Natun Kagoj

ঢাকা, শুক্রবার, ২২শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ইং | ৭ই আশ্বিন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ | ১লা মুহাররম, ১৪৩৯ হিজরী

ভর্তিযুদ্ধ ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা

আপডেট: ২৭ জুলা ২০১৭ | ১৭:৩১

রামিম ইসলাম নূর:  গত ২৩ জুলাই এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়েছে। সারা দেশে পাসের হার ৬৮ দশমিক ৯১ শতাংশ। সংখ্যায় প্রকাশ করলে মোট পাস করেছে ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৯৪২ জন শিক্ষার্থী। আর জিপিএ ৫ পেয়েছে ৩৩ হাজার ২৪২ জন।

আমার আলোচনার বিষয়বস্তু পাশের হার বা জিপিএ ৫ নয়। তবে এটাই স্বাভাবিক যে, যারা পাস করেছে অর্থাৎ উত্তীর্ণ ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৯৪২ জন শিক্ষার্থী এখন উচ্চ শিক্ষার সুযোগ পেতে ভর্তি পরীক্ষায় অবতীর্ণ হবে। আর এটা কারোরই অজানা নয় যে, উচ্চ শিক্ষার জন্য শিক্ষার্থীর তুলনায় ভাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আসন সংখ্যা এতটাই কম যে, ভর্তি পরীক্ষাকে পরীক্ষা না বলে বরং ভর্তি যুদ্ধ বলেই অভিহিত করা হয়। আমি আজ উচ্চ শিক্ষার সুযোগের অপ্রতুলতার বিষয়টিও আলোচনা করতে যাচ্ছি না। বরং আলোকপাত করতে চাই ভর্তি প্রক্রিয়ার উপর।

উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে সামাজিক প্রেক্ষাপটসহ নানা কারণে এখনো বাংলাদেশে অভিভাবক বা শিক্ষার্থীদের পছন্দের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে মেডিকেল কলেজ এবং বুয়েট। যদিও আগের তুলনায় এগুলোতে আসন সংখ্যা বেড়েছে তব্ওু সরকারী মেডিকেল কলেজ ও বুয়েট মিলে আসন সংখ্যা মোট শিক্ষার্থীর এক শতাংশের বেশি হবেনা। এরপরে শিক্ষার্থীরা বেছে নেয় অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে। এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আবার দেশব্যাপী বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে আছে।

বর্তমানে শুধুমাত্র মেডিকেল কলেজগুলোতে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে ছাত্রছাত্রী ভর্তি করা হয়। মেডিকেল কলেজ ছাড়া অন্য যেকোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার জন্য শিক্ষার্থীদের পৃথক পৃথক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হয়। এতে শিক্ষার্থী এবং তাদের অভিভাবকদের যে কী পরিমান শারীরিক, মানসিক এবং আর্থিক ক্ষতি সাধিত হয় তা কল্পনার অতীত। তবুও বিষয়টি কারও অজানা নয়। আর সেকারণেই দেশের বহু শিক্ষাবিদ ও গুনীজনেরা সমন্বিত পরীক্ষা পদ্ধতির কথা বলে আসছেন দীর্ঘদিন থেকে। কিন্তু বারবার আলোচিত হলেও সমন্বিত পরীক্ষা প্রক্রিয়া চালু করার কোন পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়। তাই সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার বিষয়টি নিয়ে আজ কথা বলতে বাধ্য হচ্ছি।

সমন্বিত পরীক্ষা পদ্ধতি দাবী করার আগে কেন এই পদ্ধতিতে পরীক্ষা নেয়া জরুরি আর বর্তমান পদ্ধতিতে কী ধরণের সমস্যা হচ্ছে সেদিকে একটু আলোকপাত করা যাক। আমার পরিচিত একজন শিক্ষার্থীর উদাহরণ দেই যে কিনা গত বছর ভর্তি পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়েছিল। মেডিকেল কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (ময়মনসিংহ), খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (রংপুর), হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় সহ আরও কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির জন্য সে আবেদন করে। এই ভর্তি পরীক্ষাগুলোতে আবেদন করার পর সে এবং তার মতো অনেকেই কী কী অসুবিধার সম্মুখীন হয় তার একটা তালিকা করা যাক।

১. ভর্তির জন্য আবেদনকৃত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রায় সবগুলোতেই একাধিক ইউনিট বা ফ্যাকাল্টি রয়েছে। তাই এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এতগুলো ইউনিটে পৃথক পৃথকভাবে আবেদন করতে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা ফি বাবদ প্রায় চল্লিশ-পঞ্চাশ হাজার টাকা খরচ করতে হয়। এই ফি কিন্তু সম্পূর্ণ অফেরৎযোগ্য।

২. অনেক বিশ্ববিদ্যালয় আবার আবেদন করার পরে তাদের ভর্তি পরীক্ষার তারিখ জানায়। একেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েকটি করে ইউনিট থাকায় পরীক্ষা চলে কয়েকদিন ব্যাপী। তখন দেখা যায়, একইদিনে ঐ শিক্ষার্থীর একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষার তারিখ ধার্য হয়েছে। একই দিনে পরীক্ষার তারিখ না পড়লেও এক বা দু’দিন পরে হয়তো অন্যত্র পরীক্ষার তারিখ নির্দ্ধারিত হয়। এখন এক জেলা থেকে আরেক জেলায় গিয়ে এত স্বল্প সময়ে পরীক্ষায় অংশ নেয়া কখনোই বাস্তবসম্মত নয়। আর যদি পরীক্ষা দিতেও যায় তখন পরীক্ষার্থী পরীক্ষার প্রস্তুতি নিবে কখন? তার তো এক জেলা থেকে আরেক জেলায় যেতে এবং থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করতেই সময় শেষ হয়ে যায়। তাছাড়াও তারিখ ওভারল্যাপ হবার কারণে টাকা খরচ করে আবেদন করার পরেও অনেক শিক্ষার্থী বেশ কিছু পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনা।

৩. নিজ জেলার বাইরে বেশ কয়েকটি স্থানে পরীক্ষা দিতে গিয়ে শিক্ষার্থীর এবং তার অভিভাবকের যাতায়াত খরচ, থাকা-খাওয়া ইত্যাদি মিলে লক্ষাধিক টাকা খরচ হয়ে যায়। এছাড়া এত সংখ্যক মানুষের যথাযথ আবাসন ও আপ্যায়নের ব্যবস্থাও থাকেনা অনেক অঞ্চলে। আবার দীর্ঘ দুই-তিন মাস ধরে চলা এসব পরীক্ষাকালীন সময়ে অভিভাবকরাও তাদের নিজ নিজ কর্মক্ষেত্র থেকে বারবার কীভাবে ছুটি পেতে পারেন! সেক্ষেত্রে পরীক্ষার জন্য দূর-দূরান্তে সন্তানদের একা ছাড়বেনই বা কীভাবে অভিভাবকরা!

৪. সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষা একই সাথে সম্পন্ন না হবার ফলে দেখা দেয় আরেক সমস্যা। যেমন আমার পরিচিত ঐ শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েছিল। কিন্তু পারিবারিক সমস্যার কারণে সে হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুরে পড়তে আগ্রহী হয়। এদিকে অনিবার্য কারণে হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য তাদের ভর্তি পরীক্ষা স্থগিত করে। তখন বাধ্য হয়ে সেই শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। এসময়ে তার ভর্তি বাবদ তেরো হাজার টাকার মতো খরচ হয়। যাতায়াত ও আনুষঙ্গিক খরচ তো থাকলোই। পরবর্তীতে পছন্দক্রম অনুযায়ী বিষয় পরিবর্তন ঘটলে অন্য বিভাগে তাকে আবারো ভর্তি ফি দিতে হয়। এদিকে মাস তিনেক পরে হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হলে উত্তীর্ণ হয়ে সেই শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি বাতিল করে হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। এখানে আবারো তাকে ভর্তি ফি প্রদান করতে হয়। এতে শিক্ষার্থী ও তার অভিভাবক আর্থিক, শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত সম্মুখীন হয়। আবার অন্যভাবে ভাবলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঐ শিক্ষার্থীর ছেড়ে আসা সিটটাও নষ্ট হলো। সেখানে হয়তো আরেকজন শিক্ষার্থী পড়াশুনার সুযোগ পেতো।

প্রচলিত পরীক্ষা পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করতে থাকলে এমন হাজারটা সমস্যা বেরিয়ে আসবে যা সম্বন্ধে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষরা ভালভাবেই অবগত আছেন বলেই আমার বিশ্বাস। কিন্তু তবুও কেন তারা এতদিনেও সমন্বিত পরীক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তন করছেন না তা বোধগম্য নয়।

“এক দেশ- এক ভর্তি পরীক্ষা” এই প্রক্রিয়ার চর্চা হলে আলোচিত সকল সমস্যার সমাধান নিমেষেই হয়ে যায়। সমন্বিত পরীক্ষা পদ্ধতি নিয়ে গবেষণারও কিছু নেই। কারণ এটি কিন্তু একটি পরীক্ষিত পদ্ধতি। আমাদের দেশের মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষাই তার উদাহরণ। কারণ, মেডিকেল ভর্তির ক্ষেত্রে একটি ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে সরকারি-বেসরকারি মিলে প্রায় শতাধিক মেডিকেল কলেজে শিক্ষার্থীদের ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। ঠিক সেই পদ্ধতিতে যদি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেও সম্পৃক্ত করে নেয়া হয় তাহলে দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রী ভর্তি করতে ঐ একটি পরীক্ষাই যথেষ্ট। যার সুবিধা ভোগ করবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ছাত্রছাত্রী, অভিভাবক সকলেই। অভিভাবকদের কষ্ট লাঘব হবে। অপচয়ের হাত থেকে রক্ষা পাবে তাদের কষ্টার্জিত লক্ষাধিক টাকা যা অযথাই খরচ হয়ে যাচ্ছে। তাছাড়া সকল অভিভাবকের পক্ষে এত বেশি টাকার যোগান দেয়াও সম্ভব নয়। এই টাকার যোগান দিতে গিয়ে অনেক অভিভাবকই ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন। আবার ছাত্রছাত্রীদের কথা ভাবুন।

দেশব্যাপী যদি তাদের এভাবে মানবেতর অবস্থায় ঘুরে ঘুরে এতগুলো পরীক্ষা দিতে না হয় তাহলে তারা একটি পরীক্ষার জন্য যথাযথ প্রস্তুতি নিতে পারবে এবং তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষা পাবে। তাছাড়া সমন্বিত পরীক্ষা পদ্ধতি তো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও ভাল। সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যখন একই সাথে একটি পরীক্ষা নেয়ায় পুরোপুরি মনোনিবেশ করবে এবং সম্পৃক্ত হবে তখন সেই পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন না হবার কি কোন কারণ থাকতে পারে! প্রতিটি জেলায় একই দিনে একই সময়ে সম্পন্ন হবে একটি ভর্তি পরীক্ষা। সরকারের পক্ষ থেকে প্রশাসন সর্বাত্মকভাবে সাথে থাকবে। জনপ্রতিনিধি, সমাজের সুশীল শ্রেণী থেকে শুরু করে সকলেই পাশে থাকবে এই পরীক্ষাটিকে সফল করতে।

আমার তো মনে হয় এমন একটি সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা আয়োজনে কোন প্রতিবন্ধকতাই থাকতে পারেনা। শুধু একটু সদিচ্ছা আর একটি যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত এটুকুই যথেষ্ট। আর এমন একটি পরীক্ষা পরিচালনায় যতটুকু ডিজিটালাইজেশন বা প্রযুক্তি ব্যবহার প্রয়োজন তারচেয়ে আমরা কিন্তু অনেক এগিয়ে আছি। তাই, এক বুক আশা নিয়ে  নীতি নির্দ্ধারকদের দিকে তাকিয়ে আছি। সকলের কষ্ট লাঘবে এবং দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়নে তারা নিশ্চয়ই অচিরেই সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতি চালু করবেন।

লেখক: চিকিৎসক ও কথা সাহিত্যিক।


নতুন কাগজ | সাজেদা হক

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Loading Facebook Comments ...
 বিজ্ঞাপন