Natun Kagoj

ঢাকা, বুধবার, ১৭ জানুয়ারি, ২০১৮ | ৪ মাঘ, ১৪২৪ | ২৯ রবিউস-সানি, ১৪৩৯

বাংলা নববর্ষ বিষয়ে বাঙ্গালের তিতা কথা

আপডেট: ১৩ এপ্রি ২০১৭ | ১৬:৫৯

আবু সাঈদ আহমেদ

১.
বাংলা নববর্ষকে যতই বাঙালীর সার্বজনীন উৎসবে পরিণত করার চেষ্টা করা হচ্ছে, নববর্ষ ততই বাঙালের কাছ হতে দূরে সরে যাচ্ছে। বাঙালের সবকিছু দখল হয়ে যায়, দেড় দশক ধরে ধীরে ধীরে দখল হচ্ছে বাংলা নববর্ষ আর সেটা তথাকথিত সার্বজনীনতার ব্যানারে। যে কোনো কিছুকে ঐতিহ্যের নামে ধর্ম করে তোলাতে বাঙালীর জুড়ি নাই, কিন্তু বাঙাল তাতে অভ্যস্ত নয়।

গত প্রায় এক শতাব্দী ধরে মগজে কিছু বিদ্যা, পকেটে কিছু অর্থ-সম্পদ আর পেটে দু’ফোটা রবীন্দ্রনাথ পড়লে বিদ্যা-অর্থ-সংস্কৃতির গরমে বা বদহজমে আপদমস্তক বাঙাল ক্রমেই নিপাট উগ্রবাদি বাঙালি হয়ে ওঠে।  তখন সে চাষা হতে নাগরিক হতে চায়, চাষাকে চাষা বলে হেলা করে, গ্রাম্যতা তার কাছে অমার্জনীয় অপরাধ। অথচ সাবেক বাঙাল ও সদ্য বাঙালির পিতৃপুরুষের শিকড় গ্রামেই প্রথিত। ফলে মধ্যবিত্ত শিক্ষিত বাঙালি একই সাথে আত্মপরিচয় সংকটে ভোগে এবং এই আত্নপরিচয় সংকট ভোগার রোগকে অস্বীকার করে। রোগের দাওয়াই হিসেবে শিকড়ে ফিরে যাবার ভান করে বটে, তবে তার লক্ষ্য শিকড়কে বদলে দেয়া। তথাকথিত শিক্ষিত ও সভ্য অর্থাৎ  গ্রাম্যতাহীন কাঠামোয় শিকড়কে রূপান্তর করা, তাকে সীমাবদ্ধ করা।

২.

বর্তমানে বাঙালি বড়ই ঐতিহ্যগ্রস্থ জাতি। বাঙালি জাতি গত দুই দশকের মত এত ঐতিহ্যগ্রস্থ আর কখনই ছিলো না। বাঙালির সকল ঐতিহ্যই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ‘হাজার বছরের ঐতিহ্য’, সকল কার্যক্রমই ‘আপন শিকড়ে ফিরে যাবার’ প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা। অথচ বাঙালের ঐতিহ্য আর সংস্কৃতি হাজার হাজার বছরের প্রাচীন হলেও বাঙালি জাতির বয়সএখনও  হাজার বছরই অতিক্রম করে নাই। মূলতঃ বাঙালদের উচ্চাভিলাষী এবং সুবিধাবাদী সুযোগসন্ধানী ছোট্ট একটা অংশ মুগল আমলের মধ্য পর্যায় হতে ইংরেজ আমলের অবসান পর্যন্ত ক্ষমতার কাছাকাছি আসে। মোগল আমলে তোষামোদী দিয়ে শুরু করে ইংরেজ আমলে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটগিরি আয়ত্ত্বের মাধ্যমে এই ক্ষুদ্র গোষ্ঠীটাই বাঙালি জাতীয়তাবাদের ধ্বজাধারী হয়ে ওঠে। এরাই নিজেদের বাঙাল সত্বাকে অস্বীকার করে তথাকথিত সভ্য-ভব্য বাঙালি হয়ে ওঠে। সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালরা হয়ে ওঠে এদের হাসি আর উপহাসের পাত্র। এই ধারাবাহিকতা এখনও চলছে। বড়জোড় পাঁচশত বছরের বাঙালি সভ্যতা(!) ধারাবাহিকভাবে বাঙালের ঐতিহ্যের বিকৃতি ঘটিয়ে আজ বাঙালকে ব্যাঙ্গ করে হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি আর ঐতিহ্য শেখায়।

পান্তা-ইলিশ: হাজার বছরের ঐতিহ্য পালনে উন্মুখ বাঙালি পান্তা-ইলিশ নিয়ে গত তিন দশক কম আদিখ্যেতা করেনি। মূলত পয়লা বৈশাখ সকালে পান্তা-ইলিশ বিক্রি শুরু হয়েছিলো টু-পাইস কামায়ের জন্য। এই নিছক ধান্দাকে শুরুর এক দশকের মধ্যে ‘হাজার বছরের ঐতিহ্য’-এর সিল মেরে নববর্ষে পান্তা-ইলিশ খাওয়াকে রীতিমত ধর্ম করে তোলা হয়েছিলো।

এই জনপদে নববর্ষে পান্তা-ইলিশ খাওয়ার রেওয়াজ কোনো কালেই ছিলো না। আদতে গরম ভাতে পানি ঢেলে পান্তা বানিয়ে গরম গরম ইলিশ ভাজা দিয়ে খেয়ে বাঙালি সংস্কৃতির হাজারে বছরের ঐতিহ্য যারা পালন করেছিলেন তারা না বাঙালি হতে পেরেছেন, না বাঙাল। তারা শিকড়ে ফিরবার নামে বাঙালকে অপমানের যথেচ্ছা উৎসব পালন করেছেন। পান্তা ভাত বাঙালের নিত্যদিনের খাবার। আজও গ্রামীন জনপদে রাতে বাড়তি ভাতে পানি দিয়ে রাখা হয়, সকালে লবন আর শুকনো মরিচ পোড়া বা কাঁচা মরিচ দিয়ে গোগ্রাসে খায় বাঙাল। সাথে কাঁচা পেয়াজ আর দু’ফোঁটা সরষে তেল থাকলে সোনায় সোহাগা। বাঙাল থেকে অতি চেতনায় সভ্য হয়ে ওঠা বাঙালির নাজুক পেটে এ খাদ্য তো সইবে না। তাই গরম ভাতে পানি ঢেলে আর গরম গরম ইলিশ ভাজা দিয়ে পান্তা-ইলিশ খাওয়ার রং-তামাশাকে শিকড়ে ফেরা বা হাজার বছরের ঐতিহ্য বানানো একমাত্র আত্নপরিচয় সংকটে ভোগা সদ্য বাঙালির পক্ষেই সম্ভব।

মঙ্গল শোভাযাত্রাঃ মঙ্গল শোভাযাত্রা নিয়ে কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু মঙ্গল শোভা যাত্রাকে বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য বানিয়ে নববর্ষ পালনের ধর্মীর রীতিতে পরিণত করার বিষয়ে তীব্র আপত্তি আছে। বাঙাল এত গর্ধভ জাতি নয় যে নববর্ষে অর্থাৎ বৈশাখের তালুফাটা গরমে জবরজং হয়ে মঙ্গল কামনায় শোভাবর্ধক যাত্রা করবে। মঙ্গল শোভাযাত্রার উৎপাদক হচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ। এখন প্রশ্ন হলো বৈশাখের তপ্ত সকালে কেনো মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিলো? উত্তর কঠিন কিছু নয়, ঐ যে তথাকথিত ‘হাজার বছরের বাঙালির ঐতিহ্য’র মোড়ক আর আত্মপরিচয় সংকটে ভোগা বাঙালির এক-আধদিনের জন্য শিকড়ে ফিরবার হুতাশন।

রমনা বটমূলের বর্ষবরণঃ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম ১৮৬১ সালে এবং মৃত্যু ১৯৪১ সালে। অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যুর একশত বছর এখনও হয়নি। রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের শুরু ইংরেজি ১৯৬৪ সাল, বাংলা ১৩৭১ সালের ১লা বৈশাখ। অথচ রমনাবটমূলে ছায়ানটের অনুষ্ঠানও না কি আজ বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য এবং জাতীয় অনুস্ঠান! এই ঐতিহ্যওয়ালাদের কাছে খুব জানতে ইচ্ছে করে বাংলাদেশের কত পার্সেন্ট মানুষ অর্থাৎ সিংহভাগ বাঙাল কোন আমলে নববর্ষের দিনে রবীন্দ্রসংগীত আর অন্যান্য কেলোয়াতি গান শুনে বর্ষবরণ করেছিলো? এই অনুষ্ঠান আত্মপরিচয় সংকটে ভোগা বাঙালির নতুন শিকড় খোঁজার বা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা হতে পারে। মেধা ও মননে সাম্প্রদায়িক কিন্তু মুখোশে অসাম্প্রদায়িকতার বুলি আওড়ানো বাঙালির জন্য এমন একটা অনুষ্ঠান খুবই তাৎপর্যবহ। কিন্তু ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে এই জনপদের ৯৯ভাগ মানুষ অর্থাৎ বাঙালের কাছে এই বর্ষবরণের অনুষ্ঠানের কানাকড়ি মূল্য নেই। কারন বাঙাল জাতি এবং চরিত্রগতভাবেই অসাম্প্রদায়িক।

৩.

বাঙালের নববর্ষ শুরু হয় নববর্ষের অন্তত দুই দিন আগে। অর্থাৎ, হালখাতার হিসেব নিকেশ সম্পন্ন করার আর অতিথি আপ্যায়নের আয়োজনের ব্যস্ততায়। এখনও বাঙাল ‘লোকনাথ পঞ্জিকা’ অনুযায়ী নববর্ষ পালন করে। বাঙাল তাদের নিত্যদিনের জীবনে বাংলা একাডেমির আধিপত্য অনেক আগেই খারিজ করেছে।  নববর্ষের সকালে বাঙাল একটু ভালো খাবার খায়, মিষ্টিমুখ করে। ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে একে অপরের সাথে সাক্ষাৎ করে। হালখাতা এখনও চালু আছে বাঙালের জীবনে। কৃষকের জমির বর্গা, পুকুরের লিজ নবায়নও বৈশাখ থেকেই হয়। নিত্য দিনের পান্তাভুক বাঙাল এদিন সাধ্যমত ভালোখাবার খায়, পাতে মাছ-মাংস ওঠে।

নববর্ষে বাঙালের বিনোদন মেলা, বাউল গান আর যাত্রা পালায়। মেলা বাঙালের জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারন, মেলাতে সে যেমন বাণিজ্য করে তেমন উপভোগও করে। গ্রামীন মেলাতেই পাওয়া যাবে বাঙালের প্রকৃত সংস্কৃতি আর শিল্পবোধ ও শিল্পকর্ম। বাঙালির বিকৃতির থাবার আধিপত্যের স্বর্নযুগে এখনও কোনো রকমে টিকে আছে এসব লোকজ শিল্প।

অন্যদিকে বাউল গানের সিডি লালনের নাম করে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাঙালির ড্রয়ং রুমে ঢুকতে পেরেছে বটে তবে মগজে ও মননে ঢুকতে পারেনি। বাঙালি নিজ দায়িত্বে বাঙালের সম্পদকে নিজেদের ড্রয়ংই রুমে ঢুকানোর জন্য যতটা বিকৃতি ঘটানোর প্রয়োজন সেটা কৃতিত্বের সাথে সম্পন্ন করেছে (কনটরশন আর ইম্প্রোভাইজেশন এক নয়)। তাই বাঙালি হিরুশাহকে চেনেনা, চেনে ফরিদা পারভীনকে।

বাঙালির যাত্রাপালার দিকে যতকম যাওয়া যায় ততই ভালো। তবে গ্রামীন উদ্যোগে এখনও যাত্রাপালা তার স্ব-মহিমায় টিকে আছে। যদিও তা একেবারে ক্ষুদ্রিপরিসরে, অবশ্য সর্বগ্রাসী বাঙালি আধিপত্যের বিরুদ্ধে এখনও এভাবে টিকে থাকা কম কি!

৪.

পাঁচশো বছরের বাঙালি জাতি হাজার বছরের ঐতিহ্য পালন করতেই পারে, বাঁশের চেয়ে কঞ্চি বড় হতেই পারে। হিপোক্রেসীর এই যোগ্যতা ছিলো বলেই তারা বাঙাল হতে বিশিষ্ট হয়ে বাঙালি হতে পেরেছিলো। কিন্তু হাজার বছরের বাঙালের ঐতিহ্যকে ব্যাঙ্গ করার কোনো অধিকার কারো নেই- এটা বাঙালির বুঝতে হবে। তারও আগে বুঝতে হবে এই জনপদের ৯৯% মানুষকে- অর্থাৎ আপদমস্তক বাঙ্গালদের।

 

 

 

 

 

 

 

আবু সাঈদ আহমেদ, সাংবাদিক, লেখক ও এক্টিভিস্ট।


নতুন কাগজ | রুদ্র মাহমুদ

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Loading Facebook Comments ...
 বিজ্ঞাপন