হে সন্তান আমার, ক্ষমা করো, ক্ষমা করো..

0
168

আবু সাঈদ আহমেদ

মর্মান্তিক সত্য এই যে, আমাদের সহস্র বছরের সাধনার ধন এই রাষ্ট্র আর সমাজ আজও সকল শিশুর বাসযোগ্য হয়নি, তবু শিশুরা জন্মায়। কারণ, আমরা অবিবেচক মানব-মানবী, মায়াকাতর মানব-মানবীরা শিশুদের জন্ম দেই। শিশুদের ফুলের সাথে, পাখির সাথে তুলনা করে তৃপ্তি পাই। শিশুকে একটা নিশ্চিত ভবিষ্যত গড়ে দিতে নিজের জীবন বাজি রাখি। শিশুকে দিনে দিনে শিশু হতে মানুষ হিসেবে রূপান্তরে আমাদের সে কি অক্লান্ত শ্রম! তাদের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে গিয়ে ঊনমানুষে পরিণত করি।

আমরা জানি, মুক্তিযুদ্ধের সাড়ে চার দশক পরেও রাষ্ট্রকে অধিকাংশ শিশুর জন্য নিরাপদ করে গড়ে তুলতে পারিনি। এ রাষ্ট্র সকল শিশুর জন্য বাসযোগ্য নয় জেনেও তাদের পৃথিবীতেে এনে, এখানে এনে কষ্ট দেই। প্রকৃতপক্ষে আমরা শিশুদের নয়, নিজেদেরই ভালোবাসি, সন্তানের মাঝে নিজেদের বাঁচিয়ে রাখতে শিশুদের এই অমানবিকতায় পরিপূর্ণ সমাজে নিয়ে আসি। আমাদের সমাজ এতটা অমানবিক ছিলোনা কখনও, আমরা খুব যত্ন করে মেকী সভ্য ও ভুল প্রগতিশীল হতে গিয়ে মুখস্থ মানবিকতার মোড়কে সমাজকে বাস অযোগ্য আর অমানবিক করে গড়ে তুলছি।

গত সাড়ে চার দশকে আমাদের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্লাশে ক্লাশে কতশত নৈতিকতা শিখিয়েছে আর শিখেছি। আবহমান সংস্কৃতির অপব্যাখা, স্বকীয়তা ও পারিবারিক মূল্যবোধ বিসর্জিত আধুনিকতা এবং ঐতিহ্যের দেহজুড়ে কর্পোরেট কর্মাশিয়াল মানবতার রংবাহার পৌছে দিয়েছি ঘরে ঘরে। আমাদের নাটক-সিনেমায় বারবার সত্যের জয় আর মিথ্যার পরাজয় দেখিয়েছি, দেখিয়েছি বেশুমার প্রেম, ভালোবাসিবে আর ভালোবাসাইবে, ভালোবাসায় ভাসিবে ও ভাসাইবে। মানবিকতা, সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধ, ধর্মীয় বিধিনিষেধ, উদার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আর আচরণগুলোকে সিনেমাটিক ফ্যান্টাসিতে পরিণত করেছি, এসবের যেনো বাস্তব জীবনে কোনো মূল্যই নেই ।

আমাদের মহান নেতা-নেত্রী ও বুদ্ধিজীবীরা দৈনিক বক্তৃতা-বিবৃতিতে অক্লান্তভাবে বিতরণ করছেন মানবিক ও সামজিক মূল্যবোধের পাঠ। রাষ্ট্রের স্যাটেলাইট চ্যানেলে চ্যানেলে ধর্মীয় শিক্ষার কথকতা। তারপরেও, হ্যা, তারপরেও আমরা ক্রমাগত সিঁড়ি বেয়ে নামছি। সিঁড়ি বেয়ে নামছি নিচের দিকে, এই পতন আবহমান মানবিক বাঙালি হতে অমানবিক বাঙালিত্বের দিকে। এ পতন এতো সর্বগ্রাসী যে রাষ্ট্রের শিক্ষিত ও সচেতন নাগরিকদের বড় অংশই মনে করেন সকল অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি মৃত্যুদণ্ড, অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ড ছাড়া আর কোনো শাস্তি দৃষ্টান্তমূলক নয়। তারা এটাও মনে করেন যে বিচার অপেক্ষা বিচারবর্হিভূত হত্যাকাণ্ড/ক্রসফায়ার শ্রেয়।

উপরের কথাগুলো গত দুদিন ধরে মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। কারণ, পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন। প্রতিবেদন অনুযায়ী গত তিন (জানুয়ারি-মার্চ)মাসে শিশুদের প্রতি আমাদের আচরণের খতিয়ান এইরকম-

ক) ৭১ জন শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। নিখোঁজের পর দুইজন শিশুসহ ২০ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। ধর্ষণের ফলে অন্তঃসত্ত্বা – একজন শিশুর গর্ভপাত ঘটানোর সময় মৃত্যু হয়। ৭ জন শিশুর রহস্যজনক মৃত্যু হয়। একই সময় ১১গৃহকর্মী বিভিন্ন রকম নির্যাতনের শিকার হয়। যাদের মধ্যে একজনের রহস্যজনক মৃত্যু হয়।

খ) ২৬ জন শিশু আত্মহত্যা করে। এ সময়ে নিখোঁজের পর দুইজন শিশুসহ বিভিন্ন সময় ২০ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়।

গ) ১৭১জন শিশু ধর্ষিত হয়েছে।

ঘ) ৪২২ জন শিশু বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছে।

উল্লেখিত তথ্যগুলো নেয়া হয়েছে সংবাদপত্রে প্রকাশিত সংবাদের উপরে ভিত্তি করে। বাস্তব অবস্থা আরও ভয়াবহ, কারণ শিশু নির্যাতন ও হত্যার অধিকাংশ তথ্যই সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়না। এই ভয়াবহ পরিস্থিতি হতে উত্তরণের কোনো পথ কি নেই! সত্যিই নেই!

সচেতন নাগরিকদের অধিকাংশ আবারও বলে উঠতে পারেন ‘সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড চাই, ক্রস ফায়ার চাই।’ কিন্তু সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড আর ক্রসফায়ার নিশ্চিত করলেই এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। বিচারহীনতার সংস্কৃতি সৃষ্টি করেছে অপরাধের দুষ্টু চক্র। এই দুষ্টচক্রে অপরাধী-আইনশৃঙ্খলা বাহিনী-বিচার বিভাগ সবাই বিচারহীনতার জন্য দায়ী। এছাড়া, রাষ্ট্রকে সকল শিশুর মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে, নিশ্চিত করতে হবে নিরাপদে বেড়ে ওঠার পরিবেশ।

আজ সকালে যখন সেনানিবাসে ঢুকে হর্নমুক্ত (হর্ন বাজানো নিষেধ) সড়ক দিয়ে যাচ্ছি, তখন কোকিল ডাকছিলো। গম্ভীর নিয়ামানুবর্তিক নীরবতা তুচ্ছ করে সেনানিবাসে কোকিল ডেকে উঠতে পারলে, রোদের হাসিতে ভেসে যেতে পারলে- আমরা কেনো যার যার অবস্থান থেকে শিশুর বাসযোগ্য সমাজ ও রাষ্ট্রগঠনে সচেষ্ট হতে পারবো না!

যদি, শিশুর বাসযোগ্য সমাজ ও রাষ্ট্রগঠনে উদ্যোগী হতে না’ই পারি তবে শিশুর কাছে নতজানু হয়ে বলি, ‘হে সন্তান আমার, ক্ষমা করো, ক্ষমা করো।’ শঙ্খ ঘোষের ভাষায় সর্বশক্তিমানের কাছে প্রার্থনা করি-

‘এই তো জানু পেতে বসেছি, পশ্চিম
আজ বসন্তের শূন্য হাত –
ধ্বংস করে দাও আমাকে যদি চাও
আমার সন্ততি স্বপ্নে থাক।

কোথায় গেল ওর স্বচ্ছ যৌবন 
কোথায় কুড়ে খায় গোপন ক্ষয় !
চোখের কোণে এই সমুহ পরাভব
বিষায় ফুসফুস ধমনী শিরা !

জাগাও শহরে প্রান্তে প্রান্তরে
ধূসর শূন্যের আজান গান ;
পাথর করে দাও আমাকে নিশ্চল
আমার সন্ততি স্বপ্নে থাক।

না কি এ শরীরে পাপের বীজাণুতে
কোনোই ত্রাণ নেই ভবিষ্যর
মৃত্যু ডেকে আনি নিজের ঘরে?

না কি এ প্রাসাদের আলোর ঝল সানি
পুড়িয়ে দেয় সব হৃদয় হাড়
এবং শরীরের ভিতরে বাসা গড়ে
লক্ষ নির্বোধ পতঙ্গের ?

আমারই হাতে এত দিয়েছ সম্ভার
জীর্ণ ক’রে ওকে কোথায় নেবে?
ধ্বংস করে দাও আমাকে ঈশ্বর
আমার সন্ততি স্বপ্নে থাক।”

 আবু সাঈদ আহমেদ, লেখক ও এক্টিভিস্ট।