Natun Kagoj

ঢাকা, সোমবার, ২৫শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ইং | ১০ই আশ্বিন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ | ৪ঠা মুহাররম, ১৪৩৯ হিজরী

প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা ও সতর্কতার চূড়ান্ত ধাপ

আপডেট: ০৪ ডিসে ২০১৬ | ১৮:৩২

ajoyঅজয় দাশগুপ্ত : বিমানের নাটবল্টু খুলে যাওয়া বা ঢিলে হয়ে পড়ার ঘটনাটা সহজ কিছু না। এর পেছনে যে রহস্য তার উদঘাটন ব্যতিরেকে আমাদের প্রধানমন্ত্রী নিরাপদ থাকতে পারেন না। শেখ হাসিনার ওপর যাদের রাগ তাদের আমরা জানি। যারা রেগে ভালোবাসার অভিনয় করেন তাদের চিনি না। এরাই এসব ঘটনার হোতা। বহু দেশের সরকার প্রধান বা নেতাদের এভাবে কুপোকাত করা হয়েছে। এটাকে দুর্ঘটনা না বলে বলা দরকার আকাশ ক্যু। পাকিস্তানের জিয়াউল হক, ভারতের সঞ্জয় গান্ধী, ফিলিপাইনের একুইনো সবাই এর শিকার। ইতিহাস বলে দুবারের বেশি সার্ভাইভ করেন না কেউ। কিন্তু প্রকৃতির অপার আশীর্বাদে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বেশ কয়েকবার বেঁচে গেছেন। শেখ হাসিনাকে সর্বতোভাবে ভালো লাগার কারণ যতটা তারচেয়ে বেশি দরকার টিকে থাকা। তিনি যদি টিকে নাস থাকেন তো যাদের লাভ তারাই মোশতাকের বংশধর। এরা সরকারি দলে বিরোধী দলে সব জায়গায় চড়ে বেড়াচ্ছে।

আজকের বাংলাদেশটা আমাদের দেখা স্বদেশের সঙ্গে ঠিক মেলে না। এর আগেও আমরা অনেক ক্রাইসিস দেখেছি। অনেক কঠিন সময় পারি দিয়েছি। কিন্তু এবার যা দেখছি তার নাম হিপোক্রেসি। এমন দ্বৈত বা ততধিক সত্তা কম জাতিতে দৃশ্যমান। মুখে মুখে এত আওয়ামী লীগার স্বয়ং বঙ্গবন্ধুও দেখে যেতে পারেননি। দেশের রাজনীতিতে সবকিছু একপেশে বলে বোঝা যায় না। তলে তলে কত ধরনের দুশমন। এত আওয়ামী লীগার, এত কর্মী, এত নেতা, এত প্রেমিক অথচ ভোটের বাক্স নিয়ে দুশ্চিন্তার শেষ নেই। শুধু তাই না, এরা এত মোসাহেব, এত স্তাবক আসল মানুষের চেহারাই ভুলিয়ে দিয়েছে তারা। যে কারণে মনে হতে পারে সবাই আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনা প্রেমিক, মূলত আমাদের প্রধানমন্ত্রীর বিমানের নাটবল্টুও খুলে রাখার কাজ চলছে সমানে।
যারা এসব কাজের পেছনে তাদের কোনোদিনও ধরতে পারেনি দেশ। ধরতে পারে তাদের যারা কাজের মিস্ত্রি বা চাকর টাইপের। যেমন যতগুলো খুনখারাবি হয় দেখবেন গুলি টোটা বা কার্তুজের বিচার হচ্ছে। বন্দুক, রাইফেল, কামানের টিকিটাও ধরতে পারে না কেউ। এবার এই ঘটনার পর বিমানমন্ত্রী মেনন ভাই বলেছেন তার বা মন্ত্রণালয়ের হাতে নাকি আসলে কিছু নেই। যদি তাই হয়, আছে যাদের কাছে তারা তবে কার অধীনে? বিমানের মাঠ পর্যায়ের মানুষরা এ কাজ করতে পারে এটা কোনো পাগলও বিশ্বাস করবে না। আমাদের রাজনীতি ও সিস্টেম এমন এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে দায়িত্ব অস্বীকার বা এড়িয়ে যাওয়াটাই হলো মূল বিষয়। কারণ এর জন্য শাস্তি নেই জবাবদিহিতাও নেই। তা না হলে আমরা এমন বক্তব্য পেতাম যাতে আশার কথা থাকতো। নিজের ভূমিকার কথা থাকতো। সেটা পাওয়া গেল না। এখন খবরে দেখছি এর সঙ্গে নাশকতার যোগসূত্র আছে কি নেই তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। নাশকতার আর বাকিটা কি? এত মানুষের চোখ এড়িয়ে প্রধানমন্ত্রীকে বহন করা বিমানটি বিপদ মাথায় নিয়ে আকাশে উড়ল আবার মাঝপথে নামতে বাধ্য হলো আবার ফিরে আসার পর নেতা-মন্ত্রীরা সারবেঁধে তাকে এয়ারপোর্ট থেকে নিয়েও এল, যেন কিছুই হয়নি কোথাও। আমি বলছি না মাতম করতে হবে কিন্তু কর্তব্যকর্মে অবহেলার পর যে অনুভব তার ছাপতো থাকতে হবে কোথাও। কি হতো যদি কিছু ঘটত? আপনারা যার যার জায়গায় নিরাপদ থেকে ঘাপটি মেরে সময়ের কাছে আত্মসমর্পণ করতেন বা ভোল পাল্টাতেন। কিন্তু যারা দেশে জামায়াত-বিএনপির বিরুদ্ধে মাঠে যাদের চিন্তা-চেতনায় মুক্তিযুদ্ধ তারা পড়ত ঘোর বিপদে। তাদের সামনে ঠেলে দিয়ে মজা লোটার মানুষরা চিরকাল তাই করেছে। এবারো তার ব্যতিক্রম হতো না।
দেশের সামগ্রিক যে চেহারা তাতে বিপদের কমতি হবে বলে মনে হয় না। আকাশে মাটিতে ঘরে বাইরে তারা সচেষ্ট। একটা বিষয় মাথায় ঢোকে না যেসব মানুষ রাষ্ট্র ও সমাজবিরোধী উদারতাবিরোধী বলে জেলে ছিলেন সরকারকে শায়েস্তা করার নামে যারা আগুন নিয়ে খেললেন তারা একে একে বাইরে আসছেন কিভাবে? কিভাবে খালেদা জিয়ার টিকিটাও ছুঁতে পারছে না সরকার? মুখে আইনে মামলায় যত কথাই হোক বাস্তবে ভালোই আছেন তিনি। তার ভালো নাস থাকার কথা বলছি না। কেন তিনি খারাপ থাকবেন? কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে তাহলে কি ধরে নেব মামলা বা শাস্তির বিষয় পাতানো? না এগুলো ভিত্তিহীন? তাকে আড়ালে রাখতে পারলে সাময়িকভাবে তৃপ্তি পাওয়া হয়তো সম্ভব কিন্তু সমাধান নয়। হয় তাকে মাঠে নামতে দিতে হবে নয়তো কেন তা হবে না তার একটা আইনি ব্যবস্থা কিংবা বিচার দেখাতে হবে। কারণ রাজনীতির নিয়মই হচ্ছে সে তার কাজ বা ভূমিকা রাখতে না পারলে আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যায়। যে রাজনীতি ভূতলে যায় গোপনে কাজ করতে চায় তার কাছে তখন আর নাশকতার বিকল্প থাকে না। যেহেতু সে প্রকাশ্য না যেহেতু জনগণের কাছে তার কোনো জবাবদিহিতা নেই তখন তার আশ্রয় হয়ে ওঠে ধ্বংস। বাংলাদেশের রাজনীতিতে কারা এই পথ নিতে পারে সেটা বুঝিয়ে বলার দরকার পড়ে না। সেদিকে নজর না দিলে এসব সমস্যার সমাধান অসম্ভব।
সরকারের জনপ্রিয়তার দিকটা যাই হোক শেখ হাসিনার প্রিয়তা বেড়েছে। তার অদম্য আগ্রহ আর শক্তিতে পরাজিত জামায়াতী মানবতাবিরোধী দালালরা সমাজের সব জায়গায় ঘুণ ধরাতে পারলেও কোণঠাসা। তাদের নেতাদের অপমৃত্যু তারা সহজে ছেড়ে দেবে না। এই কারণে সাবধানতার পাল্লা আরো ভারী হওয়া প্রয়োজন। এটা মানতে হবে দেশে-বিদেশে এদের নেটওয়ার্ক আছে। শক্তিশালী ক্যাডারভিত্তিক রাজনীতিতে নিজে মেরে অন্যকে মারার অপকৌশল আছে দুনিয়ায়। এগুলো গোয়েন্দাদের না জানার কথা নয়। আছে নাশকতার বিবিধ পথ। আকাশে সাবধানতার পাশাপাশি মাটিতেও সাবধান হতে হবে। ইন্দিরাজির মতো লৌহমানবীকেও আমরা এর শিকার হতে দেখেছি। বাংলাদেশের রাজনীতিতে যারা খুনের নেশায় পাগল তারা যে কি করতে পারে সেটা একুশে আগস্টেই দেখেছিলাম। ইতালি যাওযার পথে বিমান আকাশের ওপর থেকে আবার নিচে নামাও নাকি ছিল সামান্য ভুল। চল্লিশ হাজার ফুট ধেকে চার হাজারে নেমে আসার কোনো কারণ এখনো জানেনি জাতি। এবার তো আগুন ধরেই যেতে পারতো। এর পরেরবারও কি অজুহাতের কাছে আত্মসমর্পণ করতে হবে? শেখ হাসিনা কোন দলের বা কোন সরকারের প্রধান তারচেয়েও বড় তিনি এখন আলো ও উদারতার দিশারী। সেখানে যাদের আক্রোশ তাদের হাত থেকে তাকে বাঁচানোর কাজটাও তাদের যারা এ দেশে ভালোভাবে-সুন্দরভাবে উদারনৈতিকতায় বাঁচতে চায়। তারা কেন নীরব থাকেন? যারা নানাভাবে উপকৃত, যারা তার সাহায্য-সহযোগিতার কাঙাল তাদের নীরবতাও প্রশ্নময়।
আজ তাই আমরা উদ্বিগ্নতার পাশাপাশি সতর্ক হতে চাই। আমাদের দেশের কপালে উন্নয়নের রাজটিকা পরিয়ে দেয়া শেখ হাসিনাকে যাদের টার্গেট তারা এ দেশকে মধ্যযুগে নিতে চায়। হানাহানি-মারামারি আফগান স্টাইলে বিপ্লবের নামে সাম্প্রদায়িকতার বিস্তার চায় এরা। এদের শিকার হলে দেশতো গোল্লায় যাবেই, জনগণের কপালে নেমে আসবে বিশাল দুর্ভোগ। শেখ হাসিনার আশপাশ থেকে জঞ্জাল হটানোর বিকল্প নেই। সত্যিকার ও খাঁটি মানুষ খাঁটি নেতা আর বিশ্বস্তরা ছাড়া বাকিদের দূরে সরাতে হবে। যে কোনো নিরাপত্তা হতে হবে আন্তর্জাতিক মানের। প্রয়োজনে বাইরের সাহায্য নেয়াও জরুরি। ছলে বলে কৌশলের জায়গায় যারা বলে আর ছলে তার বিপদ ঘটাতে চায় তাদের জন্য ঘৃণাও রাখতে রাজি না আমরা।
তাকে বহুবার বিপদের মুখ থেকে ফিরে আসতে দেখার আনন্দ যেন আর করতে না হয়। যেন বিপদের আগেই সাবধান হতে পারে দেশ। এ দায়িত্ব যাদের তাদের অবহেলা যেমন অমার্জনীয় তেমনি শাস্তিও দরকার। যারা নাটবল্টু ঢিলে করেছে তাদের বল্টু টাইট করে দিন। যেন কখনো আর এমনটি করার সাহস না পায়।
অজয় দাশগুপ্ত : কলাম লেখক।


নতুন কাগজ | অনিল সেন

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Loading Facebook Comments ...
 বিজ্ঞাপন