ্ছে। ক্রস ফায়ারের বিষয়ে তিনি বলেন, ইয়াবা ব্যবসায় সংশ্লিষ্টদের আত্মসমর্পণের সুযোগ দেয়া হয়েছে। তারপরেও তারা আত্মসমর্পন করছেননা। এটা খুবই দুঃখজনক। পুলিশ নিজ থেকে কাউকে ক্ষতি করেননা। ইয়াবা ও অস্ত্রের সংবাদ পেয়ে উদ্ধার অভিযানে গেলে পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়ে। পুলিশ আত্মরক্ষার্থে (সরকারী জান, মাল রক্ষার্থে) পাল্ট গুলি ছুঁড়ে থাকে। ইয়াবা ব্যাপারীদের দ্বিতীয় দফায় আত্মসমর্পণের বিষয়ে টেকনাফ মডেল থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশ বলেন এখন পর্যন্ত দ্বিতীয় দফায় আত্মসমর্পণের কোন বার্তা তার কাছে নেই ।
এদিকে ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে টেকনাফ থানা পুলিশ অভিযান চালিয়ে ৪৯ মামলার বিপরীতে ২২৬ আসামীর মধ্যে ১৭০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে।

বিজিবি জানায়, মার্চ মাসে জব্দ করা হয়েছে ১১ লাখ ৭৩ হাজার ৩৫৪ পিস ইয়াবা। ২০ মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১২ জনকে। বন্দুকযুদ্ধে রোহিঙ্গা নারীসহ মারা গেছেন ৬ জন। এ ছাড়া ধরা পরেছে ফেনসিডিল, গাঁজা , আন্দামান গোল্ডসহ নানা মাদক। ৫ এপ্রিল দুপুরের দিকে ১৯ হাজার ৫ শ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করে বিজিবি। এ ছাড়া কোস্টগার্ড, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, র‌্যাবের অভিযানেও বিপুল পরিমাণ ইয়াবা ও আটক রয়েছে।গত বছরের ৪ মে থেকে দেশব্যাপী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিশেষ মাদক বিরোধী অভিযান শুরু হয়। এ অভিযানে র‌্যাব পুলিশ বিজিবির সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধ এবং মাদককারবারীদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে কক্সবাজার জেলায় ৭২ জন নিহত হয়েছেন। তার মধ্যে এক নারী ও ১৪ জন রোহিঙ্গাসহ শুধু টেকনাফে ৫৭ জন নিহত হয়েছেন।

সর্বশেষ ৬ এপ্রিল টেকনাফের নয়াপড়া মোচনী শরণার্থী ক্যাম্পে পুলিশ অস্ত্র উদ্ধারে গেলে রোহিঙ্গা সাথে গুলাগুলির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় তিন রোহিঙ্গা যুবক নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন পুলিশের তিন সদস্যও। ঘটনাস্থল থেকে ৪টি এলজি ও ৭ রাউন্ড কার্তুজ উদ্ধার করা হয়। নিহত রোহিঙ্গারা হলো, নয়াপাড়া মুচনী ক্যাম্পের বি ব্লকের বাসিন্দা আমির হোসেনের ছেলে নুর আলম(২৩),একই ক্যাম্পের এইচ ব্লকের মোঃ ইউনুসের ছেলে মোঃ জুবায়ের(২০)ও এইচ ব্লকের ইমান হোসেনের ছেলে হামিদ উল্লাহ(২০)।