বিশ্ব মা দিবস : ঐতিহ্যের প্রজন্ম সৈয়দা হোসনে আরা

0
46

নতুন কাগজ ডেস্ক : আগামীকাল ১৩ মে, বিশ্ব মা দিবস। মা দিবসে বিশ্বের সব মাকে জানাচ্ছি সালাম ও শুভেচ্ছা।মা শব্দটি অতি ছোট হলেও, এরচেয়ে মধুর আর কোন শব্দ বোধ করি এ জগতে আর দ্বিতীয়টি নেই।জগতে মায়ের স্থান সবার উপরে।মাকে সম্মান আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। ১৯৭৫ সালে জাতিসংঘ নারী অধিকার দশক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। জাতিসংঘের এই স্বীকৃতিই নারীকে দেশে দেশে পরিচিত লাভ করার ক্ষেত্রে এগিয়ে নিয়ে যায়। নারী তোমার জন্য “নতুন প্রাণের স্পন্দনে পৃথিবীকে আলোড়িত কর তুমি। মানব সভ্যতাকে নিজস্ব কক্ষ পথে চলার চিরন্তন প্রক্রিয়া রচিত হয় তোমার কল্যাণেই। কর্ম উদ্দীপনা দিয়ে পুরুষের সাফল্য নিশ্চিত করার গুরুভারটিও তোমার।

এক জীবনে এতগুলো ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া ও সৎ সাহসের সঙ্গে ভূমিকাগুলো পালন করা কেবল তোমার পক্ষেই সম্ভব। তাই তুমি নারী-এ তোমার অহঙ্কার। কুন্ঠিত চিত্তে নয় বরং বলিষ্ঠ কন্ঠে বল তোমার এ গর্ব গাঁথার কথা। জন্মের পর থেকেই বিচিত্র সব চরিত্র ধারণ করে পথ চলতে হয় নারীকে। নানামুখী সম্পর্কের আভরণেই সমৃদ্ধ হয় নারী জীবন। কিন্তু নারীর এ ভূমিকাগুলো হোচট খায় সমাজের ছকে বাধা নিয়মের বেড়াজালে। তবুও কন্যা, জায়া, জননীর মত নানা সম্পর্কের আবরণে নারী সব সময়ই অন্যন্যা,তাই অন্যরকম এক অভিবাদন নারী, শুধু তোমারই জন্য।”

আবার তোমার মাঝেই বসতগড়ে শরফুন্নিসা (নবাব আলিবর্দী খানের সহধর্মিনী ), আমিনা বেগম (নবাব হাশেম জায়েন উদ্দিনের সহধর্মিনী), বেগম লুৎফুন্নিসা(নবাব সিরাজউদ্দৌলার সহধর্মিনী),  গুলশান আরা বেগম (ঐতিহ্যবাহী বেগম লুৎফুন্নিসা পরিবারের ৭ম বংশধর),  সৈয়দা হোসনে আরা বেগম (ঐতিহ্যবাহী বেগম লুৎফুন্নিসা পরিবারের ৮ম বংশধর), রানী ভবানী (সমাজসেবক), মাদার তেরেসা(সমাজসেবক),লতা মঙ্গেসকর(সংগীতশিল্পি), রাবড়ি দেবি (সমাজসেবক), ক্রিস্টিনা ফার্নান্ডেজ-এর (সমাজসেবক) মত মহিয়সীরা যারা নিজেদের কর্ম দিয়ে পৃথিবীর বুকে রেখে গেছেন সফলতার স্বাক্ষর। আমাদের আজকের আয়োজন ঐতিহ্যবাহি বেগম লুৎফুন্নিসা পরিবারের গর্বিত ৮ম প্রজন্ম সৈয়দা হোসনে আরা বেগমকে নিয়ে, যিনি নিজের মেধা ও মননকে কাজে লাগিয়ে ঐতিহ্যের সৌরভ ছড়াচ্ছেন সারা বাংলায়।

মা দিবসকে সামনে রেখে আজ সৈয়দা হোসনে আরা বেগমের কর্ম-কাহিনী  তুলে ধরা হয়েছে। এ লেখার তথ্য বাংলার ঐতিহ্যবাহী নবাব সিরাজউদ্দৌলা পরিবারের ৯ম প্রজন্ম সৈয়দ গোলাম আব্বাস আরেব ওরফে নবাবজাদা আলি আব্বাসউদ্দৌলা‘র সহযোগিতায় গ্রহন করা হয়েছে। ভিন্নধর্মী এ সাক্ষাতকারটি নতুন কাগজ -এর অগনিত পাঠকের জন্য তেুলে ধরা হলো-

মহিয়সী নারী সৈয়দা হোসনে আরা বেগমের জন্ম- ১৯ মার্চ। পিতা- ডাক্তার সৈয়দ নাসির আলী মির্জা ও মাতা গুলশান আরা বেগমের স্নেহধন্য কন্যা তিনি। তার স্বামী- প্রকৌশলী এস. জি. মুস্তফা, যিনি নবাব সিরাজউদ্দৌলার ৮ম বংশধর। এ মহিয়সী নারী নবাব সিরাজউদ্দৌলার সহধর্মিনী বেগম লুৎফন্নিসা পরিবারের ৮ম প্রজন্ম। তার প্রিয় মানুষ তারই ছেলে নবাব সিরাজউদ্দৌলা পরিবারের ৯ম বংশধর নবাবজাদা আব্বাস আরেব। তার প্রিয় মুখ নবাব সিরাজউদ্দৌলার প্রিয়তমা সহধর্মিনী বেগম লুৎফুন্নিসা এবং তার আম্মা গুলশান আরা বেগম। তিনি অবসর কাটান পরিবারের সাথে। তিনি মনে করেন তার প্রিয় মুহূর্তের মধ্যে অন্যতম সময় হচ্ছে ভোর বেলা। বিশেষ করে ফজরে নামাজ পড়া ও কোরআন শরীফ তেলাওয়াতে তিনি পরম আত্ম-তৃপ্তি ও অফুরন্ত শান্তি পান।সেই সঙ্গে প্রভাতের প্রকৃতি ও আপনজনের সেবায় কাটানো মুহূর্তগুলো তিনি বেশ উপভোগ করেন।তিনি নিজেকে বিশ্লেষণ করেন সবকিছুকে বেশি মাত্রায় সরল ভেবে।তিনি মনে প্রাণে বিশ্বাস করেন প্রতিটি মানুষ সদা সত্য কথা বলবে এবং সত্য পথে চলবে, আর এতেই মানবের প্রকৃত কল্যাণ নিহিত। তিনি সাফল্যের সংজ্ঞা হিসেবে বেছে নিয়েছেন সততা ও পরিশ্রমকে।তিনি বরাবরই নিজেকে মানসিক ভাবে আরও কঠিন করে তুলতে চান, কিন্তু পারেন না। এটাই তার দূর্বলতা হিসেবে তিনি মনে করেন। তিনি সর্বপ্রথম বিদেশের মাটিতে যান নবাব আলিবর্দী খান ও নবাব সিরাজউদ্দৌলার পূন্যর্ভমি ভারতে। তিনি সিনেমা দেথেন, তবে এখনো পর্যন্ত তার ভাললাগার ছবি ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’ ‘বর্গী এলো দেশে’ এবং নিকাহ (সালমা আগা ও রাজ বাব্বার অভিনীত)। তিনি সব হালাল খাদ্য খেতে পছন্দ করেন, তিনি শাড়িতেই নিজেকে সবচেয়ে বেশী সাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।

তিনি একজন সেরা রাধুনীও বটে। তার ভাষায় ভালো রাধুনী হতে চাইলে ৩টি গুণ থাকা ভীষণ জরুরি, তার মতে রান্নায় ধৈর্য্য, যত্ন নিয়ে রান্না করার ইচ্ছা, আর সময় দেওয়ার সদিচ্ছা থাকা বঞ্চনীয়। তিনি সুযোগ পেলে নিজের রান্না বাংলার দরিদ্র মানুষদের খাওয়াতে চান। তিনি তার মমতাময়ী আম্মা গুলশান আরা বেগমের রান্নার ভক্ত। কারণ তিনি যেসব নবাবী রান্না-বান্না শিখেছেন তা তার আম্মার কাছ থেকেই শিখেছেন বলে জানিয়েছেন। খাদ্যে তার প্রিয় স্বাদ ঐতিহ্যবাহী টক, ঝাল, মিষ্টি তিনটিই।

বাংলার ঐতিহ্যবাহি বেগম লুৎফুন্নিসা ও নবাব সিরাজউদ্দৌলা পরিবারের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ‘নবাবীখানা’। একবার যিনি খেয়েছেন জীবনে ভুলবেন না। বিশেষ করে নবাবী কাবাব স্বাদে অতুলনীয়। নবাবী খানা তৈরির জন্য যে সাজসরঞ্জাম এবং প্রশস্থ জায়গার প্রয়োজন তা ১০০ ভাগ নিখুঁত হওয়া চাই। সিরাজ পরিবারের প্রিয় অনেক ধরনের নবাবী কাবাব আছে, তার মধ্যে দু’তিনটি স্বাদে অসাধারণ। যা এখনও নবাব সিরাজউদ্দৌলা পরিবারের ঐতিহ্যের প্রতীক। একটি হলো ‘শাহি কাবাব’ ২য়টি ‘নবাবি কাবাব’। নবাব আলিবর্দী ও নবাব সিরাজউদ্দৌলার আমলে গরুর মাংস দিয়ে ‘শিক কাবাব’ খুব জনপ্রিয় ছিল। এরপরে ভেড়ার মাংস কুচি কুচি করে কিমা তৈরি করে ‘নবাবী কাবাব’ এলো। সেকালের নবাবী খানা তৈরি করতে প্রায় ১০০ রকমের মশলা লাগে এবং ১টি পদ রান্নায় সময় যায় কয়েক ঘন্টা। নবাব আলিবর্দী ও নবাব সিরাজউদ্দৌলা আমলের আর ১টি বিখ্যাত খাবার ‘নবাবি নামশ’। সুগন্ধী ঘন দুধের ওপরে জাফরান এবং কাজু, কিসমিস, আখরোট, মধু এবং সর্বোপরি রূপোলি তবকে মোড়া অনির্বচনীয় স্বাদ যেন অমৃত। মিষ্টির মধ্যে ‘নবাবি কুলফি’ আর একটি অনবদ্য জিনিস। সুগন্ধী মিঠে পান নবাব আলিবর্দী খান ও নবাব সিরাজউদ্দৌলার আর ১টি বিখ্যাত ঐতিহ্যের প্রতীক। সিরাজ পরিবার এখনও সেই সব নবাবী ঐতিহ্য ধরে রাখার ব্যাপারে খুবই একনিষ্ঠ।

সমভাবে সিরাজ পরিবারের ঐতিহ্য চারু কারু শিল্প, স্বচ্ছ যে কোন বস্ত্রের উপর নিখুঁত হাতের কাজ এক কথায় অনবদ্য। চিকনকারী মূলত হাতের কাজ, এক একটি শাড়ী এবং কুর্তা পায়জামায় ভরাট চিকনের কাজ করতে কম করে সময় লাগে ৬/৭ মাস। এ কাজে নবাব পরিবারের নারীরা অত্যন্ত পারদর্শী বলেও জানান সৈয়দা হোসনে আরা। তিনি আরো জানান, নবাব সিরাজউদ্দৌলা পরিবারের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতিকে ধরে রাখতে আজও এই পরিবারের নতুন প্রজন্মরা যথেষ্ট যত্নশীল। তাইতো এই পরিবারের সদস্যদের আচার আচরণ কথা বলার ভঙ্গি এতটাই সুন্দর যে, যে কারো দৃষ্টি সহজেই আকর্ষিত হয়।

ঐতিহ্যবাহি নবাব পরিবারের আদব কায়দায় নবাবী আচার-ব্যবহারের সব রকম সৌরভ ও শিল্পরুচির প্রকাশ এখনো বিদ্যমান বলে মনে করেন সৈয়দা হোসনে আরা বেগম।

এমকে/007-12