Natun Kagoj

ঢাকা, সোমবার, ২৫শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ইং | ১০ই আশ্বিন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ | ৪ঠা মুহাররম, ১৪৩৯ হিজরী

বিদায় নায়ক রাজ রাজ্জাক

আপডেট: ২২ আগ ২০১৭ | ১৩:৫৩

ওমর ফারুক : নায়ক রাজ্জাক ছিলেন একজন জনপ্রিয় বাংলাদেশী চলচ্চিত্র অভিনেতা যিনি নায়ক রাজ রাজ্জাক নামে সুপরিচিত। ৭৫ বছরের জীবনে ৫৩ বছর তিনি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে শাসন করেছেন। রাজার মত। বাংলা চলচ্চিত্রের রাজা হিসাবেই মেনেছেন সবাই। দর্শক, নির্মাতা, কলাকুশলী সবাই।

বাংলা চলচ্চিত্রের মুকুটহীন সম্র্রাট। কিংবদন্তি এই অভিনেতা আমাদের নায়করাজ রাজ্জাক আর নেই। গতকাল সোমবার ইউনাইটেড হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন এই অভিনেতা (ইন্না নিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহি রাজেউন)।

নায়ক রাজ রাজ্জাকের মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। এছাড়াও শোক প্রকাশ করে বাণী দিয়েছেন পরিবেশ ও বনমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফ, ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী প্রমুখ। তাঁর মৃত্যুতে দেশে শোকের ছায়া নেমে আসে। মৃত্যুর খবর শুনে হাসপাতালে প্রথম আসেন নায়ক আলমগীর। এসময় নায়ক রাজের পরিবারের সদস্যরা হাসপাতালে উপস্থিত ছিলেন। এরপর একে একে এসে উপস্থিত হন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, নায়ক শাকিব খান, ফেরদৌস, ওমর সানী, চিত্রনায়িকা মৌসুমী, জায়েদ খান, শিবলী সাদিক, গুলজার। এই তো কয়েক মাস আগেই সুস্থ হয়ে এই হাসপাতাল থেকেই বাড়ি ফিরেছিলেন নায়ক রাজ। আরো কাজ করে যাবেন বলে আশার কথা শুনিয়েছিলেন। কিন্তু তা আর হলো না। পরপারে পাড়ি জমালেন।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে ঈষর্ণীয় বর্ণাঢ্য জীবন কাটিয়েছেন তিনি। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতে আর কোন অভিনেতা অভিনয়ের এই দক্ষতা আর বিশাল জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারেননি। তিনি ছিলেন রূপালি পর্দার রাজা। তিনি বলতেন, আমার প্রেম, আমার ভালবাসা আমার সবকিছু অভিনয় আর চলচ্চিত্রকে ঘিরে। এছাড়া আমি আর কিছু জানি না, পারি না।

পশ্চিম পাকিস্তানের উর্দু সিনেমা আর ভারতের হিন্দি ও বাংলা সিনেমাকে হটিয়ে তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে বাংলা চলচ্চিত্রকে জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন রাজ্জাক। বাঙালিদর্শক এই নায়ক রাজের ভুবনভোলানো হাসি, রোমান্টিক ম্যানারিজমস, নিষ্পাপ দৃষ্টি আর অভিনয়ের নেশায় তিন প্রজন্ম পেরিয়ে এসেও আজো বুঁদ হয়ে আছে। এর পাশাপাশি অ্যাকশন হিরো হিসাবেও তিনি সমানভাবে সফল। নায়ক রাজ সব নায়িকার সঙ্গেই জুটি গড়েছেন। রাজ্জাক-ববিতা, রাজ্জাক-কবরী, রাজ্জাক-শাবানা — নায়িকা বদল ঘটলেও দর্শকদের কাছে রাজ্জাক ছিলেন প্রথম ও শেষ পছন্দ। রাজ্জাককে ঘিরে নায়িকাদের এসব জুটির রোমান্টিক দৃশ্যগুলো মানুষকে আজো আলোড়িত করে তোলে সমানভাবে। কমেডি সিনেমাতে দুর্দান্ত অভিনয় করেও তিনি তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন দর্শকদের।

ঢাকায় এফডিসি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৫৭ সালে। নায়ক রাজ অভিনয় শুরু করেন ১৯৬৪ সাল থেকে। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ঊন্মেষ যৌবন যেন তার হাত ধরেই পথ চলেছে। বাংলাদেশের তরুণদের আইডল, তরুণীদের স্বপ্নের নায়ক, আদরের ভাই, স্নেহধন্য ছেলে প্রতিটি চরিত্র যেন রূপালী পর্দার নায়ক রাজকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে।

রাজ্জাকের জনপ্রিয়তায় যে কী বিশাল ব্যাপ্তি নিয়ে বিরাজ করতো তা এ প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের উপলব্ধি করা কষ্টের। চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে তিনি একজন মায়ের কাছে ছেলের মত, বোনের কাছে ভাইয়ের মত আর যুবতী নারীর কাছে আরাধ্য প্রেমিকের স্থান নিয়ে বিরাজ করেছেন প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে।

নায়ক রাজ্জাকের ছেলে সম্রাট বলেন, বিকেলে বাবা হঠাত্ অসুস্থ হয়ে পড়লে ৫টা ২০ মিনিটে তাকে ইউনাইটেড হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। এর কিছুক্ষণ পরেই বাবা মারা যান। তিনি তার বাবার জন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানান, হূদরোগে আক্রান্ত (কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট) হলে পরিবারের সদস্যরা তাকে হাসপাতালে নিয়ে আসেন। তিনি হাসপাতালের চিফ কার্ডিওলজিস্ট ডা. মমিনুজ্জামানের অধীনে চিকিত্সাধীন ছিলেন। তবে হাসপাতালে আনার পর তার স্পন্দন, রক্তচাপ কিছু পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে সন্ধ্যা ৬টা ১৩ মিনিটে তাকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিত্সকরা। হাসপাতালের প্রধান যোগাযোগ কর্মকর্তা শেগুফা আনোয়ার সংবাদমাধ্যমকে অভিনেতা রাজ্জাকের মৃত্যুর খবরটি নিশ্চিত করেন।

সংক্ষিপ্ত জীবনী :

তার পুরো নাম আব্দুর রাজ্জাক। ডাক নাম রাজু, রাজ্জাক, রাজা।  বাংলা চলচ্চিত্র পত্রিকা চিত্রালীর সম্পাদক আহমদ জামান চৌধুরী তাকে নায়করাজ উপাধি দিয়েছিলেন।
তিনি ১৯৪২ সালের ২৩ জানুয়ারি কলকাতার টালিগঞ্জের নাগতলায় জম্মগ্রহন করেন। তার পিতার নাম আকবর হোসেন এবং মাতার নাম নিসারুন নেসা। তিন ভাই তিন বোনের মধ্যে তিনি ছোট। তিনি ১৯৬২ সালে খায়রুন নেসাকে (লক্ষ্মী) বিয়ে করেন। ১৯৬৪ সালে তিনি প্রথম ঢাকায় আগমন করেন। তিন পুত্র (বাপ্পারাজ, বাপ্পি, সম্রাট) দুই কন্যা (শম্পা, ময়না) এবং স্ত্রী খায়রুন নেসাকে নিয়ে কমলাপুরে বসতি স্থাপন করেন।  এক জন পরিচালক হিসাবেও সফল।

নিজের জন্মস্থান কলকাতায় সপ্তম শ্রেণীতে অধ্যয়নরত অবস্থায় মঞ্চ নাটকে অভিনয়ের মাধ্যমে তার অভিনয় জীবন শুরু করেন এবং ১৯৬৬ সালে জহির রায়হানের বেহুলা চলচ্চিত্রে নায়ক হিসেবে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশী চলচ্চিত্রে তার অভিষেক ঘটে। অভিনয় জীবনে তিনি বেহুলা, আগুন নিয়ে খেলা, এতটুকু আশা, নীল আকাশের নীচে, জীবন থেকে নেয়া, ওরা ১১ জন, অবুঝ মন, রংবাজ, আলোর মিছিল, অশিক্ষিত, ছুটির ঘণ্টা এবং বড় ভালো লোক ছিলসহ মোট ৩০০টি বাংলা ও উর্দু ভাষার চলচ্চিত্রে অভিনয়ের পাশাপাশি ১৬টি চলচ্চিত্র পরিচালনা করেছেন। তার প্রযোজনা সংস্থার নাম রাজলক্ষী প্রোডাকশন। মেয়ের সঙ্গে একটি চলচ্চিত্র করেছিলেন রাজ্জাক। সেখানে দুজনে ভাইবোনের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন।  চলচ্চিত্রের বাইরে জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের শুভেচ্ছাদূত হিসেবে কাজ করেছেন নায়করাজ রাজ্জাক।

অভিনয়ের স্বৃীকৃতি :
২০১৫ সালে বাংলাদেশ সরকার সংস্কৃতিতে বিশেষ ভূমিকা রাখার জন্য তাকে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করে। ১৯৭৬, ১৯৭৮, ১৯৮২, ১৯৮৪ ও ১৯৮৮ সালে তিনি মোট পাঁচবার শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। ২০১৩ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে তাকে আজীবন সম্মাননা পুরস্কার প্রদান করা হয়। এছাড়াও তিনি চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য বাচসাস পুরস্কার, মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন।


নতুন কাগজ | সাজেদা হক

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Loading Facebook Comments ...
 বিজ্ঞাপন