মামলাটি কাঙ্খিতই ছিল

0
24

সাইদুর রহমান রিমন:

অবশেষে সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আরো একটি মামলা ঠুকলেন লালমনিরহাট-১ এর সংসদ সদস্য, সাবেক প্রতিমন্ত্রী মোতাহার হোসেন। এবারের মামলাটিতে বাংলাদেশ প্রতিদিনের সম্পাদক মহোদয় ছাড়াও আমাকে এবং স্টাফ রিপোর্টার গোলাম রাব্বানী ও লালমনিরহাট প্রতিনিধি মানিককে আসামি করা হয়েছে।

মামলাটি কাঙ্খিতই ছিল। কারণ, মামলাবাজ মোতাহার হোসেন এমপি পান থেকে চুন খসলেই মামলা করেন, যে কাউকে হয়রানি চালান। তার সংসদীয় এলাকার বাসিন্দা এক সাংবাদিক ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে ২৩টি পর্যন্ত মামলা হয়রানি চালানোরও রেকর্ড আছে তার। তিনি সরাসরি হাজির না হয়ে পোষ্য ক্যাডারদের বাদী বানিয়ে একের পর এক মামলা ঠুকে তার প্রতিপক্ষ নেতা-কর্মিদের পর্যন্ত নাজেহাল করতে দ্বিধা করেন না এই মোতাহার হোসেন। তাছাড়া সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের নানাভাবে পর্যুদস্ত করে বিকৃত আনন্দ লাভ করে থাকেন সরকারদলীয় এই সংসদ সদস্য। একদা সাদাসিধে সিপাই পদে চাকরিজীবী মোতাহার হোসেন এমপি হিসেবে নির্বাচিত হয়ে ২০০৯ সালে গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রীত্ব লাভ করতেই আলাদীনের চেরাগ হাতে পেয়ে বসেন। সাধারণ ডিলার ব্যবসা থেকে রাতারাতি তিনি শত কোটিপতি বনে যান। তার রাতারাতি অর্থবিত্তের মালিক হওয়ার বিষয়টি নিয়ে কেউ কিছু বললেই তেলে বেগুনে জ্বলে উঠেন মোতাহার হোসেন।

দেশের প্রথম শ্রেণীর পত্রিকাগুলোতে মোতাহার হোসেনের নানা অপকর্ম নিয়ে বারবারই ফলাও প্রতিবেদন ছেপেছে। বাংলাদেশ প্রতিদিনেও ছাপা হয়েছিল লীড নিউজ : ‌‌’ডিলার ব্যবসায়ি মোতাহার এখন শত কোটিপতি।’ তাতেই মানহানির মামলা দিয়ে সম্পাদক মহোদয়ের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারী পরোয়ানা পর্যন্ত জারি করাতে সমর্থ হন তিনি। সভাতই তার সহায় সম্পদ আর অত্যাচারের সাম্রাজ্য তুলে ধরার দায়িত্বটি বর্তে আমার উপর। দু’দিনের অনুসন্ধানে যত সব প্রমানিত তথ্য পেয়েছি তাতে টানা বিশ দিন সিরিজ রিপোর্ট করাও সম্ভব ছিল। কিন্তু সম্পাদক মহোদয় খুব বেশি সতর্ক, খুব বেশি হৃদয়বান। তাঁর এক কথা: এখন সত্য তথ্য ছাপলেও তা মনে হতে পারে আক্রোশমূলক। এ কারণে অনেক অনুরোধের পর বড়জোর একটা আইটেম ছাপাতে তার মৃদু সম্মতি লাভ করেছিলাম। তাই বাংলাদেশ প্রতিদিনে ছাপা হলো আরেকটি লীড ‘লালনিরহাটে মোতাহারের সাম্রাজ্য।’

এতেই তোলপাড় শুরু হলো, ২০০ টাকা দরে কেনাবেচা হলো পত্রিকা। ভীষণ ক্ষেপে গেলেন মোতাহার ও তার পোষ্যরা। প্রতিবাদ মিছিল, সমাবেশ, পত্রিকা পুড়িয়ে দেয়াসহ সম্পাদক নঈম নিজাম ভাইয়ের কুশপুত্তলিকা দাহ পর্যন্ত করে ফেললেন তারা। শেখ হাসিনার উন্নয়নের জোয়ার বহমান দেশে তার দলেরই সংসদ সদস্যের নেতৃত্বে-নির্দেশে সীমাহীন বিশৃঙ্খলা আর তান্ডব দেখতে পেলেন লালমনিরহাটবাসী। যেন উন্নয়ন আর কল্যাণের কুশপুত্তলিকা দাহ করার নগ্নতায় উন্মত্ত হয়ে উঠলেন মোতাহারের পান্ডারা। অবশেষে আজ রুজু করলেন মানহানীর মামলা।

সবচেয়ে দুঃখ পাচ্ছি একটা কথা ভেবে-প্রতিবেদন করাকালে বাংলাদেশ প্রতিদিনের লালমনিরহাট প্রতিনিধি মানিক ভাই কোনরকম তথ্য সহায়তা পর্যন্ত দিতে পারলেন না, পেছনে আক্রোশ-আক্রমনের শিকার হন এই ভয়ে ফোনে কথা বলতেও তিনি অপারগতা জানালেন-অথচ মোতাহার হোসেন সেই নিরীহ সংবাদ কর্মিকেও মামলায় আসামি করলেন। মোতাহারের এ অপকর্মের জন্য তার হয়েই মানিক ভাইর কাছে দুঃখ প্রকাশ আর ক্ষমা চাইছি।

অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে হুমকি ধমকি আর মামলা হয়রানি কপাল জুটেছে বারবারই। ১৯৯৯ সালে বাংলাবাজার পত্রিকায় যমুনা গ্রুপ ও বাবুলের মদ বাণিজ্য সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করায় শুরু হয় মামলার ধকল। ৫০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণের দাবিতে মানহানীর মামলা দায়ের করেই ক্ষ্যান্ত ছিলেন না যমুনার বাবুল, তিনি সবগুলো দৈনিকের প্রথম পাতায় ছবিসহ এই সাংবাদিককে ধরিয়ে দিন মর্মে বিজ্ঞাপনও ছাপিয়েছিলেন। তারপরও দেড় যুগ পেরিয়ে গেছে-এখনও আছি গণমাধ্যমেই। এখনও একজন ভালমানের রিপোর্টার হওয়ার, দীক্ষা নেওয়ার জন্যই আমার নিরন্তর এ পথ চলা।

সিনিয়র রিপোর্টার, বাংলাদেশ প্রতিদিন

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করে আপনার মন্তব্য লিখুন
অনুগ্রহ করে এখানে আপনার নাম লিখুন