মধ্যপ্রাচ্য থেকে নির্যাতিত আর অসুস্থ হয়ে ফিরছেন নারীরা

46

নিজস্ব প্রতিবেদক: সৌদি আরব, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের নারীশ্রমিকরা সংসারের অভাব অনটন দূর করতে পাড়ি জমান। কিন্তু সেখানে গিয়ে ভাগ্যের চাকা ঘোরা তো দূরের কধা, উল্টো অমানবিক নির্যাতন অত্যাচারের বোঝা নিয়ে তারা দেশে ফিরছেন অসুস্থতা নিয়ে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে ফিরে আসা নারী শ্রমিকদের সাথে কথা বলে এমন ভয়াবহ চিত্র জানা গেছে।

বিদেশ থেকে ফেরত আসা এই নারীরা বর্তমানে নানা রকম উচ্চ হারে ধার আর ঋণের বোজা, সাংসারিক অভাবসহ নানা সমস্যার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। বিদেশে নারী কর্মীরা শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতিত হলেও নির্যাতনকারী নিয়োগকর্তার বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাস আইনি ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। যে কারণে সমস্যায় জর্জরিত নারীদের মধ্যে অনেকে টিকতে না পেরে দেশে ফিরতে বাধ্য হয়েছেন। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোতে লিখিত অভিযোগ দিচ্ছেন অনেকে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসব অভিযোগে তদন্ত শেষ না হতেই রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকের পক্ষ থেকে নারীদের নিজ খরচে দেশে ফেরত নিয়ে আসা হচ্ছে।

গত ২৮ জানুয়ারি ঢাকার সিরডাপ মিলনায়তনে পাঁচ দিনব্যাপী ২৮ দেশের শ্রম কাউন্সিলরদের সম্মেলনে বিদেশে নারী অভিবাসন নিয়ে বিভিন্ন ধরনের জটিলতার বিষয়টি আলোচনায় উঠে আসে। সমস্যা থেকে পরিত্রাণের উপায় ও করণীয় নিয়েও সেখানে আলোচনা হয়। সর্বশেষ ডেমরার বাহির টেংরার বাসিন্দা রোজিনা আক্তার ঢাকার নয়া পল্টন ‘মুক্তি ওভারসিস’ নামের একটি রিক্রুটিং এজেন্সি থেকে বাহরাইন যাওয়ার পর তিন মাস না যেতেই তিনি দেশে ফিরতে বাধ্য হন।

রোজিনা কান্না জড়িত কন্ঠ বলেন, দেশে সংসারে অভাব অনটন। স্বামী পিটাতো, বিদেশে যা যা হয় সব বলতে পারবোনা, মুখেও আনতে পারবোনা। তবে শরীরে খুব আঘাত করতো। তিনি আরও বলেন, বাহরাইনে ইলেকট্রিক মেশিনে ঘর মুছতে না পারায় গৃহকর্তা ও তার স্ত্রী তাকে প্রথম শরীরে আঘাত করে। তারপর বাকি তিনমাসে তাকে কারেন্ট শকসহ নানা নির্যাতন করেছেন। একপর্যায়ে তার শরীরের এক পাশ অবশ হয়ে গেলে বাড়ির মালিক ওভারসিস কম্পানিকে কল করে দেশে পাঠিয়ে দেয়। এখন সে কিছুটা সুস্থ, বাসার কাছেই রাস্তার মোড়ে পিঠা বিক্রির কাজে আরেকজনের দোকানে কাজ করে। এরকম নির্যাতনের স্বীকার আফিয়া বেগম জানান, তিনি ভাগ্যের চাকা ঘুরাতে সেখানে যান। কিন্তু বাড়ীর মালিক সৌদি আরবের এজেন্ট অফিসে এনে হাত-পা বেঁধে আমার পায়ের তালুতে রড দিয়ে ৪১ বার পিটিয়েছে। আমি অসুস্থ হয়ে পড়লেও তারা আমার চিকিৎসার ব্যবস্থা করেনি। পরে সেখান থেকে ফের আমাকে অন্য বাড়িতে পাঠায়। আফিয়া বলেন, শুধু আমি না, আমার মতো হাজার হাজার নারীশ্রমিক সৌদি আরবে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। আমি অনেক নির্যাতনের চিত্র ভিডিও করে নিয়ে এসেছি। তিনি তাদেরকে দ্রুত সেখান থেকে উদ্ধারের আকুতি জানিয়ে বলেন, তিনি যে দিন দেশে ফিরেছেন, সেই ফ্লাইটে আরো শতাধিক নারী দেশে ফিরে এসেছেন।

দেশে ফিরে একই কথা জানিয়েছেন বরিশালের আমেনা বেগম। তিনি বলেন, বিদেশে যেতে আমার কোনো টাকা লাগেনি। পাসপোর্টটাও দালাল করে দিয়েছে। কিন্তু বিদেশে যাওয়ার পর গৃহকর্তার বাড়িতে যেভাবে নির্যাতিত হয়েছি, তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। তিনি নিয়োগকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করার পাশাপাশি দূতাবাসের আশ্রয় শিবিরের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বিরুদ্ধেও গাফিলতির অভিযোগ তোলেন। তার দাবি, কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী দূতাবাসের শেল্টারহোমকে তাদের ব্যবসা কেন্দ্রে পরিণত করেছেন। বিষয়টি সরকারের দ্রুত তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া উচিত। শুধু আফিয়া ও আমেনা নন, এখনো বিভিন্ন দেশে নারীশ্রমিকেরা সমস্যার মধ্যে আছেন।

কর্মসংস্থান ব্যুরোর উপপরিচালক বুলবুলের দফতরে জমা পড়া অভিযোগের তদন্ত শুরু হতে না হতেই রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক আফিয়া বেগমকে দেশে ফেরত আনার ব্যবস্থা করেন। আফিয়া বেগম গত মঙ্গলবার এক অনুষ্ঠানে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসির উপস্থিতিতে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দালালের খপ্পরে পড়ে আমি আমার ১৮ মাসের শিশুকে বাড়িতে রেখেই সৌদি আরবে যাই। কিন্তু আমাকে যে বাড়িতে কাজ দেয়া হয়েছিল ওই বাড়ির মালিকের ছেলের কুনজরে পড়ে যাই আমি। সেখানে তাই টিকতে পারিনি। এরপর তিন মাসের মধ্যে আমাকে এজেন্ট মোট ৫টি বাড়িতে কাজ দেয়। প্রতিটি বাড়িতেই কাজ করতে গেলে একই সমস্যা হয়। তিনি মন্ত্রীর সামনে বলেন, আমি খারাপ কাজ করতে রাজি না হওয়ায় আমার ওপর বেশি নির্যাতন হয়েছে। তবে কী পরিমাণ নারী নির্যাতিত হয়ে দেশে ফিরেছেন, সেই পরিসংখ্যান মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট দফতরে পাওয়া যায়নি।

বিদেশে নারী কর্মী পাঠানো প্রসঙ্গে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি সাংবাদিকদের বলেন, আমাদের যেসব নারী কর্মী বিদেশে যাচ্ছে, তাদের মিনিমাম এক মাস ট্রেনিং দেয়ার রেওয়াজ আছে।

এএম