সিরিয়া যুদ্ধ নিয়ে সঠিক তথ্য দিচ্ছে না পশ্চিমা গণমাধ্যম

0
5

নতুন কাগজ ডেস্ক: সিরিয়ার যুদ্ধ বিভিন্ন ময়দানেই চলছে। একটা হলো অস্ত্রের লড়াইয়ের ময়দান। সেখানে চলছে কামান, মেশিনগান, ট্যাংকের গোলা। বিমান হামলায় শিশুদের রক্তে ভেসে যাচ্ছে সিরিয়ার মাঠ-প্রান্তর। আরেকটি হচ্ছে জনমতের ময়দান, যার প্রধান অস্ত্র গণমাধ্যম। সেখানেও লড়াই হচ্ছে বিস্তর, তা প্রচারণায় ভরপুর। সিরিয়ার যুদ্ধ হচ্ছে প্রচারণা আর রটনার যুদ্ধ। সব যুদ্ধেই মিথ্যা এক বড় অস্ত্র। সাদ্দামের গণবিধ্বংসী অস্ত্রের মিথ্যার পরণতিতে দেশটা ধ্বংস হয়ে যায়। মূলধারার পশ্চিমা গণমাধ্যম সে ব্যাপারে অনুতপ্ত বলে মনে হয় না। নইলে সিরিয়া বিষয়েও তারা সতর্ক হতো। বিভিন্ন পক্ষ নিজেদের মতো করে তথ্য দিচ্ছে। ১৫-২০ বছর আগে হলে সিরিয়ার যুদ্ধের সর্বশেষ অবস্থা জানার জন্য পুরোপুরিই পশ্চিমা নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমের ওপর নির্ভর করতে হতো। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যাপক বিকাশের কারণে এখন অনেক তথ্যই প্রকাশ হয়ে পড়ছে। এতে করে পশ্চিমা গণমাধ্যমের দ্বৈত চরিত্র অনেকটাই বেরিয়ে পড়ছে। বিতর্কিত হয়ে পড়েছে পশ্চিমের তথাকথিত নিরপেক্ষ গণমাধ্যম।

সিরিয়ার গৌতা যুদ্ধের কথা ধরা যাক। সেখানে রাশিয়া ও ইরানের সহযোগিতায় সিরিয়ার সরকারি বাহিনী গত মাসের শেষ দিকে ব্যাপক আকারে হামলা শুরু করে। গৌতার আগে আলেপ্পো, মাদাইয়া ও হোমসের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। সিরিয়ার হামলায় গৌতায় বেসামরিক মানুষ মারা গিয়েছে। শিশুদের নির্বিচারে হত্যার খবরও পাওয়া যাচ্ছে। বাশার আল-আসাদের নিয়ন্ত্রিত বাহিনীর নৃশংসতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, এসব শহর বাশার বাহিনী কাদের হাত থেকে মুক্ত করেছে বা করছে? বাশারের বাহিনী দাবি করছে, সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সঙ্গে তারা লড়াই করছে। কিন্তু পশ্চিমা গণমাধ্যমের খবরের আসছে ভিন্ন তথ্য। বলা হচ্ছে, বাশারের বাহিনী বিদ্রোহীদের দমন করছে। এই বিদ্রোহীরা হচ্ছে পশ্চিমা সমর্থক। তারা বাশারের বিরুদ্ধে তথাকথিত আরব বসন্তের ধারাবাহিকতায় আন্দোলন শুরু করেছিল। প্রশ্ন থেকে যায়, তাহলে সিরিয়ার বিদ্রোহীরা কার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে? স্বভাবতই বাশারের বিরুদ্ধে? বাশারের বাহিনীকে কি তবে বিদ্রোহী, জঙ্গি ও কুর্দি—এই তিন বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করছে?

বাস্তবতা হচ্ছে, কে কার বিপক্ষে লড়াই করছে, তার বিভাজন করা খুবই জটিল বিষয়। স্পষ্টতই বলা যায়, সেখানে দুটি পক্ষ লড়াই করছে। বাশারের নিয়ন্ত্রিত বাহিনী ও বাশারের বিপক্ষ শক্তি। এই বিপক্ষ শক্তিই কখনো গণতন্ত্রকামী বিদ্রোহী, কখনো ইসলামিক খেলাফত প্রতিষ্ঠাকারী আইএস বা কখনো কুর্দি বিদ্রোহী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছ। এরা সবাই বাশারের বিরুদ্ধে লড়লেও নিজেদের মধ্যেও এদের লড়াই আছে। পশ্চিমা গণমাধ্যম কখনোই বিষয়টি পরিষ্কার করেনি; বরং গোটা পরিস্থিতি ধোঁয়াশাচ্ছন্ন করে রেখেছে। যেমন দামেস্কের রাসায়নিক গ্যাস প্রয়োগের কথাই ধরা যাক। প্রথমে পশ্চিমা গণমাধ্যম প্রচার করল, বাশার বাহিনী গ্যাস প্রয়োগ করেছে। কোনো তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই। পরে দেখা গেল, এই গ্যাস প্রয়োগ করেছিল বিদ্রোহীরা। এবং ওই অস্ত্র এসেছিল ব্রিটেন থেকে সৌদি আরবের মাধ্যমে। তখন কিন্তু পশ্চিমা গণমাধ্যম এ নিয়ে খুব একটা উচ্চবাচ্য করেনি। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাও নীরব রইল। সম্প্রতি গৌতাতেও গ্যাস প্রয়োগের খবর মিলেছে। অভিযোগও যথারীতি বাশারের বাহিনীর বিরুদ্ধেই। শিশুদের আহত-নিহত হওয়ার মর্মান্তিক ছবিও ভেসে এল। পরে দেখা গেল, অধিকাংশ ছবিই হয় অন্য কোনো সময়ের কিংবা অন্য কোনো দেশের। এরপর আওয়াজটাও স্তিমিত হয়ে এল।

গৌতার লড়াই নিয়ে পশ্চিমা গণমাধ্যম এমন একটি ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করেছে, সেখানে বিদ্রোহীদের সঙ্গে বাশারের বাহিনীর লড়াই হচ্ছে। পশ্চিমাবিরোধী শিবিরের গণমাধ্যমগুলো জানাচ্ছে, গৌতা কার্যত নিয়ন্ত্রণ করছে জঙ্গিগোষ্ঠী জয়েশ আল ইসলাম, ফেইলাক আল রাহমান, আহার আল শামস। জয়েশ আল ইসলাম হচ্ছে সৌদি সমর্থনপুষ্ট সালাফিস্টদের সংগঠন। এরা বাশারকে ফেলে দিয়ে ইসলামি খেলাফত কায়েম করতে চায়। এসব জঙ্গি গোষ্ঠীর সঙ্গে এক দিকে যেমন আল কায়েদার সংযোগ রয়েছে, আবার নূর আল দিন আল জেনকির মতো জঙ্গি সংগঠন মার্কিন অস্ত্র সহায়তা পেয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু পশ্চিমাদের খবরে এসবের বিস্তারিত নেই। পশ্চিমাদের খবরে বলা হচ্ছে, গৌতা থেকে সাধারণ জনতা বের হতে চাইছে না। কিন্তু কখনোই এটি বলা হয়নি যে জঙ্গিরা নিরীহ জনতাকে মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। যাঁরা বের হতে চাইছেন, তাঁদের বের হতে দিচ্ছে না।

সিরিয়ার যুদ্ধকে ঘিরে প্রোপাগান্ডা প্রচারণার জন্য মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার খরচ করছে যুক্তরাষ্ট্র ও তার সারথিরা। তৈরি হচ্ছে নিত্যনতুন প্রোপাগান্ডা। পশ্চিমা মিডিয়ার বড় অংশটাই এই প্রোপাগান্ডা প্রচারের মুখপত্রে পরিণত হয়েছে। উদ্ধারকারী দল হোয়াইট হেলমেটের কথাই ধরা যাক। এদের পেছনে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের অর্থায়ন। হোয়াইট হেলমেট মূলত জঙ্গি নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে কাজ করে। এই গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে জঙ্গি-সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও রয়েছে। এমনকি এই দলের কোনো কোনো স্থানীয় সদস্যের বিরুদ্ধে নৃশংস কার্যকলাপে অংশ নেওয়ার ভিডিওচিত্রও প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু পশ্চিমা গণমাধ্যমে এসব খবর আসেনি।

পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমের খবরের বড় উৎস হচ্ছে জঙ্গিগোষ্ঠী নিয়ন্ত্রিত এলাকায় স্বঘোষিত ‘মিডিয়া অ্যাকটিভিস্ট’রা। প্রশ্ন হচ্ছে, যেখানে জঙ্গি-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় গণমাধ্যমের প্রবেশ নিষেধ, সেখানে ওই মিডিয়া অ্যাকটিভিস্টরা কতটুকু প্রকৃত তথ্য দিচ্ছে? কেউ কেউ অভিযোগ করে থাকেন, এই মিডিয়া অ্যাকটিভিস্টরা প্রকৃত অর্থে জঙ্গিদের মিডিয়া সেলের সদস্য। পশ্চিমা গণমাধ্যম নির্দ্বিধায় এসব সেলের সংবাদ প্রকাশ করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় ইরাক সরকার যখন জঙ্গিদের হাত থেকে মসুল, তিরকিত বা ফাল্লুজা পুনর্দখল করে, তখন পশ্চিমদের গণমাধ্যমে রীতিমতো একে বিজয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু সিরিয়ায় যখন একের পর এক জঙ্গি-নিয়ন্ত্রিত শহরের পতন ঘটছে, তখন পশ্চিমা গণমাধ্যম ধ্বংসযজ্ঞের বিষয়টিকেই সামনে তুলে ধরছে। গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ আরবে ন্যাটো বাহিনীর থেকে কেউ বেশি করেনি। সিরিয়ার জঙ্গিদের প্রতি যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব ও ইসরায়েলের সমর্থন, সহায়তা এখন অনেকটাই স্পষ্ট। কার্যত, পশ্চিমা গণমাধ্যম জঙ্গি সমর্থনকারীদের বিভিন্ন এজেন্ডাকেই সামনে নিয়ে আসছে।

বাশারের বাহিনীও হত্যাযজ্ঞ করছে না বা বাশার বাহিনীর সরবরাহ করা সব তথ্যই সঠিক এমনটা নয়। তবে সিরিয়ার যুদ্ধ পশ্চিমের গণমাধ্যমে কীভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে? উত্তর হচ্ছে, বিশ্বব্যাপী তথাকথিত নিরপেক্ষ সংবাদের উৎস পশ্চিমা গণমাধ্যমও যে আমাদের সঠিক তথ্য না দিয়ে একপেশে তথ্য দিচ্ছে, এটিও এখন দিবালোকের মতোই স্পষ্ট। কখনো কখনো মিথ্যাচারও করছে। পশ্চিমা গণমাধ্যম এই তথাকথিত ‘ওয়ার অন টেরর’ নিয়ে প্রশ্ন করেনি। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা করে উত্তর খোঁজার চেষ্টাও করেনি—জঙ্গিদের এত অর্থ, অস্ত্রের উৎস কী। ঝাঁ-চকচকে গাড়ি নিয়ে সিরিয়ায় জঙ্গিরা কীভাবে একের পর এক শহর দখলে নিল? অথচ সারা বিশ্বেই মুক্ত সাংবাদিকতা, নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার সবক দিয়ে বেড়ায় এই পশ্চিমা গণমাধ্যম।