• ঢাকা
  • বুধবার, ২০শে নভেম্বর, ২০১৯ ইং | ৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | ২১শে রবিউল-আউয়াল, ১৪৪১ হিজরী

রাত ২:২৯

আমাদের সমাজ ব্যবস্থা – তুহিন মাহমুদ


প্রচার করো ততটুকুই যতোটুকু সত্য।সত্যকে মিথ্যা আর মিথ্যাকে সত্যে রুপ দিয়ে নষ্ট করে চলেছে সমাজ,রাষ্ট্র ও জাতিকে ঠিক তেমনি নিজের প্রতিও কুৎসিত মনোভাব বা আত্মপ্রকাশেরও পরিচয় ঘটছে।বর্তমান সমাজে এর প্রভাব এতটাই ভয়াবহ যে,সমাজের সৎ মানুষ গুলো ভালো কাজ করার প্রতি নিরুৎসাহিত হচ্ছে,পাশাপাশি খারাপ মানুষ গুলোর দৌরাত্ম দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে।ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অত্যান্ত ভয়াবহ সময় অপেক্ষা করছে।

কিন্তুু কেন মানুষের ভেতর এই খারাপ প্রবণতার প্রবেশ জীবাণুর মত?এই প্রশ্নের হয়তো সঠিক উত্তর পাওয়া না গেলেও অন্তত এটুকু অনুধাবণ করা যায় যে,লোভের বশবর্তী হয়ে অন্যকে তুষ্ট রেখে নিজ স্বার্থচরিতার্থ করার জন্যই মূলত এই পথে ঝুঁকছে এক শ্রেণীর আত্মকেন্দ্রীক মানুষ।

মানবিক মূল্যবোধ ও মনুষ্যত্ববোধের আদর্শিক জায়গা থেকে যোযন যোযন দূরত্বে শৈশব থেকেই বেড়ে উঠছে এই শ্রেণীর মানুষ।দিন দিন এই শ্রেণীর মানুষের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে উঠছে সমাজের নিরিহ প্রকৃতির মানুষ গুলো।

অনেকটা রাজনৈতিক ছত্র-ছায়ায় এর ব্যপকতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।অপ রাজনীতির বিষাক্ত ছোবলে সংসারের সুখ শান্তি বিনষ্ট হচ্ছে।পারিবারিক বন্ধন,সম্প্রীতি ও সৌহার্দপূর্ণ আচরণ,ভ্রাতৃত্ববোধের জায়গাটুকুও নষ্ট হচ্ছে ক্রমশ।এভাবে চলতে থাকলে সমাজের বিরাজমান অস্হিরতা আরও প্রকট আকার ধারণ করবে।সমাজ হয়ে উঠবে বিষাক্তময়।দেশের প্রতিটি স্তরে এই শ্রেণীর মানুষ দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে ঘুষ,খুঁন,গুম,দূর্নীতি,স্বজনপ্রীতি,কালোবাজারি,এমনকি নারী ব্যবসা,টেন্ডারবাজী সহ নানা অপকর্ম।দূর্ভোগ বাড়ছে নগর ও নাগরিকের।প্রতিহিংসার আগুনে জ্বলে উঠছ হিংস্র মানুষরুপী জানোয়ার গুলো।সমাজের দিক তাকালে প্রতিনিয়ত প্রতিয়মান হয় এসব দৃশ্য।

গত কয়েক মাসের দিকে তাকালে ফুটে উঠবে সমাজের বিভৎস দৃশ্য।নুসরাত হত্যা ও রিফাত হত্যায় সারা দেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিলো।একটার পর একটা ঘটনা ঘটেই চলেছে সমাজে।গত পরশু পাঁচ বছরের শিশু তুহিনকে কান ও পুরুষাঙ্গ কেটে পেটের মধ্যে ধারালো কাঁচি ঢুকিয়ে গলায় ফাঁশ দিয়ে গাছের ডালে ঝুলিয়ে রাখে নিজেরই জন্মদাতা পিতা শত্রু পক্ষকে ঘায়েল করার জন্য।কতটা নির্মম হলে এরকম জঘন্য হত্যাকান্ড ঘটাতে পারে।আরব যুগের বর্বরতাকেও হার মানায় বর্তমান সমাজের এসব ঘটনাবলী।

স্বার্থের জন্য নিজের জন্মদাত্রী মাকেও নির্যাতন করতে দেখা যায় সমাজে।এমনকি উচ্চ শিক্ষিত সন্তানরা-ও নিজের মাকে রাস্তায় ও বৃদ্ধাশ্রমে ফেলে রাখে।মানুষের ভেতর কেবলই শয়তান জেগে উঠছে।সহোদর ভাইকে ভাই খুঁনের ঘটনাও অহরহ ঘটছে সমাজে। নীতিবিগর্হিত সমাজ কেবলই ভয়ঙ্কর রুপ ধারণ করছে যা মানবসভ্যতার চরম বিপর্যয়।মানুষের মধ্যে লোভ এতটাই বেশী যে,তাঁর বিবেক,বুদ্ধি,মানবতাবোধটুকুও ডুবে গেছে আত্মকেন্দ্রিকতার অতল গহব্বরে।

সমাজের মানুষ কোথাও নিরাপদ নয়।পিতা দ্বারা মেয়ে ধর্ষিত,শিক্ষক দ্বারা ছাত্রী ধর্ষিত,বোন দ্বারা বোন পতিতাবৃত্তি সহ মানবতাবিরোধী যতগুলো কাজ আছে সবই সমাজে প্রদর্শিত হচ্ছে একের পর এক।সমাজের মোড়ল,আইন শৃঙ্খলা বাহিনী,রাজনৈতিক নেতা সহ যাদের দ্বারা সমাজ নিয়ন্ত্রিত তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় বা ছত্রছায়ায় এসব ঘটনা গুলো ঘটার পরিবেশ তৈরি হচ্ছে।

প্রতিটি পেশার কিছু কিছু লোকের অনৈতিক কাজের জন্য দেশে অশান্তি বিরাজ করছে এমনকি অবক্ষয়ের দিকে ক্রমশ ধাবিত হচ্ছে সমাজ ব্যবস্থা এক শ্রেণীর ডাক্তার,ইঞ্জিনিয়ার,সাংবাদিক,পুলিশ কর্মকর্তা,শিল্পপতি,সরকারি আমলা, রাজনৈতিক নেতা,এমপি,মন্ত্রী সহ অসংখ্য দ্বায়িত্বশীল ব্যক্তিদের দূর্নীতি,স্বজনপ্রীতি ও উদাসীনতার কারনে সমাজে একটার পর একটা অঘটন ঘটছে।

এছাড়া পারিবারিক সুশিক্ষা ও ধর্মীয় অনুশাসনের অভাবেও উঠতি বয়সের যুবক-যুবতীরা সমাজের বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়ছে।এক্ষেত্রে বাবা,মায়ের দ্বায়িত্বহীনতাই অনেকটা দ্বায়ী।এ জন্য বাবা মায়ের সর্তক হতে হবে সন্তান কোথায় যায়,কি করে, কার সঙ্গে মিশে খুঁটিনাটি বিষয়গুলো তদারকির মাধ্যমে সন্তানকে ভালো পথে পরিচালিত করা যাবে।সন্তানকে একজন ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার দ্বায়িত্ব পিতা,মাতার।

সমাজের রুন্ধ্রে রন্ধ্রে অসামাজিক,অনৈতিক ও অপকর্ম ঢুকে গেছে কোথাও নিরাপদ নেই।মানুষ বিত্তশালী হচ্ছে, শিক্ষা অর্জন করছে কিন্তু মানবিক গুণাবলীর আদলে আর্দশবান মানুষ হয়ে উঠতে পারেনি।সন্তানকে লেখাপড়া করার জন্য শিক্ষাঙ্গনে পাঠাবে সেখানেও নিরাপদ নয়।গত কয়েকদিন ধরে দেশজুড়ে আলোচিত হচ্ছে বুয়েটের মেধাবী ছাত্র আবরার হত্যার নির্মমতাকে নিয়ে।নিজের সহপাঠী মতভেদের কারনে পিটিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলবে এটা সত্যিই মানবসভ্যতার বড় বিপর্যয়।কত স্বপ্ন নিয়ে বাবা মা তিল তিল করে সন্তানকে বড় করেছে একদিন বড় মানুষ হবে কিন্তু তাদের সেই স্বপ্ন ভেঙ্গে গেলো।

যারা আবরারকে হত্যা করেছে তাদের বাবা,মা ও অনেক স্বপ্ন নিয়ে বুয়েটে পাঠিয়েছে তাদের স্বপ্নও তো ধ্বংস হয়ে গেলো।কিন্তুু কেন এই নির্মমতা,অমানবিকতা?মনুষ্যত্ববোধ কি ওদের মাঝে একটুও ছিলো না।ওরা কি একটুও ভাবেনি যে, আবরারের বাবা,মা আছে, ভাইবোন আছে তাদের কি হবে, তাঁরা কি এ শোক সামলাতে পারবে?ওরা কি এতটুকুও ভাবেনি যে আবরারকে খুঁন করলে তাদের পরিণতি কি হবে?কার জন্য এই হিংস্রতায় মেতে ওঠা!রাজনীতির নামে এ-ই হিংস্রতা কখনও কেউ কামনা করে না।

গতকাল আরও একটি নির্মম ঘটনা দেখলো দেশবাসী গোপালগঞ্জ জেলার মুকসুদপুর থানার গোয়ালা ইউনিয়নে আ’লীগের সম্মেলনকে কেন্দ্র করে দু’পক্ষের বিরাজমান পূর্ব শত্রতার জের ধরে ঝগরা সৃষ্টি একপর্যায়ে মারা মারি ঘটে। কুপিয়ে আহত করে বোনকে এবং ভাইকে হাত-পা বেঁধে নদীতে ফেলে দেয়।ধ্বংস হয়ে যায় একটি পরিবার।ছোট ছোট ছেলেমেয়ের আর্তনাদে আকাশভারী হয়ে উঠে।এই রাজনীতি কি আমাদের দরকার! যে রাজনীতির অনলে পুঁড়ে ছাই হবে এক একটি সংসার, তাজা প্রাণ।এসব দেখতে চাই না।প্রবাসে বসে এসব দেখে দেখে মনের কষ্ট গুলো জমাট বাধে। ছেলে মেয়ে-দের জন্য বাংলা চ্যানেল গুলো বন্ধ করে দিয়েছি।ওদের প্রশ্নের জবাব দিতে পারি না।এভাবে আর কতকাল চলবে।পৃথিবী হয়তো বুড়ো হয়ে গেছে। ধ্বংসের কাছাকাছি। তাইতো মানুষ মানুষকে হত্যার প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছে। যেভাবে মেতে উঠেছিলো পৃথিবীর আদিকালে।

এ যুগে মোনাফেকের সংখ্যা বেড়েছে,অপপ্রচারের সংখ্যা বেড়েছে।সত্যকে আড়াল করে মিথ্যাকে প্রচার করার প্রবণতায় মেতে উঠেছে মানুষ গুলো।শেক্সপিয়রের হ্যামলেট নাটকের মতই এক এক জন কুটিল প্রকৃতির এদের বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়ছে সমাজের প্রতিটি স্তরে। সমাজ হয়ে উঠছে খুঁনের আখড়া। রক্তে রঞ্জিত হচ্ছে আপনজনের দেহ।ভালোবাসার জায়গাটা স্যাঁতস্যাঁতে আর কৃত্রিমতায় ছাপিয়ে উঠছে।আন্তরিকতার জায়গায় বাসা বেঁধেছে স্বার্থপরতা,পরনিন্দা আর হিংসাত্মক মানসিকতা।
(চলবে)

লেখক: প্রবাসী সাংবাদিক তুহিন মাহামুদ, মিলান,ইতালি।