• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ৩১শে মার্চ, ২০২০ ইং | ১৭ই চৈত্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | ৫ই শাবান, ১৪৪১ হিজরী

রাত ১:১২

উলানিয়া করোনেশন হাই স্কুলের শতবর্ষ ও কিছু স্মৃতি



মিজান শাজাহান:


সুযোগ পেলেই যেকোন বয়সের মানুষ যে তার শৈশব-কৈশোরের ফেলে আসা দিনগুলোর রঙিন
স্মৃতির সাগরে দোল খেতে চায়। নষ্টালজিয়া বা অতীতকাতরতার সাধ উপভোগ করতে চায়,তার
প্রমাণ পেলাম ঐতিহ্যবাহী উলানিয়া করোনেশন হাই স্কুলের শতবর্ষ পূর্তি অনুষ্ঠানে।
১৯১২ সালে প্রতিষ্ঠিত স্থায়ী মঞ্জুরীকৃত উলানিয়া করোনেশন হাই স্কুলটি ২০১২ সালে
শতবর্ষে পদার্পণ করে। বরিশাল জেলার মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার উলানিয়া গ্রামে সমহিমায় দাড়িয়ে
থাকা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির শতবর্ষ উদযাপনের জন্য ২০১১ সাল থেকেই প্রস্তুতি শুরু হয়। কিন্তু
বিভিন্ন জটিলতায় ২০১২ সালে মিলনমেলাটি করা যায়নি। তবে ২০১৪ সালের ১৯ ও ২০ ডিসেম্বর
হাজার হাজার প্রাক্তন শিক্ষার্থীর মেলা বসে উলানিয়া করোনেশন হাই স্কুল মাঠে। ৮০ বছরের বৃদ্ধ
থেকে শুরু করে বিদ্যালয়ের সেই সময়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরাও যোগ দেয় সেই
মহাউৎসবে।
১৯ ডিসেম্বর প্রথম দিনের অনুষ্ঠানে অংশ নেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক,
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। সঙ্গে ছিলেন তৎকালীন পানি সম্পদ মন্ত্রী ব্যারিস্টার
আনিসুল ইসলাম মাহমুদ। উলানিয়ার সন্তান মরহুম বিচারপতি আবদুর রহমান চৌধুরীর কন্যা ও
বর্তমানে হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর বোন, ইতিহাস বিষয়ক
গ্রন্থের রচয়িতা রুসেলি রহমান মাহমুদ সম্পর্কে আনিসুল ইসলাম মাহমুদের ভাইয়ের বউ
হওয়ায় সেদিন উলানিয়ার মানুষ আলাদা অনুভূতির স্বাদ পেয়েছিল তৎকালীন পানি সম্পদ মন্ত্রীকে
পেয়ে। উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক, একুশে পদকপ্রাপ্ত দেশবরণ্যে কবি আসাদ চৌধুরীর
সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিলেন “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে
ফেব্রুয়ারি/ আমি কি ভুলিতে পারি” একুশের এ অমর গানের রচয়িতা, জনপ্রিয় কলামিস্ট
আবদুল গাফফার চৌধুরী। অনুষ্ঠানে নাগরিক সংবর্ধনা দেয়া হয় এ কিংবদন্তি কলামিস্টকে।
শৈশব-কৈশোরের স্মৃতিবিজড়িত স্কুলের দুরন্ত দিনগুলোর কথা মনে পড়তেই দু’চোখে অশ্রুর
ফোয়ারা নামে আবদুল গাফফার চৌধুরীর। তিনি বলেন, এ স্কুলের মাঠে বহুদিন ফুটবল খেলেছি।
চার দশকেরও বেশি সময় ধরে লন্ডনে বাস করা এ সব্যসাচী লেখক বলেন, দেশ অনেক উন্নত হয়েছে।
ভেবেছিলাম আমার শতবর্ষের পুরনো এ বিদ্যাপীঠটি বহু আগেই সরকারি হয়ে গেছে। কিন্তু
এতবছরেও বিদ্যালয়টি সরকারি না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। বার্ধক্যজনিত
অসুস্থ্যতাসহ নানা রোগে আক্রান্ত আবদুল গাফফার চৌধুরীকে হেলিকপ্টারে করে ঢাকা থেকে
উলানিয়া যেতে হয়েছে। আবার ওইদিনই তাকে ঢাকা ফিরে আসতে হয়েছে। স্বল্প সময়ের জন্য
হলেও নিজের স্কুলের শতবর্ষ পূর্তি অনুষ্ঠানের সাক্ষী হতে পেরে খুবই আবেগপ্রবণ হতে দেখা
যায় তাকে। তিনি বলেন, ১০ বছর আগেও এ স্কুল থেকে মেঘনা নদীর দুরত্ব ছিল ৬ কিলোমিটার।
আর এখন স্কুলের দেয়ালঘেষা রাক্ষুসী নদী। মেঘনার ভাঙনে হাজার হাজার মানুষ ভিটেমাটি
হারিয়েছেন। অনেকেই সর্বস্ব হারিয়ে পথে বসেছেন। বিলীন হয়ে গেছে পুরো গোবিন্দপুর
ইউনিয়নটি। গাফফার চৌধুরী বলেন, আমি প্রধানমন্ত্রীকে বলব, এই স্কুলের কয়েকশ’ গজ দূরে
চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন আমার বাবা ওয়াহিদ হাসান রাজা চৌধুরী ও মা জহুরা খাতুন। দেশে

আসলে একবারের জন্য হলেও যেন মা-বাবার কবর জিওয়ারত করতে পারি, সেজন্য উলানিয়াকে
বাঁচাতে হবে।
আজ উলানিয়াকে বাঁচানোর জন্য ৩৮৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। ভাঙন রোধে এরইমধ্যে
কাজও শুরু হয়েছে। আর এজন্য আবদুল গাফফার চৌধুরী, কবি আসাদ চৌধুরী, অধ্যাপক শফিউর
রহমান, স্থানীয় সংসদ সদস্য পংকজ নাথ, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক
শাহে আলম মুরাদ, মেহেন্দিগঞ্জ সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমান জাকিরের
পাশাপাশি অসংখ্য মানুষের রক্ত-ঘাম পানি করতে হয়েছে। তাদের কারো অবদানকেই খাটো করে
দেখার সুযোগ নেই। অনেক মা ঘরে বসে নামাজ শেষে নদী ভাঙন থেকে এলাকাটিকে রক্ষার জন্য
সর্বশক্তিমান মহান আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করেছেন। সেই মায়ের অবদানকেও আমরা অস্বীকার
করতে পারি না। মন্দিরে বসে অঞ্জলি দিয়ে যে হিন্দু মা প্রার্থনা করেছেন তার অবদানকেও আমরা
শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। নদী ভাঙন রোধের জন্য জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে রোদে পুড়ে যারা
মানববন্ধন করেছেন তারাও কম বড় যোদ্ধা নন। নদী ভাঙন রোধের দাবি জাতির সামনে তুলে ধরে
অনেক গণমাধ্যম অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে। তার মধ্যে মাই টিভির অবদান সবচে’ বেশি।
এটিএন বাংলাও অসংখ্য বার উলানিয়ার নদী ভাঙনের সংবাদ সম্প্রচার করেছে।
উলানিয়া করোনেশন হাই স্কুলের শতবর্ষ নিয়ে লেখা আমার বিষয়বস্তু। তবে অপ্রাসঙ্গিকভাবে হলেও
উলানিয়ার নদী ভাঙনের বিষয়টি ঘুরে ফিরে আসবেই এ প্রবন্ধে। কারণ নদী ভাঙনের কারণে
শতবর্ষের এ প্রাচীন বিদ্যাপীঠটি যেমন হুমকির মুখে ছিল বা এখনো রয়েছে। ঠিক তেমনি
অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীদের প্রায় অনেকেই মেঘনার করাল গ্রাসে ভিটেমাটি হারিয়েছেন।
আবার অনেকের বাড়ি হুমকির মুখে রয়েছে। ১৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠানে অংশ নেয়া সব জাতীয়
নেতারাই নদী ভাঙন প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেয়ার পাশাপাশি স্কুলটি সরকারিকরণে প্রয়োজনীয়
সহায়তার আশ্বাস দিয়ে এসেছিলেন।


দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বসবাস করা প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বিদেশেও অবস্থানরত
শিক্ষার্থীদেরও মিলনমেলায় অংশগ্রহণ করাতে আপ্রাণ চেষ্টা করে উদযাপন কমিটি। অনেকে
শারীরিকভাবে অংশগ্রহণ করতে না পারলেও মানসিকভাবে সর্বোচ্চ সমর্থন দিয়েছেন। অনুষ্ঠান
উদযাপনের জন্য মূল কমিটির পাশাপাশি ১৬ টি উপ-কমিটি করা হয়। প্রতিটি কমিটির
অক্লান্ত পরিশ্রমে ২০১৪ সালের ১৯ ও ২০ ডিসেম্বর স্বার্থকতার আলো পায় মিলনমেলাটি।
অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীদের এসএসসি ব্যাচভিত্তিক নাম ও ছবিসহ প্রকাশ করা হয়
স্মরণিকা-শতাব্দীর বাতিঘর। রাষ্ট্রপতি থেকে শুরু করে অনেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, সরকারি
কর্মকর্তা ও রাজনীতিবিদের বাণী স্থান পায় এ স্মরণিকায়। অনেক প্রাক্তন শিক্ষার্থীর লেখা
প্রবন্ধ, কবিতা, স্মৃতিচারণমূলক লেখা ছাপা হয় শতাব্দীর বাতিঘরে। ফটো এ্যালবামে তুলে ধরা
হয় উলানিয়া করোনেশন হাই স্কুলের একাল ও সেকালের চিত্র। ১৯১২ সালের বিশাল সুপারি বাগান
কেটে ছনের ঘরে যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যাত্রা শুরু করেছিল তা কিভাবে যুগ যুগ ধরে জ্ঞানের
আলোয় আলোকিত করেছে, এখনো করে যাচ্ছে এলাকার ছেলে-মেয়েদের সেসব কথাও বাদ যায়নি
স্মরণিকায়।

একটি তথ্য জানিয়ে রাখা উচিত বলে মনে করছি। ১৯৭২ সালে উলানিয়া বালিকা
মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগ পর্যন্ত উলানিয়া করোনেশন হাই স্কুলে ছাত্র-ছাত্রী
একসঙ্গে লেখাপড়া করত। তবে এরপর থেকে করোনেশন স্কুলটি পুরোপুরি বয়েজ স্কুল হয়ে যায়।
অনুষ্ঠানের প্রথম দিন অতিথিদের স্বাগত বক্তব্যের পর পরিবেশন করা হয় বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক
অনুষ্ঠান। অতিথি শিল্পীদের পাশাপাশি স্থানীয় শিল্পীরা তাদের মনোমুগ্ধকর গান আর নৃত্যে মাতিয়ে

রাখেন পুরো অনুষ্ঠান। আর সন্ধ্যার পর শুরু হয় নিজেদের পরিবেশনা। তরুণদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের
শিক্ষক-সাংবাদিক সহ অনেকে নৃত্যে মাতিয়ে তোলেন পুরো ক্যাম্পাস। তাদের নৃত্যে ভিন্নতা
পেয়েছিল ১৯ ডিসেম্বর রাতের ক্যাম্পাস। পেশাদার না হয়েও ব্যক্তিজীবনে পরিচিত মুখগুলোর নাচ
সেদিন আলাদা আনন্দ দিয়েছিল সব বয়সের দর্শকদের।
২০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় দিন ছিল অংশগ্রহণকারী প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের স্মৃতিচারণ
পর্ব।

কবি আসাদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে মিজান শাজাহানের সঞ্চালনায় স্মৃতিচারণ পর্বে
নিজের অনুভূতি তুলে ধরার সুযোগ পান ৮০ জনেরও বেশি প্রাক্তন শিক্ষার্থী। তাদের মুখ থেকেই
উঠে আসে স্কুল জীবনের নানা অভিজ্ঞতার চিত্র। মিষ্টি অভিজ্ঞতার পাশাপাশি তিক্ত স্মৃতিও তুলে
ধরেন অনেকে। সময় স্বল্পতার কারণে সবার কথা শোনার সুযোগ হয়নি। তবে যারা বলেছেন, তারা
মন উজাড় করেই বলেছেন। এখানে একজনের কথা উল্লেখ করতেই হয়, প্রশিকার তৎকালীন নির্বাহী
পরিচালক, মুক্তিযোদ্ধা আবদুর রব। তিনি আজ আর আমাদের মাঝে বেঁচে নেই। আল্লাহ তাকে
বেহেশত নছিব করুন। এ ভদ্রলোক ১ ঘন্টা ২০ মিনিট স্মৃতিচারণ করেও তার সব কথা শেষ করতে
পারেননি। বাধ্য হয়ে সভাপতিকে হস্তক্ষেপ করে তার কথার লাঘাম টেনে ধরতে হয়েছিল। অপরদিকে
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক আজিজুল ইসলাম
ভূইয়া ৫ মিনিটে স্মৃতিচারণ করে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন-কম শব্দেও অনেক কথা বলা যায়।
কবি আসাদ চৌধুরীকে আবেগপ্রবণ মানুষ হিসেবেই জানি। এর প্রধান কারণ হলো- তিনি
কবি। আর কবিরা স্বভাবজাতভাবেই আবেগী হবেন, এমনটাই আমাদের ধারণা। কিন্তু শতবর্ষ
উদযাপন কমিটির সদস্য হিসেবে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি- কি পরিমান বাস্তববাদী
মানুুুুুুুষ তিনি। অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় দিন অর্থাৎ ২০ ডিসেম্বর খাবার রান্না হতে দেরি
দেখে কি যে ছটপট করছিলেন সত্তরোর্ধ এ তরুণ। সেই দৃশ্য আমরা যারা কাছ থেকে দেখেছি
তারা ছাড়া বুঝানো যাবে না।

অবশ্য আসাদ চৌধুরীর প্রথম কাব্যগ্রন্থ “তবক দেওয়া পান” এর
একটি বিখ্যাত কবিতা “সত্যফেরারী” পড়লে বুঝা যায় সেই তরুণ বয়স থেকেই শতভাগ
বাস্তববাদী মানুষ তিনি। সত্যকে কোথাও খুঁজে পাননি এ কবি। তাইতো তিনি ওই কবিতায়
শেষের দিকে লিখেছেন- “কোথায় পালালো সত্য? প্রেম-প্রীতি ভালবাসাতেও সত্য নেই/ এমনকি
কালোবাজারেও নেই।” প্রায় ৩ বছর নিরলস পরিশ্রম করে উলানিয়া করোনেশন হাই স্কুলের শতবর্ষ
অনুষ্ঠানকে স্বার্থকতার দ্বারপ্রান্তে নিতে হয়েছে। আবদুল গাফফার চৌধুরীর স্কুলের অনুষ্ঠান
শুনে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বর্তমান শিক্ষা মন্ত্রী ডা. দীপু মনিসহ অনেক
গুনীজনই অনুষ্ঠানে অংশ নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ইচ্ছা থাকা সত্বেও আমাদের সীমাবদ্ধতার
কারণে সবাইকে নেয়ার সুযোগটি হাতছাড়া করতে হয়েছিল।
বাবার হাত ধরে সন্তান, দাদার হাত ধরে বহু নাতি-নাতনিও মিলনমেলায় অংশ নিয়েছিলেন। তাদের
মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হয়েছে যেন সবাই সেই স্কুল জীবনের দিনগুলো ফিরে পেয়েছেন।
সবার শরীরে একই টি-শার্ট দেখে মনে হচ্ছিল আসাদ চৌধুরী থেকে শুরু করে ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র
শাকিল পর্যন্ত সবাই উলানিয়া করোনেশন হাই স্কুলের বর্তমান শিক্ষার্থী। শতবর্ষ অনুষ্ঠানকে
কেন্দ্র করে সব রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষদের একই মঞ্চে, একই সারিতে বসাতে পারাটা কম
বড় সাফল্য নয়।

১৯ ডিসেম্বর রাতে কবি আসাদ চৌধুরী উলানিয়া বাজারে হেটে হেটে তাঁর
শৈশব-কৈশোরের নরসুন্দরদের সন্ধান পাওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করছিলেন। আর আবদুল গাফফার চৌধুরীও
হয়তো উলানিয়া জামে মসজিদের সুউচ্চ মিনার থেকে খলিল মুনশীর সমধুর কন্ঠে আযান শুনতে
চেয়েছিলেন। অথবা লালগঞ্জের তীরে সূর্যোদয় দেখার বাসনা লালন করেছিলেন। যেমনটা তিনি
তার কবিতা লালগঞ্জের তীরে সূর্যোদয় কবিতায় করেছেন। “ঘুম ভাঙলো,নৌকার ছইয়ের ভেতর

থেকে/ মুখ বাড়িয়ে দেখলাম সূর্যোদয়/ লালগঞ্জের তীরে সূর্যোদয়/ একটু দূরে গহীন গাঙ
গিয়ে মিশেছে/ ধূসর তটরেখায়/ তারপরেই সবুজ ঘাসে ঢাকা মাটি/ দীর্ঘদেহী সুপারি
গাছের সারি/ নারকেল গাছ, আমের কুঞ্জ,বট এবং শিরিষ/ তার ফাঁকে ফাঁকে ছনে ছাওয়া মাটির
ঘর/ সেই ঘর থেকে কলসী কাখে আসছে নারী/ রাত্রিশেষের তন্ময়তা তার চোখে/ সূর্যোদয়ের
বিস্ফোরণ তার চলায়/ তার বুকে লালগঞ্জের ঢেউ/পরনের ছিন্ন শাড়ীর পাড়ে/ লাল ছোপ্ধসঢ়; সূর্যের
আভা / আমি মুখ বাড়িয়ে দেখলাম/ গহীন গাঙের গহনার নৌকা থেকে/ লালগঞ্জের তীরে
সূর্যোদয় / মনে হল আমি এক রোরুদ্যমান শিশু/ কাঁপছি,মাতৃস্তন্য থেকে ঠোঁট সরে যাওয়ার
ভয়ে/ আমার দেহে ছড়িয়ে রয়েছে তার আলুলায়িত চুল/ আমার সর্বাঙ্গে তার শরীরের আদর জড়ানো/
এই লালগঞ্জের তীরে যেন আমার মায়ের/ সেই অনাদিকালের রূপ/ মায়া ছড়ানো,ছায়া জড়ানো,বাহু
বাড়ানো নিবিড় নীলিমা/ সেই নীলিমার মাঝে সরোজ রঞ্জন/ আলোর সেতার বাজে শব্দহীন
স্মৃতিময় সুর/ দ্#ু৩৯;পাশে সবুজশ্যামলিমা,মাঝখানে রুপালী রেখার মতো স্রোত / নৌকার
গলুইয়ে বসা মাঝি যেন জয়নুলের স্কেচ্ধসঢ়;/ আকাশে উড়ছে বক,তার ছায়া নারীর বুকের/ অস্থির
দোলার মতো গহীন গাঙের ঢেউয়ে ভাসে / আরেকটু বাঁকে গেলে কাটাখালি /
বড়খাল,জনপদ,ছায়া ঢাকা পথ/ আমার শৈশব আর কৈশোরের স্মৃতিময় পাখির কূজন/
কলহাস্য,ছুটোছুটি,সন্ধ্যা হলে বাড়ি ফিরে যাওয়া / মসজিদের সুউচ্চ মিনার থেকে খলিল
মুনশীর কন্ঠে মধুর আজান / মাঝে মাঝে উলুধ্বর্নি: সঙ্গীহীন ক্লান্ত এক বক/ দীঘির উত্তর পাড়ে
শিরিষ গাছের ডালে সারাদিন মাছের আশায় ঝিমিয়েছে / এখন সে উড়ে যাবে,সন্ধ্যার ছায়ায়
মিশে যাবে / সবই যেন চলচ্চিত্র-মনের পর্দায় ভেসে ওঠে একে একে / গহনার নৌকা চলে,যাবে/
উলানিয়া,নদীতে সূর্যের রং অস্থির অধীর / নদীর ঢেউয়ের চেয়ে অস্থির অধীর আমার মন/ কাক
ডাকা শিউলী ফোটা হেমন্তের ভোরে/ লালগঞ্জে জোয়ার এসেছে/ যেন তরুনী নারীর দেহ যৌবনের
নতুন সম্ভার সাজিয়েছে/ সূর্য যেন লুব্ধ মৌমাছি / বারবার তার দেহে ছায়া ফেলে,তারপর খন্ড
খন্ড হয়/ শব্দহীন স্মৃতিময় প্রজাপতি ওড়ে,তার রঙিন ডানায়/ রৌদ্র যেন শিশির-
সম্পাত,গড়িয়ে পড়ে বারবার /বহুদূর বাঁশি বাজে/ আব্বাস উদ্দিন,না আবদুল আলীমের সুর/ কে
জানে?/ আমার গহীন গাঙের গহনায় নৌকায় আমার ঘুম ভাঙলো/ আমি চোখ থেকে স্মৃতির
ঝাপসা কুয়াশা সরিয়ে দেখলাম/ লালগঞ্জের তীরে সূর্যোদয়,মনে মনে।”
আমরা অনেকেই সেই অতীতকাতরতার সাধ নেয়ার চেষ্টা করেছি। কারণ অনেককেই দেখেছি
বহুদিনের পুরনো স্বজনদের বুকে জড়িয়ে ধরে আর চোখের অশ্রু আটকিয়ে রাখতে পারেননি।
সেই মুহূর্তগুলোর কথা এখনো মনে পড়লে ইচ্ছে করে আবার সেই ২০১৪ সালের ১৯ ও ২০
ডিসেম্বরকে ফিরে পেতে। কি রোমান্টিক দৃশ্য! মানুষের কান্না আসে কষ্টে। আর সেই কান্না
ছিল আনন্দের, নিজের শিকড়কে ফিরে পাওয়ার আনন্দ। স্কুল মাঠে গল্প,আড্ডা আর খেলাধুলায় মেতে
থাকার স্মৃতির সাগরে ভেসে যাওয়ার আনন্দ অশ্রু।
এই আনন্দ থেকে বিদ্যালয়ের প্রবাসী প্রাক্তন শিক্ষার্থীরাও বাদ যাননি। সামাজিক যোগাযোগ
মাধ্যম ফেইসবুকে লাইভ ও স্টাটাস এবং ছবি পোষ্টের মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে সরাসরি সেসব
দৃশ্য দেখতে পেয়েছেন তারা। লাইক, কমেন্টের মাধ্যমে উৎসাহ যোগিয়েছেন অংশগ্রহণকারীদের।
সুদূর কানাডা থেকে ফুয়াদ চৌধুরী কমেন্ট করেছিলেন, আত্মার আত্মীয়দের মিলনমেলা।
মিলনমেলাকে স্বার্থক করতে স্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. হেলাল উদ্দীনের নেতৃত্বে একঝাঁক
উদ্যোগী শিক্ষক ও কর্মচারীরা নিরলস পরিশ্রম করেছেন। রাজধানীর পাশাপাশি উলানিয়াতেও
একাধিক মিটিং করতে হয়েছে। উদযাপন কমিটির এসব বৈঠক বাস্তবায়ন করতে স্থানীয়দের
ভূমিকা ছিল সবচে’ বেশি প্রশংসিত।

উৎসবের শেষ দিন একসঙ্গে হাজার হাজার উৎসুক

অংশগ্রহণকারীর একসঙ্গে খাওয়ার দৃশ্য দেখে মনে হচ্ছিল যেন বিশাল বনভোজন। যুগ পাল্টিয়েছে।
তাই উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক আসাদ চৌধুরীকে অটোগ্রাফ শিকারিদের কবলে পড়তে
নাহলেও সেলফি শিকারিদের হাত থেকে রেহাই পাননি তিনি। তবে উলানিয়ার অনুজদের এসব
আবদারে বিন্দুমাত্র বিরক্তির ছাপ ছিল চিরতরুণ কবি আসাদ চৌধুরীর। ২০২৭ সালে উলানিয়া
করোনেশন হাই স্কুলের ১১৫ বছর পূর্তি পালন করতে চাই আপনার নেতৃত্বে। সে পর্যন্ত আপনি
আমাদের মাঝে বেঁচে থাকুন এ প্রত্যাশা রইল।