Natun Kagoj

ঢাকা, শুক্রবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৭ | ১ পৌষ, ১৪২৪ | ২৬ রবিউল-আউয়াল, ১৪৩৯

মুসলিম হাউস: বাঙ্গালীর ইতিহাস

আপডেট: ১০ মার্চ ২০১৭ | ১৬:২২

উৎপল দাশগুপ্ত

দ্রোহে-যুদ্ধে-রক্তে-আগুনে বাঙ্গালীর আত্মপরিচয় সন্ধানের কাল-১৯৭১ এর একটি ভয়ংকর সত্য ঘটনার উপন্যাস ‘মুসলিম হাউস’।স্বাধীনতার প্রায় ৪২ বছর পরও উপন্যাসে বর্ণিত কাহিনী আমাদের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়- ‘তোমাদের যা বলার ছিল, বলছে কি তা বাংলাদেশ?’।

মুসলিম হাউস কি ধরণের উপন্যাস? উপন্যাসিক তার উপন্যাসের পরিচয় দিতে গিয়ে লিখেছেন ‘মুক্তিযুদ্ধের বাস্তব ঘটনা অবলম্বনে ৭১ এর উপন্যাস’।কিন্তু উপন্যাসটি পড়ে মনে হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধ উপন্যাসের কাহিনী হলেও এর অর্ন্তমুখী সুর ছিল বাঙ্গালী জাতির আত্ম-অনুসন্ধান।রাজনৈতিক-সামাজিক-অর্থনৈতিক দিক থেকে বাঙ্গালী জাতির এই আত্ম-অনুসন্ধানের চেষ্টা গ্রন্থটিকে ‘মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাসে’ আটকে না রেখে দিয়েছে ঐতিহাসিক মাত্রা।

উপন্যাসের ‘মুসলিম হাউস’ নাম নির্বাচনে ঘটনার সত্যতা যেমন ছিল, তেমনি ঘনিষ্ঠ দেখা সেই সত্যতাকে পরবর্তীতে ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর আয়োজন, বাঙ্গালীর আত্মপরিচয়ের সংকটকে উপলব্দি করানোর অপূর্ব প্রকাশ। ‘আমি আগে মুসলমান না আগে বাঙ্গালী’- মুক্তিযুদ্ধের সেই দিনগুলো আমাদের দাঁড় করিয়েছিলো এই প্রশ্নের সামনে। গ্রন্থের নাম নির্বাচনে উপন্যাসিকের চিন্তাশীলতা তাই দূর্দান্ত।

উপন্যাসের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র আতাহার সাহেব পাকিস্তানী মিলিটারিদের কাছে নিজেকে চেনানোর জন্য বাড়ীর দেওয়ালে আলকাতরা দিয়ে যখন লিখেন ‘মুসলিম হাউস’, বাঙ্গালীর আত্মপরিচয়ের সংকট তখন দৃশ্যমান।কি লিখলেন, কেন লিখলেন, উপন্যাসের কেন্দ্রীয চরিত্র মাজেদকে তা বোঝাতে গিয়ে আতাহার সাহেব যখন বলেন, ‘লিখছি, মুসলিম হাউস। মানে মুসলমানের বাড়ি।আমাদের কোন সমস্যা নাই।আমরা তো কোন গোলমাল ফ্যাসাদের মধ্যে নাই।তবুও সবার জানা থাকা ভাল যে এটা একটা মুসলমানের বাড়ি’।তখন এটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে, বাঙ্গালী জাতি হয়ে ওঠার জন্য যে যুদ্ধ শুরু, আতাহার সাহেব যাকে বলছেন ‘গোলমাল ফ্যাসাদ’, আবার ‘মুসলমানের বাড়ি হলেই নিরাপদ’ – এই বোধগুলোই আত্মপরিচয়ের সংকটকে তীব্র করেছে। পাকিস্তানী মিলিটারিদের সহযোগি হয়ে বাঙ্গালী নিধনে উৎসাহী করেছে।রাজকার, আলবদর আলশামস তৈরি করেছে।উপন্যাসিক বিষয়গুলোকে ফ্রেমবন্দী করেছেন সহজাত নিপুণতায়।

উপন্যাসের ভূমিকা ‘কিছু কথা’ অংশে উপন্যাসিক নিজেও বলেছেন,‘তবে যুদ্ধকালে যুদ্ধের পূর্বে এবং পরে একটি সম্প্রদায়ের জন্য আইডেনটিটি সুনির্দিষ্ট ছিল।তারা হলো বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়।পাকিস্তান সরকার এবং তাদের এদেশীয় সহযোগিরা ধরে নিয়েছিলো, পাকিস্তান একটি মুসলিম রাষ্ট্র, এই রাষ্ট্র ভেঙ্গে একটি সেক্যুলার বাংলাদেশ গড়ার চিন্তা হিন্দুদের ষড়যন্ত্রেরই অংশ’।তাই উপন্যাসের শুরুর দিকে মুসলিম লীগের ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতি, দ্বি-জাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্রের অভ্যুদয়, পরবর্তীতে শুধু ধর্মের ওপর ভর করে পাকিস্তানের বাংলাভাষী বিশাল জনগোষ্ঠীকে যেনতেনভাবে শাসনের চেষ্টার পাশাপাশি পাকিস্তানের উভয় অংশের মানুষের মনোগত চেতনার বৈপরীত্য উপন্যাসিকের ইতিহাসনির্ভর নির্মোহ বিশ্লেষনে সহজবোধ্য হয়ে ওঠেছে।

মুসলিম হাউস তাই শুধুমাত্র একটি উপন্যাসই নয়, বাঙ্গালীর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস গবেষনার কাজে উপন্যাসটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘মৌলিক উপাদান’ হিসেবেও ব্যবহৃত হওয়ার দাবী রাখে।

উপন্যাসের পুরো কাহিনীটিই কমবেশি উপন্যাসিকের দেখা।উপন্যাসের চরিত্র আতাহার সাহেব, আতাহার সাহেবের ছেলে আযহার পরবর্তীতে বাংলাদেশ সরকারের সচিব, আসিরুদ্দিন সবাই লেখাপড়া জানা সমাজের মানুষ।তারা সব জেনে-বুঝে পাকিস্তানিদের কাছ থেকেও ফায়দা নেয়, আবার মুক্তিযোদ্ধোদের কাছ থেকেও ফায়দা নেয়। অন্যদিকে বিজয়ের পরও মুক্তিযোদ্ধা সিকন্দার বয়সের তুলনায় অনেক বেশি বুড়িয়ে যায়।অর্থের অভাবে কলেজে যেতে পারে না তার মেয়ে। খাবারেরও সংস্থান নেই। তাই সিকান্দারের বৌ যথন বলে ‘আপনি মুক্তিযোদ্ধা।আমি তো মুক্তিযোদ্ধা না।আমার সঙ্গে পেট আছে’- মুক্তিযোদ্ধাদের এই কষ্টের বর্ণনা- মুসলিম হাউস উপন্যাসকে মুক্তিযুদ্ধের প্রামাণ্য দলিলের মর্যাদা দেয়।

উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র মাজেদ। মাজেদ অশিক্ষিত। আত্মপরিচয়ের সংকট বোঝে না।তবে ভালো আর মন্দের যে স্বাভাবিক পার্থক্য রয়েছে তা উপলদ্ধি করে।মাজেদ আতহার সাহেবের বাড়িতে লালিত-পালিত।আতাহার সাহেব পাকিস্তানপন্থী, তাই মাজেদের মুক্তিযুদ্ধে যাওয়া হয় না। বরং নিজ স্বার্থে আতাহার সাহেব মাজেদের ওপর হিন্দু জেলে পরিবারের মেয়েকে ধর্ষন ও হত্যার কালিমা লেপে দিয়ে তার ‘ভালো সত্তা’কেই মানুষের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে।কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা সিকান্দার, নিমাই সাহার দোকানের কর্মচারী রঞ্জন দা’রা মাজেদকে ঠিকই বুজতে পারে।তাই একজন মাজেদকে ছদ্মবেশী আতাহার সাহেবের কাছ থেকে প্রাণে বাঁচায়, আরেকজন মাজেদকে সিগারেট দেয় মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য। মাজেদ তাই মুক্তিযোদ্ধা।উপন্যাসের শেষে ষাট বছর বয়সী অর্ধেক পাকা চুলের কালো মানুষ মাজেদ যখন সিকান্দারের সামনে এসে দাঁড়িয়ে ডাকে ‘ভাই’, মুক্তিযোদ্ধাদের ঐক্য তখন আমাদের নতুন বার্তা দেয়।মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় একটি সুখী, সমৃদ্ধ, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ বিনির্মাণের।

উপন্যাসিক পেশায় একজন সাংবাদিক। তাই উপন্যাসের কাহিনী বর্ণনাতে উপন্যাসিকের পেশাগত ছাপ স্পষ্ট। কোন ভনিতা নেই, কোন রুপক নেই, কোন অলঙ্কার নেই।যা দেখেছেন অবিকল লিখে গেছেন সেইভাবে।উপন্যাসিক নিজেও বলেছেন, উপন্যাসে ‘একটি সমাজে চলমান দৃশ্যের ধারা বর্ণনা’ করার চেষ্টা করেছেন।তার সেই চেষ্টা শতভাগ সফল।

সুন্দর প্রচ্ছদ ও মলাটে ৮০ পৃষ্ঠার বইটি প্রকাশ করেছে বেহুলা বাংলা প্রকাশনী। প্রায় একমাস বাংলা একাডেমির অমর একুশে বইমেলায় বেহুলা বাংলার স্টলে বইটি পাওয়া গেছে।এখনো বেহুলা বাংলা প্রকাশনিসহ রাজধানীর সকল অভিজাত বই বিক্রয় কেন্দ্রে বইটি পাওয়া যাচ্ছে। বইটির পরিবেশক রকমারি ডটকম।বইটির মূল্য ১২০টাকা।

লেখক পরিচিতি

মুসলিম হাউস গ্রন্থের লেখক মহসীন হাবিব জন্মগ্রহণ করেছেন ফরিদপুর শহরের টেপাখোলায়। অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠনের স্বপ্ন তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। লিখেছেন উপন্যাস, ছোটগল্প ও প্রবন্ধ। রয়েছে অনুদিত গ্রন্থও।বর্তমানে তিনি ইংরেজি দৈনিক ‘দি এসিয়ান এজ’ পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন।

 

 

উৎপল দাশগুপ্ত, সাংবাদিক।

 


নতুন কাগজ | রুদ্র মাহমুদ

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Loading Facebook Comments ...
 বিজ্ঞাপন