মাদকবিরোধী যুদ্ধ: আমার ভুল পুনরাবৃত্তি করছেন  রাষ্ট্রপতি দুতার্তে  

112

সিজার গ্যাভিরিও

অবৈধ মাদকদ্রব্য জাতীয় নিরাপত্তার প্রতি হুমকী। তবে শুধুমাত্র সশস্ত্র বাহিনী ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা দিয়ে মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ জেতা সম্ভব নয়। মাদক ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে অধিক পরিমানে সেনা ও পুলিশ লেলিয়ে শুধু অর্থের অপচয়ই হয়না, সমস্যা আরও প্রকটতর হয়ে ওঠে। অহিংস অপরাধীদের এবং মাদকদ্রব্যের ব্যবহারকারীদের লক করা প্রায়শই পিছিয়ে পড়ে, পরিবর্তে সংগঠিত অপরাধকে শক্তিশালী করে। অহিংস অপরাধী আর মাদকসেবীদের কারাগারে বন্দী করলে প্রায় সকলক্ষেত্রেই উল্টো ফল হয়, সংঘবদ্ধ অপরাধীচক্র আরও কৌশলী ও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

এই বার্তাটি আমি পৃথিবীকে জানাতে চাই, বিশেষত ফিলিপিনের প্রেসিডেন্ট রডরিগো দুতার্তেকেও প্রেরণ করতে চাই। আমার উপর আস্থা রাখুন, অনেক কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আমার এ অভিজ্ঞতা হয়েছে।।

মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই সম্পর্কে আমরা কলম্বিয়ানরা কিছু না কিছু তো জানি। দীর্ঘকাল ধরে আমাদের দেশটি বিশ্বের অন্যতম প্রধান কোকেন সর্বরাহকারী। উত্তর আমিরকা ও পশ্চিম ইউরোপের সরকারগুলোর সহযোগীতায় বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে মাদক উচ্ছেদ ও নির্মূল করতে মাদকের বিরুদ্ধে নিরবিচ্ছিন্ন প্রচারাভিযান চালিয়েছি। ১৯৯৩ সালে পৃথিবীর কুখ্যাত মাদক কারবারি পাবলো এসকোবারকে নির্মূল করার কাজে আমি নিজে ব্যক্তিগতভাবে জড়িত ছিলাম। তাকে নির্মূল করার মাধ্যমে কলম্বিয়াকে কিছুটা নিরাপদ করা গেলেও চরম মূল্য দিতে হয়েছিলো।

আমার সরকার এবং প্রশাসন সমস্যার সমাধানের জন্য সবকিছু করেছে। মাদক চাষের ক্ষেতগুলো বিনাশের জন্য স্প্রে করা থেকে শুরু করে মাদক বিক্রেতাকে দেখা মাত্রই জেলে দেয়া হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় কলম্বিয়ায় মাদক উৎপাদন, চোরাচালান ও ব্যবহার বন্ধ করতে শুধু ব্যর্থ হয়েছি তাই না, সেই সাথে পার্শ্ববর্তী দেশে মাদক ও অপরাধ ছড়িয়ে দিয়েছি। নতুন নতুন সমস্যাও তৈরী করেছি। আমাদের মাদক বিরোধী যুদ্ধে হাজার হাজার মানুষ খুন হয়েছেন, এদের অনেকেই আমাদের মেধাবী রাজনীতিক, বিচারক, পুলিশ অফিসার এবং সাংবাদিক। একই সময়ে, মাদক চক্র তাদের অর্জিত বিপুল ব্যর্থ ব্যয় করেছে সরকারের নির্বাহী, বিচার ও আইন বিভাগকে আরো দুর্নীতিগ্রস্ত করতে।

সকল কঠোর পদক্ষেপ কলম্বিয়া কিংবা ইউরোপ আমেরিকায় মাদকের চাহিদা ও চালান কমাতে এই খুব কমই সমর্ত হয়েছে। মূলত: এখনো বোগোটার (কলম্বিয়ার রাজধানী) তুলনায় নিউইয়র্ক থেকে ম্যানিলা পর্যন্ত কোকেন কিংবা হিরোইনের মতো মাদক দ্রব্য যেকোন সময়ের মতোই সহজ লভ্য ও প্রবেশযোগ্য।

মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ মূলত জনগণের উপরে যুদ্ধ। কিন্তু অভ্যাস যায় না মরলে। এখনো বহু দেশ এখনো মাদকের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ নেশায় আসক্ত। কলম্বিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট হুয়ান ম্যানুয়াল সান্তোস বলেছেন: “আমরা এখনো গত ৪০ বছরের পুরনো চিন্তাকাঠামোর মধ্যেই ভাবছি।” সৌভাগ্যক্রমে বিভিন্ন দেশের সরকারগুলো নতুন কৌশলের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করছে। যার মাধ্যমে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার ও জন স্বাস্থ্য নিশ্চিত করে মাদক বানিজ্যের ফায়দা কেড়ে নেওয়া সম্ভব।

আমরা যদি মাদককে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে  চাই, তাহলে আমাদের আন্তরিক সংলাপ প্রয়োজন। গ্লোবাল কমিশন অন ড্রাগ পলিসি- যার আমি একজন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য – ২০১১ সাল থেকেই মাদকের ওপর উন্মুক্ত, প্রমাণ-ভিত্তিক আলোচনা-সমালোচনা সমর্থন করে। আমরা মাদকের সরবরাহ এবং চাহিদা হ্রাসকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করি, কিন্তু এই লক্ষ্য কিভাবে বাস্তবায়িত সে বিষয়ে কট্টরপন্থীদের সাথে স্পষ্টত: দ্বিমত পোষণ করি।  আমরা মাদকের প্রতি নমনীয় নই, বরঞ্চ এই মনোভাব হতে বহু দূরে।

বি: দ্র:
সিজার গ্যাভিরিও‘র এই মতামত কলামটি প্রকাশিত হয়েছিলো নিউইর্য়ক পত্রিকায়, গত বছর অর্থাৎ ২০১৭ সালের ২ফেব্রুয়ারি। সিজার গ্যাভিরিও ১৯৯০-১৯৯৪ মেয়াদে কলামবিয়ার রাষ্ট্রপতি ছিলেন। উল্লেখ্য, সে সময়ে কলামবিয়া ছিলো পৃথিবীর অন্যতম প্রধান কোকেন উৎপাদনকারী ও পাচারকারী দেশ।  রাষ্ট্রপতি গ্যাভিরিও ক্ষমতায় এসে মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেন। তার সবথেকে বড় সাফল্য হলো কুখ্যাত মাদক কারবারি কিং অফ কোকেন পাবলো এসকোবার’র চক্র (কার্টল)কে নির্মূল করে দেয়া।  ফিলিপিনের বর্তমান রাষ্ট্রপতি দুর্তাতে মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পরে সিজার গ্যাভিরিও নিজের মতামত ব্যক্ত করেছেন এই কলামে।  লিখাটি ইংরেজী হতে বাংলায় ভাষান্তর করেছেন নতুন কাগজ প্রতিবেদক রবিন মুস্তাফি