সড়কে প্রাণ হারানোর মিছিল কি থামবে না?

0
22

ফাইজুল ইসলাম জনি: রাজধানীসহ সারাদেশে যেন থামছেই না সড়ক দুর্ঘটনার মিছিল। গত বৃহস্পতিবার ঢাকার চন্দ্রিমা সুপার মার্কেটের সামনে বিকাশ পরিবহনের বেপরোয়া দুই বাসের চাপায় গুরুতর আহত হয় আয়েশা খাতুন। ধানমন্ডিতে বেসরকারি হাসপাতাল ল্যাবএইডের হাইকেয়ার ইউনিটের ১৯ নম্বর বেডের রোগী তিনি, তার গাল বেয়ে অনবরত ঝরছে চোখের পানি। মেয়ে আহনাব আহমেদকে (৬) বাঁচাতে মা নিজেই এমন পরিস্থিতি বরণ করে নেন।

তবে অস্ত্রোপচারের আগেই নাকি চিকিৎসকরা তাদের স্বজনদের বলছিলেন, এ ধরনের চিকিৎসায় সাফল্যের হার খুবই কম। চিকিৎসাও অনেক ব্যয়বহুল। তবে হাঁটাচলা দূরের কথা, আর কোনো দিনই হয়তো তিনি নিজে উঠবসও করতে পারবেন না। তার পরও চেষ্টা করে দেখা অন্তত হাড়গুলো ঠিকঠাকমতো বসানোর ব্যবস্থা করা। চিকিৎসকদের এমন আশঙ্কায় রীতিমতো মুষড়ে পড়েছেন আয়েশার স্বজনরা। দুই অবুঝ সন্তানের কী হবে? এমন চিন্তা রীতিমতো জেঁকে বসেছে বাবা তানজীর আহমেদ তাহেরের মাথায়।

তিতুমীর কলেজের ছাত্র রাজীব হোসেনের পর এবার পঙ্গু হতে চলেছেন দুই অবুঝ সন্তানের মা আয়েশা খাতুন (২৫)। দুই বাসের চাপা থেকে শিশু সন্তানকে বাঁচাতেই তার এমন পরিস্থিতি। ভাগ্যক্রমে মেয়ে আহনাব কম আহত হলেও ভুলতে পারছে না ওই দিনের ঘটনা।

গত শুক্রবার ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে ছেলের চোখের সামনে বাসের চাপায় পিষ্ট হয়েছেন মা। বাসের চাকার নিচে মা এবং মাকে বাঁচাতে ছেলে বাস ঠেলছেন— এমন মর্মান্তিক একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রীতিমতো ভাইরাল হয়েছে।

গত বুধবার সকালে ৩০ নম্বর লালবাগের বাসা থেকে মেয়ে আহনাব আহমেদকে (৬) নিয়ে রিকশায় করে ধানমন্ডির স্কলারস কিন্ডারগার্টেনে যাচ্ছিলেন আয়েশা খাতুন। সকাল সাড়ে ৭টার দিকে চন্দ্রিমা সুপার মার্কেটের সামনে আসতেই বিকাশ পরিবহনের দুটি বাসের প্রতিযোগিতায় মাঝখানে পড়ে যায় মা-মেয়েকে বহন করা রিকশাটি। বাঁচার জন্য মা-মেয়ের আর্তচিৎকারও চালকদের মন এতটুকু গলাতে পারেনি। বাস থামানোর চেষ্টা না করে তারা উল্টো সামনের দিকে টানতে থাকেন। মায়ের নাড়িছেঁড়া ধন শিশু সন্তানকে রক্ষা করতে নিজেকেই সঁপে দেন মমতাময়ী মা। মা-মেয়ের চিৎকার শুনে স্থানীয়রা একপর্যায়ে বাস দুটি থামাতে সক্ষম হন।

গুরুতর অবস্থায় মা ও মেয়েকে ল্যাবএইড হাসপাতালে নিয়ে যান তারা। নিউরোসার্জন সহযোগী অধ্যাপক মাসুদ আনোয়ারের তত্ত্বাবধানে মায়ের অস্ত্রোপচার হলেও মেয়ে আহনাবকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে বাসায় পাঠানো হয়। তবে গতকাল পর্যন্ত আহনাব স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরেনি। শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে বলে জানিয়েছেন তার বাবা তানজীর আহমেদ তাহের। কথা বলার একপর্যায়ে তিনি বলেন, ‘আমার তিন বছরের মেয়ে সানিয়াত আহমেদ এখনো কিছু বুঝতে পারেনি। কেবল মা, মা করছে।

ওকে কী দিয়ে সান্ত্বনা দেব বলুন? একপর্যায়ে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন তিনি। বলেন, ‘চিকিৎসকরা বলেছেন এ ধরনের চিকিৎসায় প্রচুর খরচ। দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসা করানোর পরও আশাব্যঞ্জক ফল আসে না।’

ল্যাবএইডে চিকিৎসাধীন আয়েশা খাতুন প্রায় সব সময় দেখা যায় তিনি নীরবে কেঁদে চলেছেন। চিকিৎসকরা তাকে কথা বলতে বারণ করেছেন। তবে কিছু সময় পরপরই তার একটাই প্রশ্ন— মেয়েরা কেমন আছে? আয়েশা খাতুনকে বুঝতেই দেওয়া হয়নি তার কী হয়েছে।

ল্যাবএইড হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. মাসুদ আনোয়ার বলেন, এটি অনেক বড় ধরনের দুর্ঘটনা। রোগীর কোমর থেকে নিচের দিক পুরোটাই অবশ হয়ে আছে। অপারেশন করে আমরা কেবল মেরুদণ্ডের দুটি হাড়ে স্টিলের পাত বসিয়েছি। ৩-৪ সপ্তাহ পার হওয়ার আগে রোগীর অবস্থা সম্পর্কে কিছুই বলা যাবে না।

ওই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী আফরোজা বিনতে আজম সঞ্চিতা বলেন, আমিও আমার সন্তানকে স্কুলে রেখে রিকশায় করে বাসায় ফিরছিলাম। চন্দ্রিমা মার্কেটের কাছাকাছি আসতেই চিৎকার শুনি এবং দুই বাসের মাঝখানে একটি স্কুলব্যাগ দেখে দৌড়ে সেখানে ছুটে যাই। মা-মেয়েকে একটি ভ্যানে করে হাসপাতালে নিয়ে যাই আমরা কয়েকজন। দুঃখের বিষয় ঘটনাস্থলের পাশেই ট্রাফিক পয়েন্টে একজন পুলিশ ছিলেন। ঘটনাস্থলে না এসে উনি নিজের ফোনেই ব্যস্ত ছিলেন।

নিউমার্কেট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আতিকুর রহমান বলেন, বিকাশ পরিবহনের দুটি বাসই আটক করা হয়েছে। তবে একটির চালক শাহ আলমকে আটক করা হলেও অন্য চালককে আটক করা সম্ভব হয়নি। দুই বাসের বেপরোয়া প্রতিযোগিতার কারণেই এমনটা হয়েছে বলে আমরা জানতে পেরেছি। মামলা প্রক্রিয়াধীন।