যুগল সমারোহে মুখর বইমেলা

0
14

নিজস্ব প্রতিবেদক: ১৪ ফেব্রুয়ারি বুধবার বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। এদিন মেলার ১৪তম দিন। ভালোবাসার এই দিনে বিকেল তিনটায় উন্মুক্ত হওয়ার পর থেকেই মুখরিত হয়ে উঠেছে মেলা প্রাঙ্গণ। প্রিয়জনকে নিয়ে মেলায় আসতে শুরু করেছেন নানা বয়সী মানুষ। তাদের মধ্যে তরুণ-তরুণীরাই বেশি। বিশ্ব ভালোবাসা দিবসকে কেন্দ্র করে প্রেমিক যুগলের পদচারণায় মুখর থাকবে মেলা শেষ অবধি। শুধু মেলায় ঘোরাঘুরি নয়, তারা কবিতা, গল্প আর উপন্যাসের বই কিনে দিচ্ছেন প্রিয় মানুষের হাতে। সেই বইয়ের মলাটের ফাঁকে গুঁজে দিচ্ছেন ভালোবাসায় সিক্ত গোলাপ কলিটিও। হাতে হাত রেখে পরস্পরের উষ্ণতা অনুভব করেছেন। যুগলবন্ধনে হেঁটে চলেছেন মেলার স্টলে স্টলে। বর্ণিল পোশাকের রঙবাহারে মেলা হয়ে উঠেছে রঙিন।

এর আগে তখনো উন্মুক্ত হয়নি বইমেলার দুয়ার। মেলায় প্রবেশের অপেক্ষা যেন আর সইছে না উৎসুক যুগলদের। বইমেলা প্রাঙ্গণে প্রবেশের সময় বিকেল ৩টা। নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই তরুণ-তরুণীরা দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন- কখন খুলবে দ্বার! আর তারা মিশে যাবেন প্রাণের মেলায়, ভালোবাসার মেলায়।

আগের দিন মঙ্গলবার ছিল ঋতুরাজ বসন্তের প্রথম দিন। তবে বসন্ত উৎসবে রঙের বাহার ও হলুদের ছড়াছড়ি থাকলেও বুধবার ততটা ভালোবাসার রঙ লালের দেখা মেলেনি। বেশির ভাগ তরুণ-তরুণীই এসেছেন সাদামাটা পোশাকেই। তবে প্রায় সব তরুণীর হাতে ছিল ভালোবাসার গোলাপ আর মাথায় ফুলের মুকুট।
বইমেলায় অন্য দিন সব বয়সী ক্রেতা ও দর্শনার্থীর টান থাকলেও আজ যেন ক্রেতা দর্শনার্থীর সিংহভাগই তরুণ-তরুণী। ভালোবাসার টানে প্রিয়জনের হাত ধরে ঘুরতে বেড়িয়েছেন তারা। অন্যান্য দিন বা সময়ে ঘুরতে বের হলেও এই দিনটিতে হাতে হাত রেখে ঘুরে বেড়ানো বিশেষ কিছু। তবে প্রিয়জনের হাত ধরে ঘুরতে ঘুরতে শেষেই তারা মনোযোগ দিয়েছেন পছন্দের বই কেনার দিকে। প্রিয় মানুষটিকে বই উপহার দিতেও কার্পণ্য করছেন না তারা।

ভালোবাসা দিবসে মেলায় গিয়ে দেখা যায় উপন্যাসের কাটতি বেশ ভালো। ক্রেতাদের পছন্দের শীর্ষে যে উপন্যাস রয়েছে তা জানালেন প্রকাশক ও লেখকেরাও। যেসব বই বিক্রি হচ্ছে তার বেশিরভাগই ভালোবাসার মানুষকে উপহার দিতেই কিনছেন তরুণেরা।

মেলায় প্রিয় মানুষটিকে নিয়ে পুরান ঢাকা থেকে ঘুরতে এসেছেন মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, স্পেশাল দিনে স্পেশাল মানুষকে সময় দিতে পারা সবার জন্যই ভালো লাগার। সামনে সময় পাব কিনা জানি না। আজকে তাই সময় বের করে চলে আসা।

প্রিয় মানুষকে সঙ্গে নিয়ে গোড়ান থেকে মেলায় এসেছেন শাওলিন ও সাফওয়ান। শাওলিনের পরনে নীল শাড়ি আর সাফওয়ানের পরনে ঘিয়ে রঙা পাঞ্জাবি। তাদের সঙ্গে কথা হয় গ্রন্থমেলা ও ভালোবাসা দিবস নিয়ে। সাফওয়ান জানালেন, গত বছর পহেলা ফাল্গুনে ফেসবুকে পরিচয় হয় শাওলিনের সাথে। মাত্র একদিনের পরিচয়ে তার ডাকে সাড়া দিয়ে পরদিন ভালোবাসা দিবসে বইমেলায় আসেন শাওলিন। ওইদিনের কয়েক ঘণ্টা আলাপে মুগ্ধ সাফওয়ান একগুচ্ছ বই কিনে গুছে দেন শাওলিনের হাতে। শাওলিন প্রথমে সংকোচ করলেও পরে বইগুলো নেন। এরপর মোবাইল ফোনে চলতে থাকে তাদের আলাপন। ফেসবুকের ম্যাসেঞ্জারে চ্যাটিং। এক সময় তাদের সম্পর্ক প্রেমে পরিণত হয়। তারা সিদ্ধান্ত নেন প্রতিবছর ভালোবাসা দিবসে বইমেলায় আসবেন এবং একে অপরকে বই কিনে উপহার দেবেন। সে কারণেই তাদের মেলায় আসা।

শ্যামলী থেকে শামীমাও তার প্রিয় মানুষকে নিয়ে এসেছেন মেলায়। তার পরনেও নীল শাড়ি। তিনি বলেন, ভালোবাসা তো প্রতিদিনের। কিন্তু ভালোবাসা দিবস আসে মনকে অন্যরকম রঙে রাঙিয়ে দিতে। একটা দিন সবকিছুকে ভুলে শুধু ভালোবাসা আর ভালোবাসা। তার কথায় সাড়া দিয়ে সঙ্গে থাকা প্রিয় মানুষটিও হেসে উত্তর দেন ‘ভালোবাসি ভালোবাসি ভালোবাসি’।

বসন্তের প্রথম দিনে বাসন্তী রঙের ছড়াছড়ি থাকলেও ভালোবাসা দিবসে পোশাকে ততটা রঙ ছিল না। রঙ ছিল প্রেমিক যুগলদের মনে। ভালোবাসার রঙে তারা রাঙিয়ে চলেছেন একুশের মেলা।

ভালোবাসা দিবসের প্রভাবেই অন্যান্য দিনের চেয়ে মেলায় বই বিক্রিও ভালো। যদিও শুরু থেকেই বিক্রি খারাপ হচ্ছে না, অন্তত প্রকাশকরা তাই বলছেন। ভালোবাসা দিবসে ক্রেতাদের পছন্দের ক্ষেত্রে উপন্যাসই ছিল শীর্ষে। আর এসবের বেশিরভাগই কেনা হয়েছে ভালোবাসার মানুষকে উপহার দেয়ার জন্য।

অন্যপ্রকাশের প্রকাশক মাজহারুল ইসলাম বলেন, মেলার প্রথম দিন থেকেই তার প্রকাশনীতে উপন্যাসের বিকিকিনি ভালো। বুধবারও উপন্যাসের ভালো বিক্রি আশা করছেন।

কথা হয় প্রকাশনা সংস্থা আগামী প্রকাশনীর স্টল ব্যবস্থাপক মাহমুদুল হাসান বলেন, মেলার প্রথম দিন থেকেই তার স্টলে উপন্যাস ও প্রবন্ধের বই ভালো বিক্রি হচ্ছে। ভালোবাসা দিবসেও ভালো বিক্রি হবে বলে আশা করি।

একাধিক প্রকাশক জনালেন, ভালোবাসা দিবসকে কেন্দ্র করে প্রেমের উপন্যাসগুলোর চাহিদা বেশি। বিশেষ করে হুমায়ূন আহমেদ, ইমদাদুল হক মিলনসহ খ্যাতিমান লেখকদের উপন্যাসই বিক্রি হচ্ছে। পিছিয়ে নেই কবিতার বইও। জনপ্রিয় কবিদের পাশাপাশি হালে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা কবিদের কাব্যগ্রন্থও ভালো বিক্রি হচ্ছে।

মেলায় এখন পর্যন্ত নতুন আসা বইয়ের মধ্যে রয়েছে-সৈয়দ শামসুল হকের ‘উৎকট তন্দ্রার নিচে’ (অন্যপ্রকাশ), মহাদেব সাহার ‘অনন্তের বাঁশি’ (অনন্যা), নাসির আহমেদের ‘প্রতীক্ষা তোমার জন্য’ ও ‘ভালো থাকার নির্দেশ আছে’(দি রয়েল পাবলিশার্স), নির্মলেন্দু গুণের ‘একটি সন্তানসম্ভবা পাখির গল্প’ (অবসর), অসীম সাহার ‘পাঁজর ভাঙার শব্দ’(ইন্তামিন প্রকাশন), নির্মলেন্দু গুণের ‘রচনাবলি ২ (কাকলী প্রকাশনী), ফারুক মাহমুদের ‘আগুনে আপত্তি নেই’ (উৎস প্রকাশন), পিয়াস মজিদের ‘নাচ, মারবেল ও গোধূলি (পাঞ্জেরী), মুজিব ইরমের ‘আমার নাম মুজিব ইরম আমি একটি কবিতা বলবো’ (চৈতন্য প্রকাশন), আলফ্রেড খোকনের ‘উড়ে যাচ্ছ মেঘ’(শ্রাবণ), খালেদ হোসাইনের ‘আগুনের একটি স্ফূলিঙ্গ চুপ করে বসে আছে-’ (আলোঘর), সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলালের ‘জাদুকর (আদিত্য অনিক প্রকাশনী), মাজহার সরকারের ‘প্রিয়তমো সুন্দর সময় চলিয়া যায়’(দেশ পাবলিকেশন্স), সালেহীন শিপ্রার ‘প্রকাশ্য হওয়ার আগে’ (প্রথমা), ওবায়েদ আকাশের ‘বাছাই কবিতা’(বেহুলা বাঙলা)।

আগে প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে সৈয়দ শামসুল হকের ‘অর্পিত পদাবলি’ (অন্যপ্রকাশ), ‘শঙ্খস্বর সমুদ্রের তীরে’ও ‘বাহান্নো একাত্তর দুই হাজার তেরো’ (শুদ্ধস্বর), ‘অগ্নিজলের কবিতা কমল’ (অনন্যা)।

মহাদেব সাহার ‘বাংলাদেশ, তোমাকে প্রণাম’(অন্যপ্রকাশ), ‘গোলাপের গায়ে কী গন্ধ’ (অনন্যা), ‘জাগরণের কবিতা’ (বাংলাপ্রকাশ), ‘ক্যালগেরির কাব্য’ (মাওলা ব্রাদার্স), বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের ‘হেমন্তের দিকে মুখ করে’, মোহাম্মদ রফিকের ‘ঘোরলাগা অপরাহ্ন’, মাহমুদ আল জামানের ‘ভুবনডাঙার মেঘ ও কালো নধর বেড়াল’(শুদ্ধস্বর), বেঙ্গল পাবলিকেশন্সে মোহাম্মদ রফিকের ‘কালের মান্দাস’, বিভাসে পাওয়া যাচ্ছে আসাদ মান্নানের ‘প্রেমের কবিতা’, অন্যপ্রকাশ থেকে হাবীবুল্লাহ সিরাজীর ‘মিথ্যে তুমি দশ পিঁপড়ে’।

এ ছাড়া হেলাল হাফিজ, আসাদ চৌধুরী, রফিক আজাদ, মুহম্মদ নুরুল হুদা, কামাল চৌধুরী, মুস্তাফিজ শফি, মাহবুব আজীজসহ বিভিন্ন জনপ্রিয় কবির পুরনো কাব্যগ্রন্থ-এর নতুন সংস্করণ পাওয়া যাচ্ছে মেলায়।

 

 

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করে আপনার মন্তব্য লিখুন
অনুগ্রহ করে এখানে আপনার নাম লিখুন