Natun Kagoj

ঢাকা, শুক্রবার, ২২শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ইং | ৭ই আশ্বিন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ | ১লা মুহাররম, ১৪৩৯ হিজরী

রাজধানীর জলাবদ্ধতা: মুক্তি মিলবে কবে!

আপডেট: ২৫ জুলা ২০১৭ | ১৮:৫৮

আবু সাঈদ আহমেদ

সামান্য বৃষ্টিতেই রাজধানী ঢাকার বিশাল অংশে সৃষ্ট জলাবদ্ধতার কারণে জনজীবন অচল হয়ে পরে। প্রতিনিয়তই জলাবদ্ধতার ভোগান্তি বাড়ছে, বাড়ছে এলাকা। প্রথমে একটু নিকট অতীতে ফিরে তাকাই, রাজধানীর জলাবদ্ধতা কমাতে ২০১০ হতে ২০১৪ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত ব্যয় করা হয়েছিলো ৩০৩কোটি টাকা। জলাবদ্ধতা নিরসন বাবদ শুধু ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত ঢাকা ওয়াসা তুলে নিয়েছিলো ২০কোটি টাকা। অথচ, ঐ বছরের ২৪ মে ও ২৫মে যথাক্রমে ৩৪ ও ২০ মিলিমিটার বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছিলো ঢাকার বিভিন্ন এলাকায়। সেই জলাবদ্ধতা কাটতে না কাটতে  ২ জুন ৫২ মিলিমিটার বৃষ্টিতে ঢাকা শহরে পরিণত হয়েছিল জলাবদ্ধতার নগরীতে। পুরান ও নতুন ঢাকার অন্তত ২০টি এলাকায় সৃষ্ট জলাবদ্ধতা দূর হতে সময় লেগেছিলো নভেম্বর মাস পর্যণ্ত। এবার সামান্য সামনে এগিয়ে আসি। ২০১৬সালের কোরবানী ঈদের সময়ের ভারী বৃষ্টিপাতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় কোরবানীর পশুর রক্ত আর বর্জ্য মিলে এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল ঢাকার বিভিন্ন  এলাকায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে রাজধানীতে ঘণ্টায় ৪০মিলিমিটারের উপরে বৃষ্টি হলে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। চলতি বছরে ভারী বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ঢাকায় ৪০মিলিমিটারের অনেক উপরে। ফলে জলাবদ্ধতা নিত্যনৈমিত্তিক ভোগান্তিতে পরিণত হয়েছে। প্রসঙ্গত, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের তুলনায় ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন এলাকায় জলাবদ্ধতার পরিমাণ অনেক বেশী এবং বিগত কয়েক বছরে জলাবদ্ধতার নিরসনের হারও কম। সামান্য বৃষ্টিপাতে ঢাকা উত্তরের যে সকল এলাকায় জলাবদ্ধতা মারাত্নক আকার ধারণ করে তার মধ্যে কারওয়ান বাজার, মিরপুর, কালশী, শ্যামলী, মোহাম্মদপুরের বেড়িবাঁধ সংলগ্ন এলাকা, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, পান্থপথের বিভিন্ন এলাকা, ধানমন্ডি, কুড়িল, নতুন বাজার ও খিলখেত অন্যতম। অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন এলাকার মধ্যে পুরান আলাউদ্দিন রোড, যাত্রাবাড়ী মোড়, জুরাইন, শহীদনগর, মধুবাগ অন্যতম আর পূর্ব জুরাইন ও সংলগ্ন কিছু এলাকায় জলাবদ্ধতা স্থায়ী রুপ নিয়েছে।

২০১০ হতে ২০১৭ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ছয় বছরে কতটুকু জলাবদ্ধতা দূর হয়েছে? এই প্রশ্নের উত্তরে ঢাকাবাসী দীর্ঘশ্বাস ছাড়া আর কোনো উত্তর দিতে পারবেন বলে মনে হয়না। এবার আগাম ভারী বর্ষণ হয়েছে। ঢাকা একাধিকবার তলিয়ে গেছে জলাবদ্ধতায়। রমজান মাসের আগে ও পরে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা্র পানি এখনও অনেক অঞ্চল থেকে নামেনি। নামবে কবে তা কেউই বলতে পারছেন না- তবে দুই সিটি কর্পোরেশন আর ঢাকা ওয়াসা আশার কথা শোনালেও বাস্তবতার সাথে কোনো মিল খুঁজে পাচ্ছেন না নগরবাসী। ২০১৬ সালে দুই সিটি কর্পোরেশন প্রায় ২১ কোটি টাকা ব্যয়ে দু’টি অত্যাধুনিক ‘জেট অ্যান্ড সাকার মেশিন’ কিনে নগরবাসীকে জানিয়েছিলো এই মেশিনটি দৈনিক ২২ ঘণ্টা একনাগারে কাজ করতে পারে৷ ১২০ মিটার দীর্ঘ ড্রেন সম্পূর্ণ পরিস্কার করতে পারে মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যে। কিন্তু চলতি বছরের এপ্রিল হতে জুন পর্যন্ত জলাবদ্ধতা নিরসনে এই মেশিনের কোনো ইতিবাচক প্রভাব দেখা যায়নি। দুই সিটি কর্পোরেশন আর ওয়াসার আশাবাদের বিপরীতে নগরবাসীর হতাশা ছাড়া আর কিছুই জমা নেই।

রাজধানীতে জলাবদ্ধতার উন্নয়নে সাফল্য বলতে এই পর্যন্ত একমাত্র সফল উদাহরণ ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের শান্তিনগর এলাকা। এই এলাকায় জলাবদ্ধতা অনেক খানিই কমে এসেছে চলতি বছরে। সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন জানালেন, নিকটস্থ ফ্লাইওভারের কাজ শেষ হলে জলাবদ্ধতার পরিমাণ শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে। কিন্তু পুরান ঢাকার অন্যান্য অঞ্চলসহ নতুন নতুন এলাকায় জলাবদ্ধতার বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি জানান, বৃষ্টির জমে থাকা পানি নিষ্কাশিত হয় ওয়াসার তত্বাবধানে থাকা ‘স্টর্ম ড্রেন’ দিয়ে। ২০১৬সাল থেকে ওয়াসা  ‘স্টর্ম ওয়াটার ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যান’ বাস্তবায়ন শুরু করেছে। এই কাজ শেষ হলেই পুরো ঢাকার জলাবদ্ধতা কমে আসবে।

ঢাকা ওয়াসার একজন দায়িত্বশীল প্রকৌশলী জানালেন, রাজধানীতে পানি সরবরাহের পাশাপাশি ঢাকা ওয়াসার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো ড্রেনেজ সিস্টেমকে সচল রাখা৷ ঢাকা শহরে দুই সিটি কর্পোরেশন প্রায় ২৫০০ কিলোমিটার খোলা ড্রেন এবং ৪০০০ কিলোমিটার ভূগর্ভস্থ ড্রেনেজ সিস্টেম ব্যবস্থাপনা করে আসছে৷ অন্যদিকে অবশিষ্ট প্রায় ৩৯% ড্রেনেজ সিস্টেম ঢাকা ওয়াসার অধীন। ড্রেন দিয়ে নিস্কাশিত পানির জন্য ৬৫ কিলোমিটার উন্মুক্ত খাল, বক্সকালভার্ট আর ড্রেনেজ পাম্পিং সিস্টেম থাকলেও ভারী বৃষ্টিপাত হলে অসহায় আত্নসমর্পণ করা ছাড়া ওয়াসার গত্যন্তর থাকেনা। তবে তিনিও আশার কথা শোনালেন যে ‘স্টর্ম ওয়াটার ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যান’  বাস্তবায়িত হলে জলাবদ্ধতা স্বাভাবিক পর্যায়ে নেমে আসবে। কবে নাগাদ এই মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নের কাজে শেষ হবে জানতে চাইলে অপারগতা প্রকাশ করে তিনি বলেন, তার কাছে তথ্য নেই।

এখন প্রশ্ন হলো- ঢাকাবাসী কবে এই জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পাবে? এখনও আশাব্যাঞ্জক কোনো উত্তর দেয়া সম্ভব নয়। কারণ প্রতিনিয়ত অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং অপরিকল্পিত উন্নয়ণের বলির পাঠা হচ্ছে রাজধানী ঢাকা। জলা্বদ্ধতা হতে নগরবাসীকে মুক্তি দিতে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন এবং ঢাকা ওয়াসাসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর সমন্বিতভাবে কাজ করার বিকল্প নেই। কিন্তু দুই সিটি কর্পোরেশনের সাথে ঢাকা ওয়াসার দ্বন্দ্ব একটি প্রকাশ্য বিষয়, অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোও সমন্বয়কে তুচ্ছ করে যার যার মত কাজ চালিয়ে যেতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। ফলে তাদের আলাদা আলাদা সাফল্য গাঁথা হয়, উন্নয়ন হয়, সরকারের টাকা খরচও হয় কিন্তু নগরবাসী জলাবদ্ধতা থেকে মুক্ত হয়না। সমস্যার গোঁড়াতে না গিয়ে ডালপালাকে গুরুত্ব দিলে সমস্যা বাড়বেই, আর জলাবদ্ধতাকে ভবিতব্য হিসেবেই মেনে নিবে নগরবাসী।

 

 

 

 

আবু সাঈদ আহমেদ, সাংবাদিক, লেখক ও এক্টিভিস্ট।


নতুন কাগজ | শাওন চৌধুরী

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Loading Facebook Comments ...
 বিজ্ঞাপন