সোশাল মিডিয়ায় বিপথে টিনেজার

19

নতুন কাগজ ডেস্ক: নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি বা একক পরিবারে বড় হয়ে ওঠা টিনেজারদের বিপথে ঠেলে দিচ্ছে ফেসবুক, টুইটারসহ অন্যান্য সোশাল মিডিয়া, এই দাবি সমাজ-বিজ্ঞানীদের। তারা বলছেন, শৈশব পেরিয়ে আসা টিনেজ ছেলেমেয়েরা নিজেদের অনেক বেশি স্বাধীন মনে করতে থাকে। পৃথিবীর সবকিছুই তাদের কাছে বেশ রঙিন মনে হতে থাক। পড়াশুনার চেয়ে বন্ধুদের সাথে মজা করতেই বেশি পছন্দ করে। আর এটা সহজ হয়ে ওঠেছে সোশাল মিডিয়ার কল্যাণে। ভার্চ্যুয়েল জগতের উজ্জ্বল আলোর ঝলকানিতে বন্ধু চিনে নিতে তারা ভুল করে। সঙ্গদোষে তারা বিপথে পা বাড়ায়।

গবেষণায় দেখো গেছে, প্রায় ৯০ শতাংশ অপ্রাপ্তবয়স্কদের সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্তত একটি প্রোফাইল আছে৷ অপরদিকে প্রত্যেক পঞ্চম কিশোর বা কিশোরী কোনো না কোনো ভাবে ‘সাইবার মবিং’-এর শিকার হয়েছে৷

সোশ্যাল মিডিয়ায় ভিডিও বা ফটো পোস্ট অথবা শেয়ার করা যায়; যোগাযোগ খোঁজা যায়; বন্ধুবান্ধবদের প্রোফাইল দেখা যায়; নানা ধরনের উৎসব-অনুষ্ঠানের খোঁজ পাওয়া যায়; চ্যাট করা যায়; মেসেজ পাঠানো যায়; গেমস খেলা যায়৷ সবচেয়ে বড় কথা, বাস্তব জীবনে বন্ধুবান্ধব খুঁজতে যতো সময় লাগে, সোশ্যাল নেটওয়ার্কগুলোয় তার চেয়ে অনেক সহজে একটা বড় ‘ফ্রেন্ডস সার্কল’ গড়ে তোলা যায়৷ জার্মানিতে যেমন কিশোর-কিশোরীদের এক তৃতীয়াংশের সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘বন্ধু’-র সংখ্যা ৩০০-র বেশি৷

সোশ্যাল নেটওয়ার্কগুলির ভার্চুয়াল দুনিয়ায় কিশোর-কিশোরীরা ঠিক তাই খোঁজে, বাস্তব জীবনেও তাদের যা প্রয়োজন: বন্ধুবান্ধব, কোনো একটি দল বা গোষ্ঠীতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার অনুভূতি; অন্যদের সামনে নিজেকে, নিজের ব্যক্তিত্বকে পরিবেশন করা ও তাদের প্রতিক্রিয়া দেখা – এভাবেই একজন কিশোর বা কিশোরীর সত্তা গড়ে ওঠে, সে তরুণ বা তরুণীতে পরিণত হয়৷

সব উঠতি বয়সী ছেলেমেয়েরেই মজা লাগে, ইন্টারনেটে নিজের কৌতূহল ও আগ্রহ অনুযায়ী বিশ্বের সর্বত্র অন্যান্য অনুরাগীদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে৷ ইন্টারনেটে যোগাযোগ স্থাপন করতে গিয়ে মুখচোরা হওয়ার সম্ভাবনা কম – কাজেই এক ধরনের ফাস্ট ট্র্যাক সামাজিক সাফল্যের আস্বাদ পাওয়া যায়৷ ওদিকে আবার সোশ্যাল মিডিয়ার জগৎটায় অভিভাবক ও বয়োজ্যেষ্ঠদের আনাগোনা ও নজরদারি প্রায় নেই বললেই চলে – যা অপ্রাপ্তবয়স্কদের কাছে খুবই আকর্ষণীয়৷

সোশ্যাল মবিং-এর কথা আগেই বলা হয়েছে৷ কিন্তু বর্তমানে যে বিষয়টি নিয়ে কিশোর-কিশোরী থেকে শুরু করে তাদের অভিভাবক বা শিক্ষক-শিক্ষিকা, এমনকি সমাজতাত্ত্বিক ও রাজনীতিকরাও চিন্তিত, সেটি হল ইন্টারনেটে আত্মপ্রদর্শনের প্রবণতা, বিশেষ করে ফটো ও ভিডিও-র মাধ্যমে৷

‘এক্সহিবিশনিজম’ বা নিজেকে অশালীনভাবে দেখানোর আগ্রহ বিশেষ করে কিশোরীদের মধ্যেই সবচেয়ে বেশি৷ তারাই সবচেয়ে বেশি এ ধরনের ছবি পোস্ট করে থাকে, একবারও না ভেবে, এর ফল কতো মারাত্মক হতে পারে৷ আজকের বয়ফ্রেন্ড কাল বয়ফ্রেন্ড নাও থাকতে পারে আর তাকে ভালোবেসে পাঠানো ছবিগুলো প্রতিশোধ নেওয়ার মোক্ষম অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে৷ বলতে কি, ইন্টারনেটে একবার যে ছবি গিয়ে পড়েছে, তাকে মুছে দেওয়া প্রায় অসম্ভব৷

ইদানিং টিনেজার ছেলেমেয়েরা প্রায়ই ‘সাইবারবুলিং বা সাইবারঅ্যাটাক’ এর শিকার হচ্ছে। এটি হলো ইন্টারনেটে কারো ক্ষতি বা ‍অপচেষ্টা। নিষিদ্ধ এই কর্মকান্ডকে রুখতে এ যাবত নেয়া হয়েছে নানান উদ্যোগ, এরপরও ক্রমশ এর ভয়াবহ চিত্র প্রতীয়মান হচ্ছে। নীতিহীন এই কাজের সঙ্গে যারা লিপ্ত তাদের টার্গেট মূলত টিনেজার। প্রতি ৫ জনের মধ্যে ১ জন টিনেজার এখন সাইবারবুলিং’র স্বীকার। আর এই সাইবারবুলিং’র টার্গেটে একসময় তরুণ প্রজন্মের মতো ৫ বছর বয়সী বাচ্চারাও থাকবে। ভীতিকর এসব তথ্য উঠে এসেছে টিনেজারদের নিয়ে পরিচালিত সাম্প্রতিক সময়ের জরিপগুলোতে।

টিনেজারদের নিয়ে এরইমধ্যে করা এক জরিপের ফলাফল অনুযায়ী, তাদের ৫ জনের মধ্যে ১ জনই সাইবার-ত্রাসের স্বীকার। যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ইতালি, স্পেন, নেদারল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড, গ্রিস, সাউথ আফ্রিকা, যুক্তরাষ্ট্র, আয়ারল্যান্ড এবং চেক রিপাবলিক থেকে এই জরিপে অংশ নেয় ৫ হাজার টিনেজার। যাদের বয়স ছিল ১৩ থেকে ১৮ বছর।

গবেষণায় পাওয়া তথ্য মতে, প্রায় অর্ধসংখ্যক টিনেজারের বিশ্বাস সাইবারবুলিং’র প্রভাব এখন ড্রাগ এডিকশনের চেয়েও ভংঙ্কর। আর অনেকেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা থেকে জানিয়েছে এটা আত্মহত্যার চেয়েও কঠিন কিছু, আবার কেউ কেউ বলেছে এটা সন্ত্রাসী কাজের চেয়ে জঘন্ন।

টিনেজারদের আরেকটি বিপদ হলো ইন্টারনেটে কোনো প্রাপ্তবয়স্ক যৌন অপব্যবহারকারীর খপ্পরে পড়া৷ এ সবের হাত থেকে রক্ষা পেতে হলে কিশোর-কিশোরীদের নেট জগতের কিছু বুনিয়াদি সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে-

১। নিজের ব্যক্তিগত পরিধিকে চিনতে ও রক্ষা করতে শেখো;

২। নিজের সম্পর্কে ফটো বা তথ্য প্রকাশ করার আগে তার গুরুত্ব, প্রয়োজনীয়তা ও সম্ভাব্য ফলশ্রুতি নিয়ে চিন্তা করো;

৩। পরের ফটো বা ভিডিও তাদের অনুমতি ছাড়া আপলোড কোরো না;

৪। ফটো পুরো নাম দিয়ে ট্যাগ কোরো না আর ছবি তোলার সময় তোমার স্মার্টফোনের জিওলোকেশন বাটনটি ‘অফ’ করে রেখো;

৫। ‘বন্ধু’ হিসেবে শুধু তাকেই তালিকায় তুলো, যাকে তুমি ব্যক্তিগতভাবে চেনো;

৬। নিরাপদ পাসওয়ার্ড ব্যবহার করো৷