ভালোবাসা দিবসের আড়ালে স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস

0
13

নিজস্ব প্রতিবেদক: স্বৈরাচার প্রতিরোধের দেয়াল লিখন‘ ১৪ ফেব্রুয়ারি আমরা শুধু জয়নালের লাশ পাই। দিপালী সাহার লাশ গুম করে ফেলে। তার লাশ আমরা পাইনি। ১৫ ফেব্রুয়ারি কাঞ্চন চট্টগ্রাম শহরে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। আরো অনেকে নিখোঁজ হন। তাদের জীবিত বা মৃত কোনও অবস্থায়ই পাওয়া যায়নি।
ভালোবাসা দিবসে এ রকম একটা হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল,তা এ প্রজন্মকে স্মরণ করাতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। এ দায় স্বীকার করে নিতে আমার আপত্তি নেই। ইতিহাসে অনেক ঘটনা আছে, পরবর্তী প্রজন্ম ভুলে গেলেও তারও পরবর্তী প্রজন্ম আবার খুঁজে বের করে। ইতিহাস হারায় না, তাকে হারিয়ে ফেলার পরিবেশ পরিস্থিতি তৈরি করা হয়- কথাগুলো বলছিলেন এরশাদবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালনকারী ছাত্রনেতা ডা. মুশতাক হোসেন।

১৪ই ফেব্রুয়ারি ভ্যালেন্টাইনস ডে হিসাবে সারা বিশ্বে পরিচিত হলেও, বাংলাদেশের ইতিহাসে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি। অনেকে এই দিনটিকে পালন করেন ‘স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস’ হিসাবে। এই দিনেই সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে শুরু হয় ছাত্র আন্দোলন, কালক্রমে যেটি গণআন্দোলনে রূপ নিয়েছিল। তখন জেনারেল এরশাদের সামরিক সরকারের বিতর্কিত শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীরা প্রতিরোধ গড়ে তোলে।

তখনকার শিক্ষামন্ত্রী ড. মজিদ খান ১৯৮২ কালের ২৩ সেপ্টেম্বর একটি নতুন শিক্ষানীতির প্রস্তাব করেন। সেখানে প্রথম শ্রেণী থেকেই আরবি ও দ্বিতীয় শ্রেণী থেকে ইংরেজি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়। উচ্চশিক্ষা অর্জনের জন্য মাপকাঠি করা হয় মেধা অথবা পঞ্চাশ শতাংশ ব্যয়ভার বহনের ক্ষমতা।

এই নীতি ঘোষণার পর থেকেই আন্দোলন শুরু করে শিক্ষার্থীরা। সে বছর ১৭ সেপ্টেম্বর ওই শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে আন্দোলনের বিষয়ে একমত হয় ছাত্র সংগঠনগুলো। এরই ধারাবাহিকতায় ১৪ই ফেব্রুয়ারিতে স্মারকলিপি দিতে শিক্ষার্থীরা মিছিল করে সচিবালয়ের দিকে যাবার সময় পুলিশ গুলি চালায়। এতে জয়নাল ও দীপালি সাহা সহ নিহত হন অন্তত ১০জন।

 

সেদিনের সেই মিছিলে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সে সময়ের সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের কর্মী তসলিমা রানা নীলা। বর্তমানে লন্ডনের বাসিন্দা নীলা বলছিলেন, ৩৫ বছর আগের ঘটনা হলেও সেই দিনটি এখনো তার পরিষ্কার মনে আছে।

তিনি বলেন, তখন ১৪ই ফেব্রুয়ারি ভালোবাসা দিবস হিসাবে এখনকার মতো পালন করা হতো না। ১৯৮৩ সালের সেই দিনটি ছিল এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে একটি চরম মুহূর্ত।

ছাত্রসমাজের দাবি ছিল একটি অবৈতনিক বৈষম্যহীন শিক্ষানীতি। কিন্তু শিক্ষামন্ত্রী ড. মজিদ খান যে নীতি ঘোষণা করেন, সেখানে বাণিজ্যিকীকরণ আর ধর্মীয় প্রতিফলন ঘটেছে বলে শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন। তাই শুরু থেকেই ওই নীতির বিরোধিতা করতে শুরু করেন শিক্ষার্থীরা।

তসলিমা রানা নীলা বলছেন, সেদিন সকাল ১০টায় বটতলায় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ছাত্রদের জমায়েত হবার কথা। সেখান থেকে শিক্ষানীতি প্রত্যাহারের দাবিতে স্মারকলিপি নিয়ে শিক্ষা ভবনে যাওয়া হবে। ‘সকাল ১০টায় বটতলা থেকে মিছিল নিয়ে আমরা শিক্ষাভবনের দিকে যাচ্ছি। যখন আমরা কার্জন হল আর শিশু একাডেমীর মাঝখানের রাস্তাটায় এলাম, তখন আমরা প্রথম আওয়াজ শব্দ শুনি। ছাত্ররা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়, সেখানে বেশ কিছু ঘটনা ঘটে। তখন রীতিমত গোলাগুলি হচ্ছে।’

তিনি বলছেন, তখন শহরের অবস্থা ছিল খুবই থমথমে। আমরা বটতলায় জমায়েত হওয়ার পর জয়নালের মৃতদেহ ট্রাকে করে সেখানে আনা হলো। তৎকালীন ডাকসুর ভিপি আখতারুজ্জামান বক্তৃতা দিচ্ছেন, এমন সময় আমরা হঠাৎ শুনতে পেলাম নতুন আনা রায়ট কারের শব্দ। সেটি রঙ্গিন পানি ছিটাচ্ছে, যাতে ছাত্রদের পরবর্তীতে সহজেই চিহ্নিত করা যায় আর গ্রেপ্তার করতে তাদের সুবিধা হয়।

তিনি বলেন, আবার ছাত্ররা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। কলাভবনের পেছন দিক দিয়ে আরো অনেকের মতো আমিও দৌড়ে যাচ্ছিলাম, এমন সময় পেছনের ধাক্কায় আমি পড়ে যাই। আমার উপর দিয়ে অনেক ছাত্ররা চলে যায়, আমিও অনেক ব্যথা পাই। একটা সময় অর্ধ চেতন অবস্থায় আমি নিজেকে আবিষ্কার করি, আমাকে ধরে ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

সাবেক ছাত্রনেতা ও ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক মোশতাক হোসেন বলেন, আমরা দেখেছি অনেক মৃতদেহ পুলিশ ট্রাকে করে নিয়ে যাচ্ছে। শুধু জয়নাল নামের একজন ছাত্রকে আমরা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যেতে পারি। কিন্তু চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পরে সেই মৃতদেহ বটতলায় নিয়ে এসে আমরা বিক্ষোভ করি।

তিনি বলেন, সেদিন পুলিশের গুলিতে অন্তত ৫০জন নিহত হয়েছিল বলে আমরা ধারণা করি। কিন্তু দুজনের মৃতদেহ পাওয়া যায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বাকি মৃতদেহগুলো গুম করে ফেলে। তাদের স্বজনরা অনেক খোঁজাখুঁজি করে স্বজনদের কোন খোঁজ আর পাননি।

তবে হতাহতের এই সংখ্যার বিষয়ে তখন সরকারিভাবে কোন বক্তব্য দেয়া হয়নি। সেদিন থেকে এই দিনটিকে স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস হিসাবে বলা হয়, বলেন মুশতাক।

বিকালে এবং পরের দিনও শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান চলে বলে তিনি জানান। পুলিশ অনেক ছাত্র-ছাত্রীকে গ্রেপ্তার করে নির্যাতন করা হয়। মোশতাক হোসেনকেও গ্রেপ্তার করা হয়। জয়নাল ছাড়া পরে মোজাম্মেল আইয়ুব নামের আরেকজনের মৃতদেহ পাওয়া যায়। জাফর, কাঞ্চন, দীপালি সাহা নামের একটি ছোট বাচ্চাসহ অনেকে নিখোঁজ হয়ে যায়, যাদের পরে আর কোন খোঁজ মেলেনি। এর কিছুদিন পরে সরকার একটি ঘোষণা দিয়ে শিক্ষানীতিটি স্থগিত করে।

মুশতাকসহ ছাত্রসংগঠনের নেতারা মনে করেন, স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবসকে নিয়ে যে ডক্যুমেন্টেশন হওয়া দরকার ছিল, এই দায়িত্ব সে সময়ের নেতারা, বিশ্ববিদ্যালয় এমনকি স্বৈরাচার আন্দোলন থেকে ক্ষমতায় আসা দলগুলোও নেয়নি। আর এরই ধারাবাহিকতায় একধরনের অসাড়তার মধ্য দিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে প্রজন্মকে এবং এখন ভালবাসা দিবস স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবসের গুরুত্বকে ছাপিয়ে যেতে পেরেছে।

১৯৮২ সালের ২৪ শে মার্চ লে. জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এক সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা দখলের পরপরই তাকে ছাত্রদের প্রতিরোধের মুখে পড়তে হয়েছে। একইসাথে শুরু হয় ধরপাকড়। সে সময় সামরিক সরকারের শিক্ষামন্ত্রী মজিদ খান ক্ষমতায় এসেই নতুন শিক্ষানীতি প্রণয়ন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন খর্ব ও রেজাল্ট খারাপ হলেও যারা ৫০% শিক্ষার ব্যয়ভার দিতে সমর্থ, তাদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয় এতে। এই নীতিতে দরিদ্ররা উচ্চশিক্ষা থেকে বঞ্চিত হতে পারে বলে ছাত্ররা এর প্রবল বিরোধিতা করে। ১৯৮২ সালের ১৭ ই সেপ্টেম্বর শিক্ষা দিবসে এই শিক্ষানীতি বাতিলের দাবিতে ছাত্র সংগঠনগুলো ঐকমত্যে পৌঁছে।

এরই ধারাবহিকতায় ১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারির জন্ম। এদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ মজিদ খানের কুখ্যাত শিক্ষানীতি প্রত্যাহার, বন্দি মুক্তি ও গণতান্ত্রিক অধিকারের দাবি ও গণমুখী, বৈজ্ঞানিক ও অসাম্প্রদায়িক শিক্ষানীতির দাবিতে ছাত্র জমায়েত ডাকে।

ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডের অংশ হিসেবে ১৯৮৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি এরশাদ তার সন্ত্রাসিবাহিনী দিয়ে খুব কাছ থেকে গুলি করিয়ে হত্যা করায় রাউফুন বসুনিয়াকে। জাতীয় ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক বসুনিয়া হত্যাকাণ্ডের শিকার হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের ভেতরে। এরপর ঘটেছে একের পর এক হত্যাকাণ্ড ও গুমের ঘটনা। ১৯৮৭ সালের ১০নভেম্বর নূর হোসেনকে হত্যা করে এরশাদের পুলিশ বাহিনী।আর ১৯৯০ সালের ২৭ নভেম্বর এরশাদের সন্ত্রাসীবাহিনী গুলি করে হত্যা করে ডা. মিলনকে। অবশেষে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর পতন হয় দখলবাজ স্বৈরাচার এরশাদের।

আজকে এরশাদের পতনের পরে যখন গণমাধ্যমের সংখ্যা বাড়লো, কিন্তু দেশের রাজনৈতিক প্রতিরোধ ইতিহাসের ওপর করপোরেট ঔদাসীন্য একুশে ফেব্রুয়ারির পরে ছাত্র-শিক্ষকের এহেন তাৎপর্যময় বিশাল আন্দোলনকে বিস্মৃতির অতলে ঢেকে দিলো।

কিভাবে ভালবাসা দিবস দিয়ে এই প্রতিরোধ দিবস ঢেকে দেওয়া গেল জানতে চাইলে ১৯৮৯ এর ডাকসু নেতা আব্দুল্লাহ আল ক্বাফী বলেন, ভালবাসা দিবসের মতো একটি দিবস দিয়ে ঢেকে দেয়া গেছে সেই দায়সরকারের, সে দায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের, সে দায় সেই সংগ্রামের সাথে যারা যুক্ত ছিলেন প্রত্যক্ষভাবে তাদের সবার। ৩০ বছর পার হয়ে গেছে। সে সময় যে শিশু জন্ম নিয়েছে সেও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়েছে। এ সময়টাতে তার সামনে বেশি প্রভাব নিয়ে হাজির হয়েছে যা কিছু, সেটাকেই তো সে পালন করবে।

 

 

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করে আপনার মন্তব্য লিখুন
অনুগ্রহ করে এখানে আপনার নাম লিখুন