• ঢাকা
  • বুধবার, ২৩শে অক্টোবর, ২০১৯ ইং | ৮ই কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | ২৩শে সফর, ১৪৪১ হিজরী

দুপুর ২:৩৯

এরশাদের মৃত্যুর পর কতটা প্রাসঙ্গিক থাকতে পারবে জাতীয় পার্টি?


‘এরশাদের মৃতুর পর কতটা প্রাসঙ্গিক থাকতে পারবে জাতীয় পার্টি’-এ শিরোনামে বিবিসি বাংলা একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।দৈনিক নতুন কাগজের পাঠকদের জন্য প্রতিবেদনটি হুবহু প্রকাশ করা হলো-

নতুন কাগজ ডেস্ক : বাংলাদেশে সাবেক সেনাশাসক জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের মৃত্যুর পর তার প্রতিষ্ঠিত জাতীয় পার্টি রাজনৈতিক দল হিসাবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে কতটা প্রাসঙ্গিক থাকবে? অনেকেই এ প্রশ্ন করতে শুরু করেছেন।

জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে এবং দুর্নীতির দায়ে জেল খেটেও জেনারেল এরশাদ প্রায় তিন দশক ধরে বাংলাদেশের ক্ষমতা এবং ভোটের রাজনীতিতে নিজেকে প্রাসঙ্গিক রাখতে পেরেছিলেন।

বাংলাদেশের রাজনীতির প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি, উভয়েই নানা সময় তাঁকে নিয়ে টানাটানি করেছে। কিন্তু তার মৃত্যুর পর জাতীয় পার্টি সেই গুরুত্ব কি আর ধরে রাখতে পারবে? যদি না পারে, তাহলে রাজনীতির ওপর তার প্রভাব কী হতে পারে? ভোটের রাজনীতিতে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে আওয়ামী লীগের মিত্র হিসেবে ছিলেন জেনারেল এরশাদ এবং তাঁর দল জাতীয় পার্টি।

জাতীয় পার্টি ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে সরাসরি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট থেকেই অংশ নিয়েছিল। এর পর ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনেও – জেনারেল এরশাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে হলেও – জাতীয় পার্টিকে আওয়ামী লীগের সাথে থাকতে হয়েছিল। সে সময় দলটির নেতাদের অনেকের কথায় সেই অস্বস্তির কথা চাপা থাকে নি। সর্বশেষ একাদশ সংসদেও আওয়ামী লীগের সাথে থেকে জাতীয় পার্টি ২২টি আসন নিয়ে বিরোধী দলের আসনে বসেছে।

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ বলছেন, ভোটের রাজনীতিতে জাতীয় পার্টির অবস্থান অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে বলে তারা মনে করছেন।

“এক সময় অনেকের কাছে জাতীয় পার্টির কদর ছিল। হয়তো এরশাদ সাহেবকে নিয়ে ভোটের রাজনীতিতে একটা হিসাব নিকাশ ছিল । কিন্তু গত ১০ বছরে সেটার প্রয়োজনীয়তা বোধহয় ফুরিয়ে গেছে।”

 হানিফ বলছিলেন, “জেনারেল এরশাদের অবর্তমানে তাঁর দল কতটা শক্তি নিয়ে চলতে পারবে, সেটা সময় বলে দেবে। তবে সেই শক্তিটা কতটুকু, সেটা আমাদের কাছে বিবেচ্য বিষয় নয়। আওয়ামী লীগ সবসময়ই মুক্তিযুদ্ধের দলগুলোকে এক প্লাটফরমে নিয়ে চলার পক্ষে এবং সেই ধারা অব্যাহত থাকবে।” আরেকটি বড় দল বিএনপিও বিভিন্ন সময় চেষ্টা করেছে আওয়ামী লীগের বলয় থেকে জাতীয় পার্টিকে বের করে আনার । জেনারেল এরশাদ ১৯৯৮ সালে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটে যোগ দিয়েও অল্প কিছুকাল পরেই আবার বেরিয়ে এসেছিলেন।

এরশাদের জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটেও ছিল এক সময়

বিবিসির এক প্রশ্নে জেনারেল এরশাদকে দুই দলের দিক থেকেই কাছে টানার চেষ্টার কথা স্বীকার করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তবে তিনি বলেছেন, গত কয়েকটি নির্বাচন থেকেই জাতীয় পার্টির প্রভাব কমে এসেছে। “এটা তো আপনার সত্য কথা। এটা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই যে, পার্লামেন্টে সংখ্যার ব্যাপার একটা আছে। সেখানে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের ভোটের নিয়ন্ত্রণ তারা করতেন, সেকারণে তাঁর দলের সমর্থন সংসদীয় ব্যবস্থায় খুব জরুরি ছিল।” “তবে এই ধারা বা প্রভাব এখন অনেক কমে গেছে। এখন জাতীয় পার্টির অবস্থান রংপুরেই অনেক দূর্বল হয়ে গেছে,” – বলেন মি. আলমগীর।

“ফলে এরশাদের অবর্তমানে জাতীয় পার্টির অবস্থান ওইভাবে থাকবে বলে মনে হয় না।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে অবশ্য এখনকার প্রেক্ষাপটকে দেখছেন ভিন্নভাবে। তাদের অনেকে বলেছেন, আওয়ামী লীগ টানা তৃতীয় দফায় ক্ষমতায় রয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ে আওয়ামী লীগকে একক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে দেখা যাচ্ছে। সেখানে জাতীয় পার্টি বা অন্য যে কোন দল অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক রওনক জাহান বলছিলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক মেরুকরণ এখন অন্য চেহারা নিচ্ছে।  জাহান বলছেন, “জাতীয় পার্টি তো আদর্শভিত্তিক কোন পার্টি ছিল না। এটা পুরোটাই এরশাদের ব্যক্তি ইমেজ নির্ভর পার্টি ছিল। তার অবর্তমানে পার্টিটা টিকে থাকবে কিনা, সেটাই এখন সন্দেহের মধ্যে পড়ে গেলো।”

জাতীয় পার্টির নেতৃত্ব পারিবারিক দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে বিভক্ত, মনে করেন বিশ্লেষকরা

“ভোটের রাজনীতিতে আমরা অনেক দিন ধরে বড় দু’টি দলের কথা বলে চলেছি। কিন্তু মনে করুন, ২০১৪ সালের পর থেকে বিএনপি সংসদে নেই। এবং তারা কতটা বড় দল এখনও আছে, আমরা তা বলতে পারবোনা। সেজন্য আমি বলছি, আমাদের দেশের রাজনৈতিক মেরুকরণ এখন আরও অন্যভাবে হতে চলেছে।” তা ছাড়া ১৯৯০-এ ক্ষমতাচ্যুত হবার পর হত্যা এবং দুর্নীতিসহ বিভিন্ন অভিযোগ কয়েক ডজন মামলার কারণে জেনারেল এরশাদ নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী রাজনীতিতে কতটা সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছেন, সেই প্রশ্নও দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে রয়েছে। এরপরও জেনারেল এরশাদ ক্ষমতার রাজনীতিতে তৃতীয় দল হিসেবে প্রাসঙ্গিক অবস্থানে দলকে রেখেছিলেন বলে এর নেতা কর্মীরা মনে করেন।

তবে জাতীয় পার্টির প্র্রেসিডিয়াম সদস্য জিয়াউদ্দিন বাবলু বলেছেন, তারা তাদের দলের প্রভাব ধরে রাখার চেষ্টা করবেন।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, জাতীয় পার্টির নেতৃত্ব পারিবারিক দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে বিভক্ত হয়ে রয়েছে এবং সেজন্যই এর ভবিষ্যত নিয়ে তাদের সন্দেহ আছে।