Natun Kagoj

ঢাকা, সোমবার, ২৫শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ইং | ১০ই আশ্বিন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ | ৪ঠা মুহাররম, ১৪৩৯ হিজরী

সরকারের বড় চ্যালেঞ্জই বাজেট বাস্তবায়ন

আপডেট: ০৫ জুন ২০১৭ | ১৭:৪২

শরীফুল ইসলাম খান: অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত আমাদের মহান জাতীয় সংসদে বাংলাদেশ সরকারের ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করেছেন। এটা তাঁর একাদশ বাজেট উপস্থাপন। এর আগে তিনি এরশাদের সামরিক শাসনামলে দুবার এবং শেখ হাসিনার আমলে আটবার বাজেট পেশ করার সুযোগ পেয়েছেন। আমি টিভিতে তাঁর গোটা উপস্থাপনা দেখেছি। তিনি অত্যন্ত সুন্দরভাবে বরাবরের মতো এবারও বাজেট উপস্থাপন করেছেন। যতটুকু বুঝতে ও উপলব্ধি করতে পেরেছি তার ভিত্তিতে আমার বক্তব্য একে একে তুলে ধরছি।

প্রথমত. এতে কোনো চমক নেই। একেবারেই গতানুগতিক বাজেট এটি। অনেকটা বাগাড়ম্বরসর্বস্ব। ভূমিকায় মন্ত্রী ভাষা আন্দোলন থেকে মহান স্বাধীনতা আন্দোলন, ৬ দফা, বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা ইত্যাদি অনেক কিছুই বলেছেন। তিনি শহীদ ব্যক্তিদের স্মরণ করেছেন। সোনার বাংলার কথাটি বারবার বলেছেন। কিন্তু তিনি ভুলে গেছেন আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় আইন সংবিধানের কথা। একটিবারের জন্যও তাঁর বক্তব্যে আমাদের পবিত্র সংবিধানের কথা তিনি বলেননি। আমি বুঝতে অক্ষম যে, মহান সংবিধানের মৌলিক স্তম্ভ তথা জাতীয় চার লক্ষ্যের (বাঙালি জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র) বাস্তবায়ন ছাড়া কীভাবে দিন বদলাবে এবং কীভাবেই বা সোনার বাংলা গড়ে উঠবে। মন্ত্রী মহোদয় কি ভুলে গেছেন যে, বর্তমানে ১৯৭২ সালের সংবিধানই বহাল রয়েছে পঞ্চদশ সংশোধনী (৩০ জুন ২০১১ সালে সংসদে পাসকৃত) বলে। সংবিধানের মূল বাণী বিবেচনায় না নিয়ে পরিকল্পনা, রূপকল্প, বাজেট যাই বলুন না কেন তা রচিতই বা হয় কীভাবে এবং বাস্তবায়নই বা সম্ভব কীভাবে? বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হবে বৈকি!

দ্বিতীয়ত. আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে যে, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি বিগত ২৮ মে ২০১৭ বরাবরের মতো এবারও মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ বিনির্মাণে তার নিজস্ব বিকল্প বাজেট উপস্থাপন করেছে, যার আকার প্রায় সাড়ে নয় লাখ কোটি টাকার। আর আমাদের অর্থমন্ত্রী উপস্থাপিত বাজেটের আকার তার অর্ধেকেরও কম (চার লাখ ২৬৬ কোটি মাত্র)। কাজেই বাজেটকে কিছুতেই উচ্চাকাঙ্ক্ষী বলা ঠিক হবে না। তবে অতিশয় আমলাতন্ত্রনির্ভর এ সরকারের বিগত বছরগুলোর বাস্তবায়ন অভিজ্ঞতার নিরিখে এ বাজেটও যে উচ্চাকাঙ্ক্ষী, তাতে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই।

তৃতীয়ত. এবার আসা যাক বাজেটের (অনুন্নয়ন+উন্নয়ন) কাঠামো বিশ্লেষণে। এতে দেখা যাচ্ছে যে, মোট বরাদ্দের ১৬.৪ শতাংশ দিয়ে শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতকে বরাবরের মতো এক নম্বরে রাখা হয়েছে। অন্যদিকে ১৩.৬ শতাংশ পেয়ে জনপ্রশাসন আছে দ্বিতীয় স্থানে, ১২.৫ শতাংশ বরাদ্দ নিয়ে পরিবহন ও যোগাযোগের স্থান তৃতীয়। এ ছাড়া সুদ পরিশোধে বরাদ্দের ১০.৪ শতাংশ (চতুর্থ), স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়নে ৬.৯ শতাংশ (পঞ্চম), প্রতিরক্ষায় ৬.৪ শতাংশ (ষষ্ঠ), কৃষিতে ৬.১ শতাংশ (সপ্তম), সামাজিক নিরাপত্তায় ও কল্যাণে ৬.০ শতাংশ (অষ্টম), জনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তায় ৫.৭ শতাংশ (নবম), বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে ৫.৩ শতাংশ (দশম), স্বাস্থ্যে ৫.২ শতাংশ (১১তম), শিল্প ও অর্থনৈতিক সেবায় ১.০ শতাংশ (১২তম), বিনোদন, সংস্কৃতি ও ধর্মে ০.৯ শতাংশ (১৩তম), আবাসনে (১৪তম) এবং বাকি ২.৭ শতাংশ বিবিধ খরচে বরাদ্দ দেখানো হয়েছে। পূর্বেই বলেছি যে, বাজেট গতানুগতিক, এর বরাদ্দ কাঠামোতে তা আরেকবার প্রমাণিত হলো। যেমন বরাবরের মতো প্রযুক্তি উপখাতে বরাদ্দসহ শিক্ষা খাতের বরাদ্দ সবচেয়ে বেশি দেখানো হয়েছে। এটা আমার বিশ্বাস, জনপ্রশাসনের স্থান দুই নম্বরে দেখানোর জন্য করা হয়েছে। যদি প্রযুক্তি আলাদা থাকত তা হলো জনপ্রশাসনের স্থান নিঃসন্দেহে এক নম্বরে যেত। আমাদের দেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে জনপ্রশাসনের পেছনে এত বিশাল ব্যয় কতটা যুক্তিযুক্ত তা ভেবে দেখার সময় এসেছে। নৈতিক দিক থেকেও এটা কতটা ন্যায্য সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

চতুর্থত. বড় দাগে বলতে গেলে বলতে হয় যে, মোট বরাদ্দের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই অনুৎপাদনশীল খাতগুলোতে (১৩.৬%+৫.৭%+৬.৪%+২.৭%+০.৯%+০.৯% = ৩০.২%) দেওয়া হয়েছে। আমার মতে, এটা ২০.০ শতাংশের বেশি বা এক-পঞ্চমাংশের বেশি হওয়া কোনোমতেই যুক্তিযুক্ত নয়।

পঞ্চমত. রাজস্ব আয়ের কাঠামোতেই সেই ‘যে লাউ সেই কদু’ অবস্থা। গতবারের মতো এবারও অর্থমন্ত্রী ৬৫.৭ শতাংশ (৩৬.৮ শতাংশ মূসক থেকে এবং ২৮.৯ শতাংশ শুল্ক ও অন্যান্য উৎস থেকে) রাজস্ব আহরণ করবেন পরোক্ষ কর থেকে এবং মাত্র ৩৪.৩ শতাংশ আয়কর থেকে (ব্যক্তি+করপোরেট)। তার মানে করের বোঝাটা বহন করতে হবে সাধারণ জনগণকে। এতে সঞ্চয় হ্রাস পাবে এবং মূল্যস্ফীতি ঘটবে।

ষষ্ঠত. বরাবরের মতো এবারও তিনি বিশাল এক উন্নয়ন বাজেট (এক লাখ ৫৩ হাজার ৩৩১ কোটি টাকার) ঘোষণা করেছেন। অতীত অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায় যে, এটা বাস্তবায়িত হবে না। অতীতে কখনোই উন্নয়ন বাজেট পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। দেখা গেছে যেটুকু বাস্তবায়িত হয় তাও মোটেও মানসম্মত নয়। বছরের ১০ মাসে বাস্তবায়িত হয় ৫০ শতাংশের মতো, আর বাকি দুই মাসে (মে, জুন) বাস্তবায়িত হয় অবশিষ্টটা। টাকা জলে ঢালা আর কি! এ রকম ভাগ-বাটোয়ারা আর লুটপাটের উন্নয়ন বাজেট কার প্রয়োজন? এর দ্বারা কি সোনার বাংলা গড়া যাবে?

সপ্তমত. সোনার বাংলা গড়তে হলে যে মানের এবং পরিমাণ রেলপথ আবশ্যক, তার ধারেকাছেও নেই আমাদের দেশ। অথচ এ খাতটি নিয়েও অর্থমন্ত্রী বরাবরের মতো শুধু স্বপ্নই দেখিয়েছেন। বিগত মেয়াদে নেওয়া প্রকল্প চট্টগ্রাম-কক্সবাজার-টেকনাফ-ঘুমধুম রেলপথের নির্মাণকাজ এখনো শুরুই হয়নি। পদ্মা সেতুর রেল সংযোগের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা বিরাজমান। আর ভাঙ্গা-পায়রা কবে যে মহাকাশ থেকে মর্ত্যে নামবে, তা খোদ ভগবানও জানেন কি না সন্দেহ আমার। অত্যন্ত শম্ভুক গতিতে চলছে রেলের প্রকল্পগুলো। ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-রাজশাহী, ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-খুলনা ও ঢাকা-রংপুর রেলপথকে ডাবল লাইনে উন্নীত করা সময়ের দাবি অথচ এগুলো বিবেচনায় নিয়ে রেলপথের জন্যে যথাযথ বরাদ্দ দেওয়া হয়নি।

অষ্টমত. আমি বারবার বলে এসেছি যে, আমাদের দেশের জন্য প্রয়োজন ‘নদী শাসন ও ড্রেজিং মন্ত্রণালয়’। অথচ তা না করে শুধু পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের নামে নামমাত্র বরাদ্দ দিয়ে রাখা হয়েছে বরাবরের মতো। এ সামান্য টাকা জলেই যাবে বলে মনে হচ্ছে।

নবমত. বাজেটে দুদক নিয়ে কথা বলা হয়েছে। অথচ দুর্নীতিবাজদের নিয়ে কোনো বক্তব্য নেই। ঘুষখোর, চাঁদাবাজ, দখলবাজ, লুটেরাদের নিয়ে কোনো বক্তব্য নেই। কে না জানে যে, দেশে তৃণমূল থেকে উচ্চপর্যায় পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরে নানা পন্থায় চলছে দুর্নীতির মচ্ছব। দেশকে অবশ্যই এসব অনাচার থেকে মুক্ত করতে হবে যদি আমরা সংবিধানের চার লক্ষ্যকে বাস্তবায়ন করতে চাই।

দশমত. ব্যাংক হিসাব থেকে আবগারি কর নিয়মিত কাটা সত্ত্বেও তিনি আবার ৮০০ টাকা আবগারি কর ধার্য করেছেন। এটা মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো। এটা অবশ্যই তুলে নিতে হবে। কর ফাঁকিবাজদের ও জালিয়াতদের ধরুন। ভালো করবেন।

পরিশেষে শুধু একটি কথা বলেই শেষ করব; বাজেট বড় হোক, ছোট হোক, তা বাস্তবায়ন করাটাই হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। আর এখানেই সরকার সর্বদাই ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। অন্তত এবার এর ব্যত্যয় ঘটবে এটাই প্রত্যাশা করছি।

 

 


নতুন কাগজ | সাজেদা হক

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Loading Facebook Comments ...
 বিজ্ঞাপন