• ঢাকা
  • সোমবার, ২১শে অক্টোবর, ২০১৯ ইং | ৬ই কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | ২১শে সফর, ১৪৪১ হিজরী

দুপুর ১২:০১

আপোষ ।। সোলায়মান শিপন


গ্রামে তিনটি জিপ গাড়ি ও পাঁচটি ট্রাক প্রবেশ করেছে।আট বছর বয়সী তাবাস্সুম নিজেকে খুব সৌভাগ্যবতী মনে করছে। যুদ্ধ লাগাতে তার মনে একধরনের আনন্দ হচ্ছে। যুদ্ধ না লাগলে হয়তো এতগুলো গাড়ি একসাথে ঘরের পাশে দেখার সৌভাগ্য তার হত না।

চারিদিকের ভয় আর আতঙ্ক বিরাজ করলেও তাবাস্সুমের মনে আজ আনন্দ। গাড়িগুলো প্রায়ই তাঁদের বাড়ির রাস্তা ধরে যাতায়াত করছে। গাড়িগুলোর শব্দ কানে এলেই তাবাস্সুমের মা বর্ণা বানু মেয়েকে তার বুকে জড়িয়ে ধরে ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন। আলমারির উপরে একটি কোর-আন শরীফ লাল গিলাপে মোড়ানো অবস্থায় আছে। সেটির দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করার সাথে সাথে তার ভয় কিছুটা কমে আসে।

তাবাস্সুমের মনে কোনো ভয় বা আতঙ্ক নেই। সে একদিন লুকিয়ে দেখেছে- জিপ গাড়ি থেকে একদল মানুষ নেমে জঙ্গলের দিকে যাচ্ছে। তারা সবাই একই রকমের পোশাক পড়ে থাকে। সবাইকে একসাথে দেখতে ভালোই লাগে। সবার মাথায় গোল বড় আকারের টুপি। হাতে একটি করে লোহার যন্ত্র। দেখতে সবাইকে একই রকম লাগে।

একদিন সে তার মাকে জিজ্ঞেস করে, মা এরা কারা?

মা বলেছে- মিলিটেরি। মা, মিলিটেরি।

তাবাস্সুমের ছোট ভাই রাতুল একদিন তাকে জিঙ্গেস করে, বইন এরা কারা?

তাবাস্সুম বলেছে মিলটারি।

রাতুল বলেছে মিলটি কি বইন?

তাবাসসুম বলেছে মিলটি না। এরা হইল মিলটারি। এরা দেখতে সবাই একই রকম। সবাই একরকম পোশাক পড়ে। গাড়িতে কইরা জংলায় যায়।

জংলায় যায় কেন বইন?

মনে হয় পাখি মারতাম যায়।

হেড মাস্টার সাহেব দাঁড়িয়ে আছেন। ক্যাপ্টেন শারফারাজ খান তাকে বসতে বলছেন না।

হেড মাস্টার সাহেবকে উদ্দেশ্য করে ক্যাপ্টেন শারফারাজ খান বললেন- সিট ডাউন।

হেড মাস্টার সাহেবের পা কাঁপছে। যদিও তাঁর সামনে বসে থাকা লোকটির চেহারা দেখলে ভয় লাগার কথা নয়। তাছাড়া চোখে সুরমা লাগানোতে তাকে আগের চেয়ে আরো বেশি অমায়িক লাগছে। তবুও কেন যেন হেড মাস্টার সাহেবের পা কিছুটা কাঁপছে।

এরা দেশ দখল করেছে ১৯৪৭ সালে। এখন তাঁদের গ্রামের একমাত্র প্রাইমারি স্কুলটিও দখল করে বসে আছে। মিলিটেরিরা হলদে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্যাম্প বসিয়েছে।

হেড মাস্টার সাহেব তাকে বাড়ি থেকে ডেকে আনার কারণ নিশ্চিত হবার আগ পর্যন্ত কিছুতেই শান্ত হতে পারছেন না।

ক্যাপ্টেন সাহেব ঝুঁকে এসে বললেন- আর ইউ অ্যাফরেড টু মি?

হেড মাস্টার সাহেব বললেন- নো, স্যার। ইটস্ ওকে।

ক্যাপ্টেন শারফারাজ খান হেড মাস্টার সাহেবের পায়ের দিকে তীক্ষ¥ দৃষ্টিতে তাকালেন। তিনি লক্ষ্য করলেন, হেডমাস্টার সাহেবের পা কাঁপছে।

ডোন্ট অরি। উই নিড এ উইমেন হু অনলি কুক ফর আস্।

ভয়ের কিছু নাই রাতুলের মা। এরা বেলুচী প্রদেশের। এরা মানুষ মারে না। খারাপ হচ্ছে পাঞ্জাবীরা। গ্রামের একটাও ঘর পুড়াইছে শুনছো?

একটা মানুষোতো মারে নাই এখনও। আর এছাড়া আমরাতো মুসলমান। আমাদের ক্ষতি এরা করবে না। এদের সব রাগ হিন্দুদের উপর।

আমি একা যাব কিভাবে?

আহা! একা যাবা কেন? বাচ্চাদের সঙ্গে নিয়ে যাবা। এখন থেকে সেখানেই থাকবা। শুধু তিনবেলা রান্না করবা তাদের জন্য। আর তাছাড়া কোনো সমস্যা হলে হলদে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এই প্রধান শিক্ষকতো আছেই। ভয় পাবা না।

নাইস কুকিং।

বর্ণা হেড মাস্টারের দিকে তাকাল।

হেড মাস্টার সাহেব বললেন- তোমার রান্না স্যারের পছন্দ হয়েছে, স্যার এ কথা বলল।

রাতে বর্ণা মেয়ে তাবাস্সুম ও ছেলে রাতুলকে নিয়ে ঘুমিয়ে আছে। ক্যাপ্টেন শারফারাজ খান ঘরে প্রবেশ করলেন।

বর্ণা বিছানা থেকে লাফ দিয়ে উঠে ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাল। বর্ণা বুঝতে পারল- ক্যাপ্টেন নেশা করে তার ঘরে প্রবেশ করেছে। সাথে তার মনের লুকায়িত ইচ্ছাটাও বুঝতে পারল।

বর্ণা লক্ষ করল ক্যাপ্টেন লোভনীয় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে নয়, তার মেয়ের দিকে।

বর্ণা বুক থেকে শাড়ির আঁচল ফেলে দিল। ক্যাপ্টেন এবার অনেকটা দ্বিধা-দ্বন্দ্বে পড়ে গেল। সে পাশের ঘরে বর্ণাকে নিয়ে চলে গেল।

বর্ণা যন্ত্রণার মাঝেও স্বস্তি পেল কারণ সে তার সম্ভ্রম দিয়ে তাবাস্সুমকে বাঁচাতে পেরেছে।

কিছুক্ষণের মধ্যে আরো দুজন সৈনিক এল। তাদের একজন রাতুলকে নিয়ে চলে গেল।

তাবাস্সুম সৈনিকের দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। সৈনিকের পোশাক তাকে বেশিক্ষণ আনন্দ দিতে পারল না। কেননা সৈনিক ধীরে ধীরে শরীরের পোশাকগুলো খুলে ফেলছে।

ন/ক/র