• ঢাকা
  • শুক্রবার, ২২শে নভেম্বর, ২০১৯ ইং | ৭ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | ২৪শে রবিউল-আউয়াল, ১৪৪১ হিজরী

বিকাল ৪:৪৬

আসামের এনআরসি তালিকা বাংলাদেশের উপর কী প্রভাব ফেলবে?


আসামের এনআরসি (ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেনস) তালিকা ভারতের ‘অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয়’ হলেও ওই তালিকা থেকে বাদ পড়া মানুষদের জোরপূর্বক বা অনানুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশে ‘পুশ ব্যাক’ করা হতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকরা।

তারা বলছেন, ওই তালিকা থেকে বাদ পড়া ১৯ লাখ ৬ হাজার ৬৫৭ জন মানুষের সময় কাটছে ভয়-ভীতি-আতঙ্কের মধ্য দিয়ে। তালিকা থেকে বাদ পড়া ব্যক্তিরা আপিলের জন্য ৬০ থেকে ১২০ দিন সময় পেলেও প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকার সময়েই এক বড় সংখ্যক মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করবেন বলে শঙ্কা থেকে যায়।

ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য বলা হয়েছে, যাদের নাম আসামের চূড়ান্ত নাগরিক তালিকায় স্থান পায়নি সেসব ব্যক্তিদের জন্য আইনি বিকল্প শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিদেশি বলে গণ্য করা হবে না।

তারপরও প্রশ্ন উঠছে, এনআরসি তালিকা থেকে বাদ পড়া আসামে বসবাসরত ওই নাগরিকদেরকে রোহিঙ্গাদের মতো জোরপূর্বক বা অনানুষ্ঠানিকভাবে ‘বাংলাদেশে ‘পুশ ব্যাক’ করা হবে কি না? এ নিয়ে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে কী কী ধরণের প্রভাব ফেলতে পারে? এছাড়া তালিকা থেকে বাদ পড়াদের ভবিষ্যৎ কী? বাদ পড়ারা এখন বিকল্প কী করতে পারবেন?

এসব প্রশ্নের উত্তরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেন চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন: ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেনস (এনআরসি) ভারতের রাজনৈতিক ও অভ্যন্তরীণ বিষয়। এনআরসি থেকে বাদ পড়াদের নিয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি। তাই এ নিয়ে এখনো আমাদের উদ্বেগের তেমন কিছু নেই।

তিনি বলেন: এনআরসিতে প্রথমে বাদ পড়াদের যে তালিকা প্রকাশ করা হয় তাতে প্রায় ৮০ লাখ মানুষের নাম ছিল, কিন্তু ধীরে ধীরে সেটা কমে ১৯ লাখে নেমেছে। অর্থাৎ এই সংখ্যা আরো কমবে। তবে শেষে গিয়ে এই সংখ্যা কত হয়, সেটা দেখার বিষয়।

ড. দেলোয়ার হোসেন বলেন: চূড়ান্তভাবে বাদ পড়াদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে ভারত সরকার বিষয়টি নিয়ে বহুবার ভেবে দেখবে। এর আগেও ১৯৯৮ সালে ভারত সরকার আসামে ওই তালিকা করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে চেয়েছিল, কিন্তু তখনও আওয়ামী লীগ সরকার বিষয়টি মোকাবিলা করেছে।

আসামের এই নাগরিক তালিকা নিয়ে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে তেমন কোনো প্রভাব পড়বে কি না, এ বিষয়ে তিনি বলেন: বাংলাদেশ ভারতের দ্বিপাক্ষিক যে সম্পর্কের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে তাতে তেমন কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আমি মনে করি না। এটা সম্পূর্ণ ভারতের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ব্যাপার। তাই বাংলাদেশ-ভারতের সুসম্পর্ক বজায়ে রাখতে ভারত এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে অবশ্যই ভাববে। তবে এরপরও আমি মনে করি, এই বিষয়টির উপর বাংলাদেশের নজর রাখা জরুরি।

তালিকা থেকে বাদ পড়াদের ভবিষ্যৎ কী? বাদ পড়ারা এখন বিকল্প কী করতে পারবেন? এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃ-বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. রাফিউল ইসলাম বলেন: ১৯৪৭ কিংবা ১৯৭১ মুক্তিযুদ্ধের আগে বা পরে যা সেখানে অবস্থান নিয়েছে বা আসামেই জন্ম গ্রহণ করাদের যদি এনআরসি তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয় তাহলে সবচেয়ে বড় যে সংকট তৈরি হবে তা হলো, বাদ পড়াদের আইডেন্টিটি ক্রাইসিস বা পরিচয়হীনতা। যদি তাদের চূড়ান্ত তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়, তাহলে বাদ পড়াদের আসামে কোনো অধিকার থাকবে না আর আমাদের দেশে তো তাদের কিছুই নেই।

তিনি বলেন: ১৯৪৭ কিংবা ১৯৭১ মুক্তিযুদ্ধের শরণার্থী হিসেবে যে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতরা ভারতে পাড়ি জমিয়েছে বা ভারতীয়রা এখানে এসেছে বিষয়টি এমন নয়। যেহেতু ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশ ভৌগলিকভাবে এক ছিল এবং ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্ম, রাজনীতি, অর্থনীতি একটা সংমিশ্রণ ছিলো। মানুষ তাদের প্রয়োজনে ধর্মীয় নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক নিশ্চয়তা, সামাজিক ও রাজনৈতিক সম্প্রীতি ও পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে দিনে দিনে মাইগ্রেট হয়ে থাকে। সেটা দেশের ভেতরও হতে পারে দেশের সীমানা পেরিয়েও হতে পারে। ভারত বাংলাদেশকে ঘিরে থাকায় এর প্রভাব বেশি পড়েছে।

ড. রাফিউল ইসলাম বলেন: পুঁজিবাদী বিশ্ব এখন বিশ্ব গ্রামে পরিণত হয়েছে সুতরাং কাউকে আর দেশের সীমানা দিয়ে বেধে রাখা যাবে না। এছাড়া এতদিন পর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার ফলে আসামে বসবাসরতদের নতুন যে নিজস্ব প্রজন্ম তৈরি হয়েছে তাদের বিষয়ে ভারত সরকার কী সিদ্ধান্ত দেবে। তাদের বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারেরও কী করার আছে?

‘এর আগে ভারতের একজন গবেষক অভিজিত রায় তার গবেষণায় দেখিয়েছেন, আসামে বেড়ে ওঠা নতুন যে প্রজন্ম বা সেখানে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করে আসছেন তাদের কোনোভাবে স্বীকৃতি দিতে চায় না সেখানকার সরকার।’

তিনি বলেন: এতদিন পর এনআরসি তালিকা করার পিছনে ভারতের ভূ-রাজনীতি, অভ্যন্তরীণ রাজনীতি সম্পর্কিত বিষয় জড়িত। সুতরাং এ বিষয়ে প্রথমে ভারত সরকার যে সিদ্ধান্ত নেয় তার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। এর বাইরে আপাতত আমাদের তেমন কিছুই করার নেই।

নাগরিক তালিকা প্রকাশের পর এসব প্রশ্ন ঘুরলেও আসাম সরকার গত বছর খসড়া তালিকার পর একটা বিবৃতি দিয়েছিল। তখন বলা হয়েছিল, তালিকা থেকে বাদ দেয়া হলেও এনআরসি ভুক্ত নয় এমন ব্যক্তিদের আসাম সরকার সকল ধরনের আইনি সহায়তা দিয়ে সাহায্য করবে।

তবে কেন্দ্রীয় সরকার অবশ্য আগেই বলেছে, যাদের নাম আসামের চূড়ান্ত নাগরিক তালিকায় স্থান পায়নি সে সমস্ত ব্যক্তিদের জন্য আইনি বিকল্প শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিদেশি বলে গণ্য করা হবে না।

এমন প্রেক্ষাপটে নাগরিক তালিকা থেকে বাদ পড়া ব্যক্তিরা আপিলের জন্য ৬০ থেকে ১২০ দিন সময় পাবেন। আপিল আবেদনের শুনানির জন্য রাজ্যে কমপক্ষে ১ হাজার ট্রাইবুনাল গঠন করা হবে।এরই মধ্যে অবশ্য ১০০ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছে। আরও ২০০টি ট্রাইব্যুনাল সেপ্টম্বরের প্রথম সপ্তাহে মধ্যে গঠন করা হবে। ট্রাইব্যুনালে হেরে গেলে যে কেউ উচ্চ আদালতে যেতে পারবেন।সব আইনি প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত কাউকে বন্দিশিবিরে নেয়া হবে না বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে আসাম সরকার।

শনিবার তালিকায় ১৯ লাখের বেশি ব্যক্তি বাদ পড়ার তালিকায় আসলেও চূড়ান্ত তালিকায় ঠাঁই হয়েছে ৩ কোটি ১১ লাখ ব্যক্তির।

সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ১৯৫১ সালে আসামে প্রথম প্রকাশিত হয় এনআরসি তালিকা। উচ্চ আদালতের নির্দেশ অনুসারে আসামে বসবাসরত ভারতীয় নাগরিকদের মধ্যে যারা আলাদাভাবে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পর বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে আসামে প্রবেশ করেছে তাদের আলাদা করা হয়েছে।