Natun Kagoj

ঢাকা, বুধবার, ১৭ জানুয়ারি, ২০১৮ | ৪ মাঘ, ১৪২৪ | ২৯ রবিউস-সানি, ১৪৩৯

যেভাবে সদলবলে আত্মসমর্পন করেন নিয়াজী

মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন:

ঢাকায় ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর শীতের পড়ন্ত বিকেল ৪টা ৩১ মিনিটে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পক্ষে লে. জেনারেল এ এ কে নিয়াজী মিত্রবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করলেন) মহান নেতাদের মধ্যে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেরেবাংলা এ. কে. ফজলুল হক, মওলানা ভাসানী এবং বাঙালি জাতির অবিসংবাদীত নেতা, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবদানের কথা। যাদের নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগের ফলে অর্জিত হয়েছে আমাদের এই বহু আকাঙ্ক্ষিত বিজয়। এই মহান বিজয় দিবসে আরো মনে পড়ে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কথা। যাদের আত্মত্যাগ এবং পরিকল্পনা মাফিক যুদ্ধ করে আমরা বর্বর পাক-হানাদারদেরকে তাদের ৯৩ হাজার সৈন্য এবং অসংখ্য গোলাবারুদ থাকা সত্ত্বেও পরাজিত করে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করেছি। পশ্চিমা শাসক গোষ্ঠী মনে করেছিল বাঙালি জাতিকে অপারেশন সার্চলাইট করে শেষ করে দিবে। কিন্তু আল্লাহর রহমতে তারা তা করতে পারে নাই। তারা জানত না এবং বুঝত না বাঙালি জাতির শক্তির মহিমা কতোটুকু। যখন তারা বুঝতে পেরেছে, তাদের পিঠ দেয়ালে গিয়ে লেগেছে তখন তারা হারমানতে বাধ্য হয়েছে। তাই আজ আমি এই মহান দিনে পাকিস্তানি ইস্টার্ন কমান্ডের অধিনায়ক পরাজিত সৈনিক লে. জেনারেল আমীর আবদুল্লাহ খান নিয়াজী মুক্তি এবং মিত্রবাহিনীর যৌথ কমান্ডের নিকট কিভাবে আত্মসমর্পণ করেছিলেন তা অতি সংক্ষেপে স্বাধীনতা যুদ্ধের চরমপত্র ‘পাঠক’ এবং লেখক বিশিষ্ট সাংবাদিক এম.আর. আখতার মুকুলের ‘আমি বিজয় দেখেছি’ বই থেকে সংকলন করে লিখছি। আশা করি পাঠকগণ তা পড়ে খুবই উপকৃত হবেন। পাকবাহিনী এ অঞ্চলে তাদের পরাজয় বুঝতে পেরে যুদ্ধকে আন্তর্জাতিকরূপ দেয়ার জন্য ১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর পাকিস্তান বিমান বাহিনী ভারত আক্রমণ করে। তখন ভারত পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করে করে পাল্টা আক্রমণ করে। ভারত এবং পাকিস্তান সরাসরি যুদ্ধ শুরু হয়ে যায় এবং নামকরন করা হয় মিত্র বাহিনী। ভারত ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর এবং ভুটান ৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়।

দুই.

এদিকে ঢাকায় ইস্টার্ন কমান্ড হেডকোয়ার্টারে তখন বিষাদের ছায়া। সাত, আট, নয় ডিসেম্বর দিবাগত রাতে কেবল বিভিন্ন রণাঙ্গনের পরাজয়ের খবর এসে পৌঁছল। বিশ্বের বিভিন্ন বেতার কেন্দ্র থেকে পাকিস্তানি সৈন্যদের যুদ্ধে ব্যর্থতার সংবাদ ইথারে ভেসে এলো। ব্রিগেডিয়ার বশির ঢাকার প্রতিরক্ষা ব্যুহ শক্তিশালী করার লক্ষ্যে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা শুরু করলেন। লে. জেনারেল নিয়াজী গভর্নর হাউসে ডা. মালেকের সঙ্গে গোপন বৈঠকে প্রতিটি রনক্ষেত্রে তার বাহিনীর পরাজয়ের কথা স্বীকার করলেন এবং যুদ্ধ বিরতির জন্য প্রেসিডেন্ট এর নিকট তার বার্তা পাঠাবার অনুরোধ করলেন। পরদিন গভর্নর মালেকের কাছ থেকে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার কাছে সাইফারে তার বার্তা অবিলম্বে যুদ্ধ বিরতি এবং রাজনৈতিকভাবে সমস্যার সমাধানের জন্য পুনরায় অনুরোধ করা হচ্ছে। ইয়াহিয়া এই তার বার্তার বিশেষ গুরূত্ব দিলেন না। কেননা যুদ্ধের পরিস্থিতি সর্ম্পকে জেনারেল নিয়াজির কাছ থেকে রিপোর্ট না পাওয়া পর্যন্ত কোনো জবাব দেয়া সম্ভব নয়। ৯ ডিসেম্বর ইস্টার্ন হেড কোয়ার্টার থেকে পিন্ডিতে লে. জেনারেল নিয়াজির সিগন্যাল গেল। জেনারেল নিয়াজীর এই সিগনালের পর পাকিস্তান সামরিক জান্তার টনক নড়ল। পূর্ব রণাঙ্গনের সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনার পর ইয়াহিয়া খানের নিকট থেকে সে রাতেই গভর্নর মালেক ও জেনারেল নিয়াজীর কাছে সিগন্যাল এলো :-

‘প্রেসিডেন্টের নিকট থেকে গভর্নর এবং ইস্টার্ন কমান্ডের কাছে কপি আপনার জরুরি তার বার্তা পেয়েছি। আমার কাছে প্রেরিত প্রস্তাবের ভিত্তিতে আপনাকে সিদ্ধন্ত গ্রহণের অনুমতি দেয়া হলো। আন্তর্জাতিক মহলে আমি সম্ভাব্য সব রকমের ব্যবস্থা করব। কিন্ত যেহেতু আপনাদের কাছ থেকে আমরা বিছিন্ন হয়ে রয়েছি। যেহেতু পূর্ব পাকিস্তান প্রশ্নে সিদ্ধান্ত নেয়ার দায়িত্ব নেয়াটা আপনাদের বিষয় বুদ্ধি ও সুবিবেচনার ওপর ছেড়ে দিলাম। আপনি যে সিদ্ধান্তই গ্রহণ করবেন আমি তা অনুমোদন করবো। আমি জেনারেল নিয়াজীকেও আপনার গৃহীত সিদ্ধান্ত মেনে নেয়া এবং এতদসম্পর্কিত ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিচ্ছি। ১৯৭১ সালের ১০ ডিসেম্বর। জেনারেল নিয়াজী বিবিসির প্রচারিত এক সংবাদে দারুণভাবে উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। খবরটা ছিল, জেনারেল নিয়াজী তার সৈন্যবাহিনীকে ফেলে রেখে পশ্চিম পাকিস্তানে চলে গেছেন, উত্তেজিত অব্যস্থায় আকস্মিকভাবে তিনি হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের (বর্তমানে শেরাটন) লাউঞ্জে এসে হাজির হলেন। চিৎকার করে বললেন, ‘কোথায় গেল বিবিসির সংবাদদাতা? আমি তাকে বলতে চাই সে, আল্লাহর মেহেরবানীতে আমি এখনো পূর্ব পাকিস্তানে রয়েছি। আমি কখনো আমার সৈন্যদের ফেলে যাব না।’

 

তিন.

১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর। বিকাল সাড়ে তিনটায় ইস্টার্ন কমান্ডের প্রধান লে. জেনারেল আমীর আবদুল্লাহ খাঁন নিয়াজী প্রেসিডেন্ট এর কাছ থেকে বহুল প্রত্যাশিত তার বার্তা পেলেন। তার বার্তা পাওয়ার পর নিজের কর্তব্য সম্পর্কে চিন্তা করতে শুরু করলেন। কিভাবে এবং কোন অবস্থায় অগ্রসর হওয়া উচিত হবে। গভর্নর ডা. আ. মালেক থেকে শুরু করে সমস্ত মন্ত্রী ও সেক্রেটারী সবাই এদিকে সম্পর্কচ্ছেদ করে নিরপেক্ষ ‘জোন’ হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালে আন্তর্জাতিক রেডক্রসের কাছে আশ্রয় নিয়েছে। তাই জেনারেল নিয়াজী আলোচনার জন্য মেজর জেনারেল রাত্তফর মান আলীকে ডেকে পাঠালেন। দু’জনে আলোচনার পর সিদ্ধান্ত দিলেন যে অবিলম্বে আত্মসমর্পণের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাদি অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। কিন্তু এখন প্রশ্ন হচ্ছে কোনো দূতাবাসের মধ্যস্থতা মেনে নেয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে? শেষ পর্যন্ত জেনারেলদের সিদ্ধান্ত হচ্ছে ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসের মধ্যস্থতায় আত্মসমর্পণের ব্যবস্থা করতে হবে। ঢাকায় তখন মার্কিন কনসাল জেনারেল হচ্ছেন মি. এস. পিভ্যাক। সন্ধ্যার সময় গোপনে দু’জনে দেখা করতে গেলেন মার্কিন কনসাল জেনারেল সঙ্গে সবকিছু শুনে মার্কিনি কূটনীতিবিদ বললেন, ‘জেনারেল আমি তো আপনাদের পক্ষ থেকে মধ্যস্থতা করতে পারি না। তবে আপনারা চাইলে আপনাদের বার্তাটুকু জায়গামতো পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করে দিতে পারি।’ এরপর মি. এম পি ভ্যাক এর অফিসে বসেই ভারতীয় আর্মি চিফ অব স্টাফ জেনারেল স্যাম মানেক শ’এর জন্য বিশেষ বার্তা লেখা হলো। এতে বলা হল যে, ১) পাকিস্তানি সৈন্য বাহিনী এবং সহযোগী বাহিনীর সদস্যদের নিরাপত্তা। ২) মুক্তি বাহিনীর হামলার মোকাবিলায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা এবং ৩) আহত ও রুগ্ন সৈন্যদের এবং চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে অবিলম্বে যুদ্ধ বিরতির জন্য আমরা রাজি আছি।’ পরবর্তীকালে এ মর্মে তথ্য পাওয়া গেছে যে, মার্কিন কনসাল এম পিভ্যাক এই বার্তা সরাসরি জেনারেল মানেক শ’এর কাছে কিংবা দিল্লীতে পাঠাননি। তিনি বার্তা পাঠিয়ে ছিলেন ওয়াশিংটনে মার্কিনি পররাষ্ট্র দফতরে। সঙ্গে সঙ্গে মার্কিন সরকার এ ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণের পূর্বে রাওয়াল পিন্ডিতে সামরিক প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সাথে যোগাযোগ চেষ্টা করেন। অনেকের মতে জঙ্গি প্রেসিডেন্ট এ সময় অতিমাত্রায় সুরা পান এবং অন্যান্য ধরনের কু-অভ্যাসে লিপ্ত হয়ে পড়েছিলেন। ফলে তাকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আর যোগাযোগ সম্ভব হয়নি। ১৫ ডিসেম্বর ভারতিয় আর্মি চিফ অব স্টাফ এবং মিত্র বাহিনীর প্রধান জেনারেল মানেক শ’এর কাছ থেকে ছোট্ট একটা বার্তা এসে পৌঁছালো। অবিলম্বে আমার অগ্রগামী বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করলো, আপনার বাহিনী এবং অন্যান্য ব্যক্তিবর্গের নিরাপত্তা বিধান করা হবে (পৃ. ২৮০, আমি বিজয় দেখিছি)। এদিকে জেনারেল নিয়াজী ভারতীয় ও মিত্র বাহিনীর প্রধানের নিকট থেকে বার্তা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা রাওয়াল পিন্ডিতে পাকিস্তানি বহিনীর চিফ অব স্টাফ জেনারেল আ. হামিদের কাছে পাঠিয়ে দিলেন। ১৫ ডিসেম্বর রাওয়াল পিন্ডি থেকে জবাব এলো, ‘প্রদত্তশর্ত মোতাবেক যুদ্ধবিরতি করার পরামর্শ দিচ্ছি…। এ দিকে ঢাকায় তখন এক শ্বাস রুদ্ধকর অবস্থা বিরাজ করছে। বিরতিহীন কারফিউয়ের জন্য আত্মীয়স্বজন আর বন্ধু বান্ধবদের মধ্যে যোগাযোগ নাই বললেই চলে। চার দিকে থেকে কেবল নৃশংস হত্যার খবর পাওয়া যাচ্ছে। পিতৃহারা এতিম বাচ্চার ফরিয়াদে খোদার আরশ পর্যন্ত কেঁপে উঠেছে। প্রায় সবাই তখন ঢাকা নগরীতেই পলাতকের জীবন যাপন করছে।

চার.

রাজধানী ঢাকা নগরীর ওপর লে. জেনারেল নিয়াজী ১৫ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় তার চীফ অব স্টাফ ব্রিগেডিয়ার বারেককে ডেকে বাকরুদ্ধ কণ্ঠে বিভিন্ন কমান্ডে পাঠাবার জন্য একটা জরুরি বার্তা খসড়া তৈরির নির্দেশ দিলেন। এক পৃষ্ঠাব্যাপী এই নির্দেশে সাহসিকতা পূর্ণ লড়াইয়ের জন্য প্রশংসা জ্ঞাপনের পর অবিলম্বে সবাইকে নিকটবর্তী ভারতীয় বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হলো। এই নির্দেশে আত্মসমর্পণ শব্দ উল্লেখ করা না হলেও শেষ দিকে একটা বাক্যে বলা হল যে, ‘দুঃখজনকভাবে এর অর্থ হচ্ছে সমরাস্ত্র জমা দিতে হবে।’ জেনারেল মালেক শ’বেতার মারফত আত্মসমপর্ণের আহ্বান জানালেন। এই আহ্বানের শেষে বলা হলো… এরপরও যদি আমার আবেদন মোতাবেক আপনি পুরো বাহিনীসহ আত্মসমপর্ণ না করেন তাহলে পুর্নোদ্যমে আঘাত হানার জন্য আমি ১৬ ডিসেম্বর সকাল ৯টায় পর নির্দেশ দিতে বাধ্য হব। উপরন্তু জেনারেল শার এই আহ্বান উর্দু এবং ইংরেজিতে প্রচারপত্র আকারে বিমানযোগে বাংলাদেশের সর্বত্র বিতরণ করা হলো। এই সময় পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা ভুট্টো নিরাপত্তা পরিষদে ভাষণ দিচ্ছিলেন। তিনি নিরাপত্তা পরিষদের অধিবেশন থেকে ওয়াক আউট করে চলে আসেন। এদিকে ১৫ ডিসেম্বর দিবাগত রাতে ঢাকা প্রতিরক্ষা বূ্যহ সুদৃঢ় করার দায়িত্বে লিপ্ত ব্রিগেডিয়ার বশির অস্থির হয়ে উঠলেন। কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় ব্রিগেডিয়ার বশির অত্যন্ত দ্রুত কিছু সৈন্য সংগ্রহ করে মেজর সালামতকে মীরপুর ব্রিজ পাহারা দিতে পাঠালেন। এ মর্মে তিনি নির্দেশ দিলেন যে, প্রয়োজন মতো এ ব্রিজ উড়িয়ে দিতে হবে। মেজর সালামত তার সৈন্য এবং ইপাকাফ সদস্যদের নিয়ে পজিশন নেয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই মেজর জেনারেল নাগরা তার অগ্রবর্তী কমান্ডো বাহিনী নিয়ে মীরপুর ব্রিজের অপর পারে আমিন বাজারে এসে পৌঁছলেন। সঙ্গে স্বয়ং কাদের সিদ্দিকী ও তার বাহিনীর কিছু সদস্য। মেজর জেনারেল নাগড়া নিয়াজীর উদ্দেশ্যে একটি চিরকুট লিখলেন,’প্রিয় আব্দুল্লাহ, আমি এখন মীরজুর ব্রিজে। আপনার দূত পাঠান।’ (আমি বিজয় দেখেছি, পৃ. ২৮৩) ১৬ ডিসেম্বর ভোরে মীরপুর ব্রিজের কাছে জেনারেল নাগরা রাস্তায় পায়চারী করার সময় মাঝে মাঝে দাঁড়িয়ে কুয়াশার মাঝ দিয়ে ঢাকা নগরীর ঝাপসা চেহারাটা দেখার চেষ্টা করছেন। তাকে খুবই চিন্তিত দেখাচ্ছিল। হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর হাত থেকে ঢাকা নগরীকে মুক্ত করার কৃতিত্ব তিনি কি লাভ করতে পারবেন? মীরপুর ব্রিজের পাদদেশে দাঁড়িয়ে হরদেব সিং ক্লার, সন্ত সিং আর কাদের সিদ্দিকীর সঙ্গে আলাপ করে জেনারেল নাগরা সিদ্ধান্ত নিলেন যে, এই মুহূর্তে জেনারেল নিয়াজীর কছে দূত পাঠাতে হবে। একটা জিপের সামনে বিরাট আকারের সাদা ফ্লাগ তৈরি করা হলো। ২ কমান্ডো ব্যাটালিয়নের দু’জন অফিসার ও ড্রাইভার জিপে উঠল। এরপর জেনারেল নাগরা একটা বার্তা নিয়াজীর উদ্দেশ্যে লিখলেন :্ত’প্রিয় আব্দুল্লাহ, আমি এখন মীরপুর ব্রিজে। ঘটনার পরিসমাপ্তি হয়েছে। পরামর্শ হচ্ছে, আপনি আমার কাছে আত্মসর্ম্পণ করুন। সে ক্ষেত্রে আমরা আপনাদের দেখাশুনার দায়িত্ব নেবো। শীঘ্র আপনার প্রতিনিধি পাঠান, ‘নাগরা’। ১৬ ডিসেম্বর সকাল পৌনে নয়টা নাগাদ জেনারেল নাগরা এই তার বার্তা তার এডিসির হাতে দিয়ে তাকেই নির্দেশ দিলেন জিপে নিয়াজীর কাছে যাওয়ার জন্য। সাদা ফ্ল্যাগ উড়িয়ে জিপটা ইস্টার্ন কমান্ড হেডকোয়াটারে এসে পৌঁছল। অবাক বিস্ময়ে পাকিস্তানি সৈন্যরা এই ভারতীয় জিপটাকে দেখছিল। তখন ঘুড়িতে সকাল নয়টা। হেডকোয়ার্টারে বসে রয়েছে পাকিস্তানি সৈন্য বাহিনীর টাইগার বলে পরিচিত লে. জেনারেল নিয়াজী। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে বীরত্ব সূচক মিলিটারী ক্রস বিজয়ী মেজর জেনারেল জমসেদ, ধূর্ত মেজর জেনারেল রাও ফয়মান আলী এবং নৌবাহিনীর আঞ্চলিক প্রধান রিয়ার এডমিরাল শরীফ। জেনারেল নাগরার বার্তা হাতে নিয়ে পড়ার পর নিয়াজীর চেহারাটা ফ্যাকাশে হয়ে গেলে। তিনি কোন কথা না বলে চিঠিটা অন্যদের পড়ার জন্য দিলেন। উপস্থিত সবাই বার্তাটা দেখলেন। মিনিট কয়েকের জন্য সেখানে কবরের নিস্তব্ধতা নেমে আসল।

পাঁচ.

রাওফরমান প্রথমে কথা বললেন। তাহলে জেনারেল নাগরাই আলোচনার জন্য এসেছে? এ প্রশ্নের কেউই জবাব দিলেন না। এখন প্রশ্ন হচ্ছে- জেনারেল নাগরাকে অভ্যর্থনা জানাবে নাকি সর্বশক্তি দিয়ে প্রতিহত করা হবে? জেনারেল নিয়াজীকে উদ্দেশ্য করে আবার রাওফরমান জিজ্ঞেস করলেন আপনার হাতে কি ঢাকার জন্য কিছু রিজার্ভ সৈন্য আছ? নিয়াজী এবারও কোনো জবাব দিলেন না। শুধু জেনারেল জমসেদের দিকে তাকালেন। রাজধানী ঢাকা নগরীর দায়িত্বে নিয়োজিত মেজর জেনারেল জমসেদ মুখে কিছু না বলে মাথাটা নেড়ে বুঝিয়ে দিলেন যুদ্ধ করার মতো ঢাকায় আর কোনো রিজার্ভ সৈন্য নেই। রিয়ার অ্যাডমিরাল শরীফ এবং রাওফরমান প্রায় একই সঙ্গে বললেন, ‘এই যখন পরিস্থিতি তাহলে নাগরা যা বলছে তাই করুন।’ (উইটনেস টু সারেন্ডার, পৃ. ২১০ সিদ্দিক সালিক) শেষ পর্যন্ত আলাপ আলোচনা করে সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো যে, জেনারেল জমসেদ যাবেন জেনারেল নাগরাকে অভ্যর্থনা জানাবার জন্য। সঙ্গে সঙ্গে মীরপুর ব্রিজ এলাকায় প্রহরারত পাকিস্তানি সৈন্যদের নিকট জরুরি নির্দেশ পাঠানো হলো। যুদ্ধ বিরতির কথাবার্তা হচ্ছে, তাই জেনারেল নাগরার ঢাকা নগরীতে প্রবেশের সময় যেন কোনো বাধা দেয়া না হয়। পর্যবেক্ষকদের মতে একত্তরের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকা নগরীতে মনোবলহীন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর প্রতিরক্ষা বূ্যহ একটা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়লো। দ্বিতীয় মহা যুদ্ধের বার্লিন, প্যারিস কিংবা লেলিন গ্রাডের মতো কিছুই এখানে হলো না। অনেকের মতে জেনারেল নিয়াজী পুরামাত্রায় যুদ্ধ শুরু করার আগেই পরাজয় মেনে নিয়েছিলেন। একটু পরেই সাদা ফ্ল্যাগ উড়িয়ে পাকিস্তানি সৈন্য বাহিনীর জিপ মীরপুর ব্রিজের ওপর দিয়ে এগিয়ে এলো। মুহূর্তের মধ্যে ২ কমান্ডো বাহিনী গুলি শুরু করলে অনেক কষ্টে তাদের বিরত করা হলো। জিপ থেকে একজন পাকিস্তানি মেজর নেমে জেনারেল নাগরাকে স্যালুট দিয়ে নিয়াজীর আত্মসমর্পণের বার্তা প্রদান করে জালো যে, ব্রিজের পশ্চিম ধারে লে. নিয়াজীর পক্ষ থেকে অভ্যর্থনা জানাজার জন্য মেজর জেনারেল জমসেদ অপেক্ষা করছেন। একটু পরেই জেনারেল নাগরা, কাদের সিদ্দিকী, ব্রিগেডিয়ার ক্লার সাদা ফ্ল্যাগ ওয়ালা জিপে মীরপুর ব্রিজের পশ্চিম ধারে এস উপস্থিত হলেন। জিওসি জমসেদ তাদের ঢাকা নগরীতে অভ্যর্থনা জানিয়ে নিজের স্টাফ গাড়িতে বসার অনুরোধ করলেন। তখন সকাল সাড়ে দশটা। জেনারেল নাগরা কে নিয়ে জীপটা ইস্টার্ন কমান্ড হেড কোয়ার্টারে আসার পর ব্রিগেডিয়ার বারেক সবাইকে অভ্যর্থনা জানিয়ে একটা সাজানো কক্ষে বসতে অনুরোধ করলেন। কয়েক মিনিটের মধ্যেই লে. জেনারেল নিয়াজী আন্ডার গ্রাউন্ড টেকনিক্যাল হেডকোয়ার্টার থেকে নিজস্ব অফিসে এস হাজি হলেন। জেনারেল নগরা ও তার সহকর্মীদের সঙ্গে করে মেজর জেনারেল জমসেদ এসে ঘরে ঢুকতেই নিয়াজী ধীর পদক্ষেপে এগিয়ে নাগরার সঙ্গে করমর্দন করে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন। জেনারেল নগরার কাঁধে মুখটা এলিয়ে দিয়ে নিয়াজীর বিরাট দেহটা কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো। নিয়াজী চিৎকার করে পাঞ্জাবিতে বললেন, ‘পিন্ডিতে হেডকোয়াটারের বেঈমানরা আমার এই অবস্থার জন্য দায়ী।’ নিয়াজীর কান্না থামিয়ে একটু ঠা-া হতেই জেনারেল নাগরা তার সহকর্মীদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে শুরু করলেন। প্রথমেই কাদেরীয়া বাহিনীর প্রধান কাদের সিদ্দিকী। নাগরা যখন কাদের সিদ্দিকীয় পরিচয় দিচ্ছিলেন তখন জেনারেল নিয়াজী, জেনারেল জমসেদ আর ব্রিগেডিয়ার বারেক এই বাঙালি যুবকের অপাদমস্তক নিরীক্ষা করছিলেন। জেনারেল নাগরা তার বক্তব্যের শেষ বললেন, ‘এই হচ্ছে সেই টাইগার সিদ্দিকী।’ জেনারেল নিয়াজী করমর্দনের জন্য কাদের সিদ্দিকীর দিকে হাত এগিয়ে দিলেন। সবাইকে হতবাক করে এই বীর মুক্তিযোদ্ধা তার হাত সরিয়ে নিয়ে ইংরেজিতে বললেন, ‘যারা নারী ও শিশু হত্যা করেছে তাদের সঙ্গে করমর্দন করতে পারলাম না বলে আমি দুঃখিত। আমি আল্লাহর কাছে জবাবদিহিকারী হতে চাই না।

ছয়.

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দুপুর প্রায় বারোটা নাগাদ কোলকাতাস্থ থিয়েটার রোডে মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তাজ উদ্দিন আহমেদ কাছে খবর এসে পৌঁছালে যে, ঢাকায় হানাদার বাহিনী আত্মসমর্পণে সম্মত হয়েছে। এই মুহূর্তে মিত্র বাহিনীর অন্যতম অধিনায়ক জেনারেল নাগরা এবং কাদেরীয়া বাহিনীর প্রধান কাদের সিদ্দিকী ঢাকায় ইস্টার্ন কমান্ড হেড কোয়াটারে আছেন। সব দিকে তখন আনন্দের বন্যা বইতে শুরু করলো। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ মুজিব নগর সরকারের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক কর্নেল (অব.) ওসমানীকে আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার জন্য অনুরোধ করেন। ওসমানী সাহেব তখন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদের সাথে একান্তে আলাপ করে সবশেষে বললেন, নো, নো প্রাইম মিনিস্টার, মাই লাইফ ইজ ভেরী প্রেসাস, আই কান্ট গো (না, না প্রধানমন্ত্রী, আমার জীবনের মূল্য খুব বেশি আমি যেতে পারব না, আমি বিজয় দেখিছি পৃ. ২৮৭, এম.আর.আখতার মুকুল) তখন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ.কে খন্দকারকে পাক-সেনা বাহিনীর আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য পাঠান। এ.কে খন্দকার সাহেব প্রধান মন্ত্রী তাজউদ্দিন সাহেবের কথা মতো তখন নির্বাসিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। হঠাৎ খবর আসল যে, অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা বিশেষ আর্মি হেলিকপ্টারে মেজর জেনারেল জ্যাকব এসে পৌঁছালেন। বেলা একটায় ব্রিগেডিয়ার বারেক তেজগাঁও বিমান বন্দর থেকে জেনারেল জ্যাকব এবং কর্নেল খোরাকে সঙ্গে নিয়ে এলেন। ‘জ্যাকবের হাতে সেই ঐতিহাসিক আত্মসমর্পণের দলিল’। জেনারেল নিয়াজী এই দলিলকে যুদ্ধ বিরতির খসড়া চুক্তি হিসাবে উল্লেখ করলেন। জেনারেল জ্যাকব ঐতিহাসিক দলিলটি সবার সামনে ব্রিগেডিয়ার বারেকের হাতে দিলেন। বারেক কয়েক পা এগিয়ে জেনারেল রাওফরমান আলীর টেবিলে দলিলটা খুলে ধরলেন। একটু নজর বুলিয়ে রাওফরমান আলী আপত্তি উত্থাপন করে বললেন, ‘ভারত ও বাংলাদেশের জয়েন্ট কমান্ডারের কাছে কথাটা তো থাকতে পারে না? আমরা তো ভারতীয় বাহিনীর সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করবো’। জেনারেল জ্যাকব তখন উত্তরে বললেন, দিল্লী থেকে এভাবেই এই দলিল তৈরি হয়ে এসেছে। ইহার কোনো পরিবর্তন বা সংশোধন করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়’। তার পর কর্নেল খেরা বলে উঠলেন, এটা তো আমাদের আর বাংলাদেশের মধ্যে একটা অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থা মাত্র। এরপর জেনারেল নিয়াজী দলিলটা একনজর দেখে কোনো মন্তব্য না করে রাওফরমানের হাতে ফিরেয়ে দিলেন। জেনারেল ফরমান তার বসের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আমাদের কমান্ডারই বলতে পারবেন যে, তিনি এই দলিল মেনে নিবেন, না প্রত্যাখ্যান করবেন?’ জেনারেল নিয়াজী কোনো জবাবই দিলেন না। প্রায় ১০/১৫ সেকেন্ড ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থেকে মাথা ঝুকিয়ে ইশারা দিলেন। উপস্থিত সবাই তখন বুঝতে পারল যে, টাইগার নিয়াজী নামে খ্যাত জেনারেল নিয়াজী আত্মসমর্পণ দলিলে স্বাক্ষর করতে রাজি হয়েছেন। একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর বেলা তিনটায় ভারীয় ইস্টার্ন কমান্ডের প্রধান লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা কোলকাতায় ফোর্ট উইলিয়াম থেকে সত্রীক হেলিকপ্টারে তেজগাঁও বিমান বন্দরে এসে হাজির হলেন। লে. জেনারেল নিয়াজী তাকে বিমান বন্দরে অভ্যর্থনা জানিয়ে স্যালুট করার পর করমর্দন করলেন। সে এক হৃদয়স্পর্শী দৃশ্য। কিছুক্ষণ পর তার কাছেই নিজেকে আত্মসমর্পণ করতে হবে। বেলা সোয়া চারটা নাগাদ শিখ জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা নিরাপত্তা বেস্টনির মাঝ দিয়ে জেনারেল নিয়াজী ও অন্যদের সঙ্গে করে জোর কদমে এগিয়ে চললেন আত্মসমর্পণ মঞ্চে। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিকাল ৪.৩১ মি. পাকিস্তান সরকার ও সেনাবাহিনীর পক্ষে লে. জেনারেল এ.এ.কে নিয়াজী মুক্তি ও মিত্র বাহিনীর প্রধান (বাংলাদেশ-ভারত যৌথ কমান্ড) জগজিৎ সিং অরোরার নিকট আত্মসমর্পণ করেন, অর্থাৎ আত্মসমর্পণ দলিলে স্বাক্ষর করলেন। প্রায় লাখ লাখ জনতা এবং শতাধিক বিদেশি সাংবাদিক এই অনুষ্ঠানে অবলোকন করলেন। এর পর দু’পক্ষের সেনাপতিরা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। আনুষ্ঠানিকতা পালনের জন্য জেনারেল নিয়াজী তার রিভলবারটা এবং ইউনিফরম এর কাঁধ থেকে মেজর জেনারেল রেঙ্ক ব্যাজ খুলে দু’টো জেনারেল অরোরার হাতে উঠিয়ে দিয়ে নিজে আত্মসমর্পণ করলেন। পরাজিত পাকিস্তানি বাহিনীর বাকী সমস্ত সদস্য অস্ত্র সমর্পণ ও ব্যাজ খোলার আনুষ্ঠানিকতা পালন করলো। ঢাকা শহরের সমস্ত বাড়িতে গাঢ় সবুজের বাংলাদেশের মানচিত্র অংকিত পতাকা উড়তে শুরু করল। লন্ডনে প্রবাসী বাঙালিরা মিছিল বাহির করলো। সাড়ে সাতকোটি বাঙালি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। ত্রিশ লাখ শহীদের বিনিময়ে আমরা পেলাম একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র নাম তার বাংলাদেশ।

মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন : লেখক/কলামিস্ট/গবেষক


নতুন কাগজ | রুদ্র মাহমুদ

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Loading Facebook Comments ...
 বিজ্ঞাপন