Natun Kagoj

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৯ ডিসেম্বর, ২০১৭ | ৫ পৌষ, ১৪২৪ | ২৯ রবিউল-আউয়াল, ১৪৩৯

বাংলাদেশের শিক্ষা উন্নয়ন: বিস্ময়!!

আপডেট: ২৬ আগ ২০১৭ | ১৭:১০

মহসিন কবীর, নওগাঁ সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগে অধ্যাপক পদে কর্মরত। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ও সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি নিয়ে তিনি ভাবেন শিক্ষকের দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই। সেসব ভাবনার কিছু কিছু তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও লিখেন অকপটে। যাতে, সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর বিষয়টি অবহিত হয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সহযোগিতার মাধ্যমে শিক্ষক, শিক্ষার্থী তথা দেশের শিক্ষার মঙ্গলকামনাই মহসিন কবীরের অনুপ্রেরণা।

বিষয়ের গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে নতুন কাগজের পাঠকদের জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে মহসিন কবীরের লেখাটি তুলে দেয়া হলো।

বাংলাদেশের শিক্ষা উন্নয়ন: বিস্ময়!!

মহসীন কবির

সেই ছেলেবেলা থেকে শুনে আসছি, পড়ে আসছি, শিক্ষা সম্পর্কিত যেকোনো আলোচনায় বক্তারা বলে আসছেন, এখনও বাচ্চাদের পড়তে দেখি…”শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড”।

শিশুকে সযত্নে সুসম খাদ্য প্রয়োগে লালনপালন করতে না পারলে সে শিশু সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হয়ে বেড়ে উঠতে পারে না এটা আমাদের সকলেরই জানা। অনেকদিন যাবতই ভাবছিলাম আমাদের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীরা তাদের মেরুদণ্ড কতটুকু শক্ত করে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে তা নিয়ে দু’কলম লিখবো একজন সচেতন নাগরিকের দায়বদ্ধতা থেকে।

দেশবাসী সকলেই জানেন, আজ প্রায় পাঁচ বছর যাবত দেশের সকল স্কুল কলেজে সৃজনশীল নামে একটি পদ্ধতি চালু হয়েছে, এ পদ্ধতিতে পড়াশুনা করে শিক্ষার্থীরা ব্যাপক হারে স্বর্ণডিম্ব নিয়ে কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফল করছে এবং এ ফলাফল নিয়ে দেশের প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীদের মতামতও আপনার আমার কারও অজানা নেই। কিন্তু কেনো এমন? একথাটি আমরা কেউ কি ভেবে দেখেছি একটিবার? এ বিষয়ে উৎসাহী হয়ে বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ড ও এনসিটিবির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে যা জেনেছি তা রীতিমতো আতঙ্কিত হবার মত বিষয়!

গোটা বাংলাদেশের অধিকাংশ শিক্ষকই জানেন না সৃজনশীল পদ্ধতিটি আসলে কি জিনিষ! কর্তাব্যক্তিরা জানালেন, স্কুল কলেজে কর্মরতদের মধ্যে ১% শিক্ষকেরও সৃজনশীল পদ্ধতি বিষয়ে কোনোরূপ প্রশিক্ষণ নেই। এই শিক্ষকরাই শিক্ষার্থীদের পাঠদান করছেন এবং পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন করছেন! ফলে শিক্ষার্থীদের অধিকাংশই ছুটে যাচ্ছে সৃজনশীল পদ্ধতিতে শিক্ষাদানের সাইনবোর্ডসর্বস্ব কোচিং সেন্টারগুলোতে। আমাদের মাথায় রাখতে হবে, দেশের প্রত্যন্ত এলাকায় বসবাসরত একজন কৃষকের সন্তানকেও এ পদ্ধতিতেই শিক্ষাগ্রহণ করতে হচ্ছে। আর ব্যাপক হারে প্রশ্নপত্র ফাঁসের কথা এখানে না হয় নাই বললাম।

আরও একটি ভয়ঙ্কর বিষয় নিয়েও কাওকে কিছু বলতে দেখি না! আপনারা সকলেই জানেন এসএসসি ও এইচএসসিতে আইসিটি নামে একটি বিষয় বাধ্যতামূলকভাবে সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে তাও পাঁচ বছর হতে চললো! আপনারা জানেন কি? সারা বাংলাদেশের কোনো স্কুল কলেজে এ বিষয়ের কোনো শিক্ষকের পদই নেই? প্রতিষ্ঠানগুলোতে যে সকল শিক্ষকরা একটু আধটু কম্পিউটার টিপাটিপি করতে জানেন তাদেরকেই অতিরিক্ত মাসোয়ারা দিয়ে এ বিষয়ে শিক্ষাদানের দায়িত্ব দিয়ে রাখা হয়েছে। অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ইসলামি শিক্ষা, বাংলা, দর্শন, ইতিহাস ইত্যাদি নানা বিষয়ের শিক্ষককে মাসিক মোটা অংকের অতিরিক্ত মায়না দিয়ে আইসিটি শিক্ষক হিসেবে অতিরিক্ত নিয়োগ দিয়ে রাখা হয়েছে। তাছাড়া বিভিন্ন কম্পিউটার দোকানের কম্পিউটার টাইপিস্টও সরকারি স্কুল কলেজের আইসিটি শিক্ষক হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত এলাকায় এমন গ্রাম, উপজেলা রয়েছে যেখানে গোটা উপজেলায় দু’টির বেশি কম্পিউটার দোকান পর্যন্ত নেই। এমন অনেক গ্রামে হাইস্কুল রয়েছে যেখান থেকে উপজেলা সদরের দুরত্ব প্রায় দশ কিলোমিটার। সেই স্কুলের শিক্ষার্থীদের কথা একবার ভেবে দেখুনতো? যেখানে কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একটি বিষয়ের কোনো শিক্ষক পদই নেই, সেখানে এ বিষয়টি কিভাবে সবার জন্যে বাধ্যতামূলকভাবে সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে তা আমার মাথায় ঢুকে না!

সরকারি কলেজের একজন অধ্যাপক হিসেবে যখনই সুযোগ পেয়েছি তখনই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সমীপে প্রসঙ্গগুলো তুলে ধরার চেষ্টা করেছি, কিন্তু কেউ আমলে নেন নি। দুর্মুখেরা বলেন, সৃজনশীল পদ্ধতি ও আইসিটি বিষয় বাধ্যতামূলক করার পেছনে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। এনসিটিতে এ পদ্ধতি বাস্তবায়ন ও প্রয়োগকালীন কর্মকাণ্ডগুলো খতিয়ে দেখলেই মূল রহস্য উন্মোচিত হবে অনায়াসেই। আমরা জানি, শিক্ষা কারিকুলামে নতুন পদ্ধতি যোগ করতে গেলে পরীক্ষা নিরীক্ষা করতেই কমপক্ষে বারো বছর সময় ব্যয় হয়। প্রথমে ল্যাবরেটরি স্কুল কলেজগুলোতে প্রয়োগের মাধ্যমে তার উপযোগিতা নিরূপণ করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু এ বিষয়ে এমন জোয়াল ছাড়া লাঙল চালানোর হেতু খুঁজে পাওয়া ভার!

অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, ধ্বংসের মুখে পরবর্তী প্রজন্ম তথা জাতির ভবিষ্যৎ!! ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দিয়ে কোথায় চলেছে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা, কোথায় চলেছে আমার প্রিয় মাতৃভূমি, বিজ্ঞজনেরা একটু ভেবে দেখবেন কি?

 


নতুন কাগজ | রুদ্র মাহমুদ

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Loading Facebook Comments ...
 বিজ্ঞাপন