Natun Kagoj

ঢাকা, সোমবার, ২৫শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ইং | ১০ই আশ্বিন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ | ৪ঠা মুহাররম, ১৪৩৯ হিজরী

সঞ্চয়পত্র নিয়ে শঙ্কিত ক্রেতারা

আপডেট: ৩১ জুলা ২০১৬ | ০৮:১৯

4bc0b6ac853da0768a736b061596bbab-Sanchayকাগজ প্রতিবেদক :  ব্যাংক সুদের হার কমার কারণে গত কয়েক বছর ধরে সঞ্চয়পত্রের দিকে বেশি ঝুঁকছে সাধারণ মানুষ। বিকল্প উৎসে লাভজনক বিনিয়োগের সুযোগ না থাকায় বিশেষ করে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ এখন লাভজনক না হওয়ায় সঞ্চয়পত্র কেনার আগ্রহ বাড়ছে। কিন্তু সঞ্চয়পত্র কেনায় মানুষের এই আগ্রহ কমাতে ইতিমধ্যে একবার মুনাফা হার কমানো হয়েছে। অবসরে যাওয়ার পর গ্রাচুইটির টাকা দিয়ে সঞ্চয়পত্র কেনা ঠেকাতে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে।

অর্থনীতিবিদেরাই বলছেন, নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের আয়ের পথ সঞ্চয়পত্র। সেই সঞ্চয়পত্রে সুদ হার কমানো বা সঞ্চয়পত্র কিনতে নানা বিধিনিষেধ আরোপ করায় অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়বেন সাধারণ মানুষ। সুদ হার কমায় সরকার সাময়িক লাভবান হলেও বহু পরিবার আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বেন, তাদের জীবন যাপনেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

জাতীয় সঞ্চয়পত্র অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে ৩৩ হাজার ৬৮৮ কোটি টাকার। অথচ এই অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি পূরণে ১৫ হাজার কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রির লক্ষ্য ছিল সরকারের। এর আগের ২০১৪-১৫ অর্থবছরে নিট বিক্রির পরিমাণ ছিল ২৮ হাজার ৭৩২ কোটি টাকা। ব্যাংকে টাকা রেখে বেশি লাভ না হওয়ায় নিরাপদ মনে করেই সাধারণ মানুষ সঞ্চয়পত্রে বেশি আগ্রহী হচ্ছে।

দেশে চার ধরনরে সঞ্চয়পত্র আছে। এর মধ্যে পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রে মুনাফার হার ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ, তিন বছর মেয়াদি তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার ১১ দশমিক ৪ শতাংশ, পাঁচ বছর মেয়াদি পরিবার সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার ১১ দশমিক ৫২ শতাংশ ও পাঁচ বছর মেয়াদি পেনশনার সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ। সর্বশেষ গত বছরের মে মাসে সব ধরনের সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার ২ শতাংশ কমানো হয়।

রাজধানীর খিলগাঁওয়ে থাকেন গৃহিণী পলি আক্তার। তিনি বলেন, বিভিন্ন সময়ে বাচ্চাদের উপহার পাওয়া টাকা জমিয়ে তিনি সঞ্চয়পত্র কিনেছেন। সুদের হার বেশি বলে অন্য মহিলাদের তিনি সঞ্চয়পত্র নিতে উৎসাহ দেন। ব্যাংকে টাকা রেখে খুব বেশি লাভ পান না বলেই জানালেন তিনি। সুদ হার কমানোর কারণে স্বাভাবিক ভাবেই তিনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সাবেক এক ব্যাংক কর্মকর্তা বলেন, চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর জমানো টাকা দিয়ে সঞ্চয়পত্র কিনেছেন তিনি। সুদের হার কমলে তার জন্য ক্ষতিই হবে। ওই কর্মকর্তা বলেন, গ্র্যাচুইটির টাকা দিয়ে সঞ্চয়পত্র কেনা ঠেকাতে কড়াকড়ি আরোপ করায় অবসরের পর পরিবার নিয়ে বিপাকে পড়তে হবে অনেককেই।
২৭ জুলাই মুদ্রানীতি ঘোষণার পর এক প্রশ্নের জবাবে গভর্নর বলেন, সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কমানোর বিষয়ে সরকারকে তারা পরামর্শ দেবে। মুনাফার হার কমানো নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও এই খাত সংশ্লিষ্টদের রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, সঞ্চয়পত্রে মুনাফার হার কমানো ঠিক হবে না। কেননা একটা নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের জন্য এটি একটি অন্যতম আয়ের পথ। তিনি বলেন, দরিদ্র মানুষ যাদের বাড়ি নেই সম্পত্তি নেই তাঁরা নগদ অর্থে সঞ্চয়পত্র কেনেন, এখন মুনাফার হার কমিয়ে দিলে তাঁদের উপার্জন কমে যাবে। বিশেষ করে নারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। নারীরা তাদের জমানো অর্থ দিয়ে সঞ্চয়পত্র কিনে আয়ের একটি পথ তৈরি করেন। সঞ্চয়পত্রে মুনাফার হার না কমালে হয়তো সরকারের ঋণের পরিমাণ বাড়বে, তবে সরকার চাইলে অন্য খাত থেকে তা পুষিয়ে নিতে পারে।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কমালে লাভবান হবে ব্যাংকগুলো। তিনি মনে করেন সরকারের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ঋণ হচ্ছে সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ গ্রহণ, এর ফলে বাজেটে সরকারের সুদ পরিশোধের মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। সরকারের অন্য উৎপাদনশীল খাতে বরাদ্দ কমাতে হচ্ছে। অর্থাৎ রাজস্বের একটা বড় অংশ চলে যাচ্ছে সুদ পরিশোধে।

পুঁজিবাজার বিশ্লেষকদের মধ্যে এমন আলোচনাও আছে, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ কমার পেছনে অন্যতম কারণ উচ্চ মুনাফার সঞ্চয়পত্র। তা ছাড়া ব্যাংকের এফডিআরে টাকা রাখলে যে সুদ পাওয়া যায় তা থেকে সঞ্চয়পত্রে মুনাফার হার অনেক বেশি। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের পরিচালক শাকিল রিজভী বলেন, সঞ্চয়পত্রের উচ্চ মুনাফা পুঁজিবাজারে একটি চাপ তৈরি করেছে। এতে করে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী হারাচ্ছে পুঁজিবাজার। ছোট বিনিয়োগকারীরা আগে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করতেন আর এখন সঞ্চয়পত্র কেনাকে নিরাপদ মনে করেন। তবে বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর ক্ষেত্রে এটি প্রভাব ফেলে না।


নতুন কাগজ | অনিল সেন

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Loading Facebook Comments ...
 বিজ্ঞাপন