• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ২২শে অক্টোবর, ২০১৯ ইং | ৭ই কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | ২১শে সফর, ১৪৪১ হিজরী

রাত ৪:৫৭

এফআর টাওয়ার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার এক মাস পূর্ণ হলো আজ


চকবাজারের চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে অভিজাত এলাকা বনানীর ওই ভবনে গত ২৮ মার্চ দুপুরে এফআর টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ২৭ জনের মৃত্যু হয়।

আগুনের সূত্রপাত

বনানীর এফ আর টাওয়ারে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল আর অষ্টম তলা থেকে আগুন ছড়িয়েছিল বলে প্রতিবেদন দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগ।এ কমিটির প্রধান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব তরুণ কান্তি শিকদার বলেন, সেখানে আগুন লাগার কারণ শর্ট সার্কিট। আমাদের ধারণা, ওই ভবনের অষ্টম তলা থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল। এ বিষয়ে আমরা রিপোর্ট দিয়ে দিয়েছি। গত ২১ এপ্রিল তারা সচিবের কাছে প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বিদেশ সফর শেষে ফিরলে ওই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে।

ফায়ার সার্ভিসের রিপোর্ট

এফআর টাওয়ারের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় আলাদা তদন্ত কমিটি করেছিল ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর। কমিটির নেতৃত্বে থাকা অধিদপ্তরের উপপরিচালক বলেন, আমাদের রিপোর্ট ‘মোটামুটি চূড়ান্ত’। আগামী সপ্তাহে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের ডিজির কাছে রিপোর্ট দাখিল করব। সেখানে অগ্নিকাণ্ডের কারণের পাশাপাশি কিছু সুপারিশও থাকবে।

জমির মালিক ফারুককে জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদ

দুদকআদালত বনানীর এফআর টাওয়ারের জমির মালিক এসএমএইচআই ফারুককে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দিয়েছেন। দুদকের উপপরিচালক আবুবকর সিদ্দিক জেলগেটে ফারুককে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন।এফআর টাওয়ার নির্মাণে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে জিজ্ঞাসাবাদের তালিকায় আরও রয়েছেন রাজধানী উন্নয়ক কর্তৃপক্ষের (রাজউক) সহকারী পরিচালক নাসির উদ্দিন শরিফ।

এর আগে গত ৩০ মার্চ রাতে এফআর টাওয়ারের বর্ধিত অংশের মালিক তাসভির উল ইসলাম (৬৬) ও ভবনের জমির মালিক প্রকৌশলী এসএমএইচআই ফারুক গ্রেপ্তার হন।

অগ্নি নির্বাপক যন্ত্র ক্রয়ের জন্য বড় বাজেট

দেশে অত্যাধুনিক অগ্নি নির্বাপক যন্ত্র ক্রয়ের জন্য বড় বাজেট প্রয়োজন বলে মনে করেন করে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী।১৬ এপ্রিল সচিবালয়ে তিনি বলেন, ফায়ার সার্ভিস এবং সিভিল ডিফেন্সের উপকরণের অভাব রয়েছে। আমরা প্রথমে এক হাজার কোটি টাকার অগ্নি নির্বাপক যন্ত্র ক্রয় করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পুরান ঢাকার চুড়িহাট্টা এবং বনানীর এফআর টাওয়ারে আগুনের ঘটনার পরে আমরা দেখছি এই বাজেটে হবে না। কারণ অগ্নি নির্বাপক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে ভারি যন্ত্রপাতি প্রয়োজন হয়। বিশ্বে যে পরিমাণ অগ্নি নির্বাপক যন্ত্রপাতি আবিষ্কার হয়েছে, সেগুলো ক্রয় করতে গেলে আরও বড় বাজেটের প্রয়োজন।এজন্য প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা পরিষদের পরবর্তী বৈঠকে বাজেট বাড়ানোর প্রস্তাব পেশ করা হবে বলেও জানান তিনি।

ফায়ারম্যান সোহেল রানা

এফআর টাওয়ারে আগুন লাগার পর উদ্ধার অভিযানে যোগ দিয়েছিলেন ফায়ার সার্ভিসের ফায়ারম্যান সোহেল রানা। ২৩ তলা ওই ভবনে আটকা পড়া মানুষদের ল্যাডারের মাধ্যমে নামাতে গিয়ে ল্যাডারের ভেতরে সোহেলের একটি পা ঢুকে যায়। এ ছাড়া তার শরীরের সেফটি বেল্টটি ল্যাডারে আটকে পেটে প্রচণ্ড চাপ লাগে। এরপর থেকেই সংজ্ঞাহীন ছিল সোহেল।

দুর্ঘটনার পরপরই সোহেল রানাকে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে ভর্তি করা হয়। সেখানে প্রতিদিন চার ব্যাগ রক্ত দেয়া হলেও প্রত্যাশা অনুযায়ী উন্নতি হচ্ছিল না। পেটের ক্ষতের কারণে সমস্যা হচ্ছিল রানার।সে কারণে সিএমএইচের চিকিৎসকদের পরামর্শে রানাকে পাঠানো হয় সিঙ্গাপুর। ।সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে ১১ এপ্রিল চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।

তাসভিরের জামিন

এফআর টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় ভবনের বর্ধিত অংশের মালিক তাসভির উল ইসলামের জামিন আবেদন মঞ্জুর করেছেন আদালত।১১ এপ্রিল শুনানি শেষে ঢাকা মহানগর হাকিম মো. তোফাজ্জল হোসেন ১০ হাজার টাকা মুচলেকায় তার স্থায়ী জামিন মঞ্জুর করেন।এর আগে সাতদিনের রিমান্ড শেষে ৮ এপ্রিল তাকে ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করে পুলিশ।মামলার এজাহারে বলা হয়, ভবনের জমির মালিক প্রকৌশলী এসএমএইচআই ফারুক, টাওয়ারের বর্ধিত অংশের মালিক তাসভিরুল ইসলাম, রূপায়ন গ্রুপের চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী খান ওরফে মুকুল এবং টাওয়ারের ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যরা অসৎ উদ্দেশ্যে আর্থিক সুবিধা পাওয়ার লোভে নির্মাণ বিধিমালা লঙ্ঘন করেন।

এ ছাড়া লোকজনের জানমালের নিরাপত্তার বিষয় লক্ষ্য না রেখে শুধু নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করার মানসিকতায় চরম অবহেলা ও তাচ্ছিল্যপূর্ণ কার্যকলাপের ফলে এফআর টাওয়ারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড সংঘটিত হয়।

এজাহারে আরও বলা হয়, ১৯৯৬ সালের এফআর টাওয়ারের নকশা অনুমোদন দেয়া হয়। অনুমোদিত নকশা ভবনের উচ্চতা ১৮ তলা, যদিও নির্মাণ করা হয়েছে ২৩ তলা। পরবর্তী সময়ে ২০০৫ সালে এফআর টাওয়ারের মালিকপক্ষ রাজউকের কাছে আরেকটি নকশা জমা দেয়। ১৯৯৬ সালে মূল যে নকশা রাজউক অনুমোদন দিয়েছিল তার সঙ্গে নির্মিত ভবনটির অনেক বিচ্যুতি রয়েছে।

দুদকের চিঠি

এফআর টাওয়ার নির্মাণসংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য চেয়ে রাজউক, ফায়ার সার্ভিস, ওয়াসাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চিঠি পাঠিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

গত ৩ এপ্রিল এফআর টাওয়ার নির্মাণে অনিয়ম-দুর্নীতি খতিয়ে দেখতে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। দুদক প্রধান কার্যালয়ের উপপরিচালক আবু বকর সিদ্দিককে এ বিষয়ে অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেয়া হয়।

এফআর টাওয়ার ১৮তলার অনুমতি নিয়ে ২৩তলা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করে আগুন লাগার পর। এর পেছনে দায়ী যারা তাদের খুঁজে বের করবেন দুদকের অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা।আগুন-সতর্ক

মূল নকশায়

মালিকপক্ষ যে নকশা দেখিয়ে ভবন নির্মাণের আবেদন করেছিল, ভবন নির্মাণের সময় দেওয়া নকশার সঙ্গে তার ‘মিল খুঁজে পায়নি’ রাউজক।

রাজউক জানায়, ১৯৮৭ সালের রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সংশোধিত) আইন অনুযায়ী ১৯৯৬ সালে ভবন নির্মাণের আবেদন জানিয়ে নকশা জমা দিয়েছিল এফআর টাওয়ারের মালিকপক্ষ। পরে ২০০৫ সালে যখন ভবনটি নির্মাণ করা হয়, তখন আরও একটি নকশা জমা দিতে হয় রাজউকে।

মালিকপক্ষের দেওয়া সেই নকশার সঙ্গে মূল নকশার মিল খুঁজে পাওয়া যায়নি জানিয়ে রাজউকের চেয়ারম্যান আবদুর রহমান বলেন, ১৮ তলা পর্যন্ত ড্রয়িং আছে, সেটা আমাদের ফাইলের সাথে মিল খুঁজে পেয়েছি। ২৩ তলার ওরা একটা নকশা দেখিয়েছে, অনুমোদন দেখিয়েছে, সেটা আমার ফাইলের সাথে কোনো মিল দেখি না।

অগ্নিনির্বাপনের নিজস্ব কোনো ব্যবস্থা

ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. সাজ্জাদ হোসাইন অগ্নিকাণ্ডস্থলে সাংবাদিকদের বলেন, আমি ভেতরে গিয়েছিলাম; দেখেছি কিছু যন্ত্রপাতি ছিল, কিন্তু সেগুলো ব্যবহার উপযোগী ছিল না।

অগ্নিকাণ্ডস্থলে গিয়ে দেখে আসার পর ঢাকা উত্তরের মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘বিল্ডিং কোড’ মেনে ভবনটি বানানো হয়নি। বিল্ডিং কোড মেনে বানানো হলে তাদের ফায়ার ফাইটিং ব্যবস্থা পুরোটা থাকত। তাদের ফায়ার হাইড্রেন্ট থাকত, তাতে পানি উপরের ফ্লোর পর্যন্ত কাভার করতে পারত।

সুপারহিরো নাঈম

বনানীতে এফআর টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ডের দিনে লাখ জনতা যখন দর্শনার্থী হয়ে ছবি তোলা ও ভিডিও ধারণে ব্যস্ত ছিল শিশু নাঈম ইসলাম তখন আগুন নেভানোর কাজে ব্যবহৃত ফায়ার সার্ভিসের একটি পাইপের ছিদ্র অংশ দুই হাতে চেপে ধরে নিরন্তর চেষ্টা করে যাচ্ছিল যেন সবটুকু পানি আগুনের স্থলে গিয়ে পড়ে। নাঈমের এই ছবিটি সোশ্যাল মিডিয়া ফেসবুকের মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। সুপারহিরোতে পরিণত হয় নাঈম।

গত ২৮ মার্চ দুপুর ১২টা ৫৫ মিনিটে ২৩ তলা বনানীর এফ আর টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। প্রায় সাড়ে ছয় ঘণ্টা চেষ্টার পর সন্ধ্যা ৭টায় ফায়ার সার্ভিসের ২১টি ইউনিট আগুন নেভায়।

এ ঘটনায় ৩০ মার্চ রাতে বনানী পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই মিল্টন দত্ত বাদী হয়ে মামলা (নম্বর ৩৭) করেন।