Natun Kagoj

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৯শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ইং | ৪ঠা আশ্বিন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ | ২৭শে জিলহজ্জ, ১৪৩৮ হিজরী

পাকিস্তানকে নিয়ে আমরা হতাশ :  শেখ হাসিনা

আপডেট: ১৫ অক্টো ২০১৬ | ১৪:৩৫

9657805da38205b4314a522a23a47ab0-3282কাগজ ডেস্ক : সার্ক  সম্মেলন থেকে বাংলাদেশের সরে দাঁড়ানোর কারণ, ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বন্ধন এবং পাকিস্তানের সঙ্গে উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্ক ইত্যাদি বিষয়ে ভারতের দ্য হিন্দু পত্রিকাকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিমসটেক সম্মেলনে যোগ দেওয়ার আগে তিনি নিয়ন্ত্রণরেখায় (এলওসি) শান্তি বজায় রাখতে ভারত ও পাকিস্তানের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। সেই আলাপচারিতার চুম্বক অংশ:

প্রশ্ন: ১৯৮০-এর দশকে বাংলাদেশ ছিল সার্কের প্রতিষ্ঠাতা। কিন্তু এ বছর পাকিস্তানে অনুষ্ঠেয় সার্ক সম্মেলন বর্জনের সিদ্ধান্ত প্রথম যে দেশগুলো নিয়েছে, বাংলাদেশ তার একটি। তাহলে কি এর মধ্য দিয়ে সার্কের পরিসমাপ্তি?

উত্তর: না, এবারের সম্মেলন বর্জনের ব্যাপারে আমরা আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে যেমন বলেছি, আমরা মনে করি, সার্ক অঞ্চলে বিদ্যমান পরিবেশ এই মুহূর্তে সম্মেলন অনুষ্ঠানের জন্য সহায়ক নয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) নিয়ে বাংলাদেশের সুনির্দিষ্ট কিছু সংবেদনশীলতা আছে, যেখানে পাকিস্তান আমাদের বিভিন্ন প্রক্রিয়া নিয়ে অসন্তোষ জানিয়েছে এবং বিষয়টি তাদের পার্লামেন্টেও তুলেছে। তারা অবাঞ্ছিত কিছু মন্তব্যের মাধ্যমে আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ শুরু করে। এতে আমরা আহত হয়েছি, যেহেতু বিষয়টি আমাদের অভ্যন্তরীণ, নিজেদের দেশেই আমরা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করছি, এতে তাদের মাথাব্যথার কিছু নেই। পাকিস্তানের এই আচরণের ফলে তাদের সঙ্গে সব ধরনের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্যও আমার ওপর অনেক চাপ রয়েছে। কিন্তু আমি বলেছি, সম্পর্ক থাকবে। আর আমাদের নিজেদের সমস্যাগুলোর নিষ্পত্তি করতে হবে। সত্যিটা হলো, আমরা পাকিস্তানের কাছ থেকে মুক্তিযুদ্ধে জয়ী হয়েছি, আর তারা ছিল একটা পরাজিত বাহিনী। আমরা যুদ্ধে জিতেছি এবং দেশটাকে তাদের কাছ থেকে মুক্ত করেছি। ফলে তারা যে এটাকে ভালোভাবে নেবে না, সেটা তো প্রত্যাশিতই।

প্রশ্ন: পাকিস্তান থেকে যে সন্ত্রাস ছড়িয়ে পড়ছে, এটা কি আপনাদের জন্য প্রধান বিষয় না? উরি হামলার পর বাংলাদেশ, ভুটান, আফগানিস্তান এবং ভারত একই সময়ে সার্ক সম্মেলন বর্জন করেছে, এটা পাকিস্তানকে একঘরে করতে সমন্বিত পদক্ষেপ বলে মনে হয়।

উত্তর: পাকিস্তানের পরিস্থিতির কারণেই আমরা সার্ক সম্মেলন বর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সেখানে সন্ত্রাসের সবচেয়ে বড় ভোগান্তির শিকার সাধারণ জনগণ। আর সেই সন্ত্রাস সবখানে গেছে। এ কারণে আমাদের অনেকে পাকিস্তানের প্রতি হতাশ। ভারত ও পাকিস্তানেরও নিজেদের দ্বিপক্ষীয় নানা সমস্যা রয়েছে। আমি তা নিয়ে মন্তব্য করতে চাই না। ভারত ওই হামলার (উরি হামলা) জন্যই সম্মেলন বর্জন করেছে। কিন্তু বাংলাদেশের এমন সিদ্ধান্তের কারণ সম্পূর্ণ আলাদা।

প্রশ্ন: ওপারের সন্ত্রাসীদের হত্যা করতে সীমান্ত অতিক্রম করে পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরে হামলার ভারতীয় সিদ্ধান্ত আপনি কি সমর্থন করেন?

উত্তর: আমি মনে করি উভয় দেশকেই এলওসি (নিয়ন্ত্রণরেখা) বজায় রাখতে হবে। তাহলেই শান্তি আসবে।

প্রশ্ন: কিন্তু আপনি কি ওই নীতি সমর্থন করেন? গত বছর সরকার এই ঘোষণাও দিয়েছিল যে তারা সন্ত্রাসীদের ধাওয়া করতে মিয়ানমার সীমান্ত অতিক্রম করেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও যদি একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়, আপনি কি সমর্থন করবেন?

উত্তর: আমি মনে করি, নিজের দেশের সরকার এবং প্রধানমন্ত্রীকেই আপনার এ প্রশ্ন করা উচিত। আমি এসব সীমান্তে বিশ্বাস করি, এলওসিকে অবশ্যই বজায় রাখতে হবে।

প্রশ্ন: আমি জানতে চাইছি কারণ ২০০৯ সালে আপনি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হয়েছে সন্ত্রাসবাদীদের বিরুদ্ধে আপনার সরকারের দমন অভিযান: জঙ্গি আস্তানা বন্ধ করে দেওয়া, ২০ জনের বেশি দাগি আসামিকে হস্তান্তর। সন্ত্রাসবাদবিরোধী সহযোগিতা বলতে এখন কী বোঝায়?

উত্তর: দেখুন, আমি বিশ্বাস করি বাংলাদেশে সন্ত্রাসকে শিকড় গাড়তে দেওয়া যাবে না। সেটা ভারত হোক বা মিয়ানমার হোক বা যার সঙ্গেই আমাদের অভিন্ন সীমান্ত আছে…২০০৮ সাল থেকে আমরা যেসব পদক্ষেপ নিয়েছি, তার ফলাফল আপনি দেখতে পারেন। আমাদের সীমান্তের কাছাকাছি একসময় প্রতিদিন সহিংসতা, বোমা বিস্ফোরণ, সন্ত্রাস ছিল। আমরা সেগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করেছি। কোনো গোষ্ঠীকে আমাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করে অন্য কোনো দেশের ওপর সন্ত্রাসী হামলা চালাতে দেব না। বাংলাদেশ এখন আর সন্ত্রাসী রপ্তানিকারক নয়, এটা অস্ত্র চোরাচালানের রেশম পথও (সিল্ক রুট) নয়— একসময় যা ছিল।

প্রশ্ন: এ বছর হলি আর্টিজান বেকারিতে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা কীভাবে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আপনার লড়াই পাল্টে দিয়েছে?

উত্তর: সন্ত্রাস এখন একটা বৈশ্বিক সমস্যা, আর আমি এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কিছু ভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করছি। এ বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করতে স্কুল-কলেজের শিক্ষকদের কাছে যাচ্ছি। এরপর অভিভাবকদের বলছি, তাঁদের সন্তানেরা কোথায় যায়, কার সঙ্গে মেশে—সেসব বিষয় নজরে রাখতে। আমরা মসজিদ-মাদ্রাসার ইমাম ও ধর্মীয় নেতাদের বলছি, তাঁরা যেন সবাইকে শেখান যে ইসলাম একটা শান্তির ধর্ম এবং কেউ যাতে সহিংসতার কথা না বলে। চরমপন্থার বিরুদ্ধে সচেতনতা এবং সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার মাধ্যমে আমরা আমাদের শিশুদের সন্ত্রাসী হওয়া থেকে বিরত রাখতে পারব।

প্রশ্ন: আপনি ঢাকেশ্বরী মন্দিরে গিয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের সঙ্গে আলাপ করেছেন কয়েক দিন আগে, শূন্য সহিষ্ণুতার (জিরো টলারেন্স) কথা বলেছেন। পদক্ষেপ নিতে এত দেরি করলেন কেন, কারণ এখন যেসব মৌলবাদী গোষ্ঠীকে আপনারা টার্গেট করছেন, সেগুলো অনেক হিন্দু এবং অনেক ব্লগারকে হত্যা করেছে?

উত্তর: এটা সত্যি নয়। বাংলাদেশই প্রথম সন্ত্রাসী তৎপরতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে। তদন্তে সময় লাগে, শুধু এখানে নয়, সব দেশেই। তবে এটা বলা ঠিক নয় যে এসব হত্যাকাণ্ডের প্রতিক্রিয়া দেখানোর ক্ষেত্রে আমাদের গতি ধীর ছিল।

প্রশ্ন: মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো এই সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে বাড়াবাড়ি করছে। এসব সংস্থার হেফাজতে থাকা অবস্থায় হত্যাকাণ্ড এবং গুমের মতো ব্যাপার ঘটছে। সন্দেহভাজন সন্ত্রাসীদের গুলি করে আহত (নিক্যাপিং) করা হচ্ছে…

উত্তর: এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক যে মানবাধিকার সংগঠনগুলো অপরাধের শিকার মানুষজনের অধিকারের চেয়ে অপরাধীদের অধিকার নিয়েই বেশি সোচ্চার। আমেরিকায় কী হচ্ছে? তাদের স্কুলে বা অন্য যেকোনো জায়গায় যখন হামলা হচ্ছে, তখন আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো সেখানে কী করে? তারা কি হামলাকারীদের হত্যা করে জনগণকে উদ্ধার করে না? আমাদের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো কি তাদের ওপর হামলাকারী সন্ত্রাসীদের হত্যা করবে না?

প্রশ্ন: হলি আর্টিজান হামলার পর আপনার সরকার বলেছে, জড়িত সংগঠনগুলো স্থানীয় এবং তারা ইসলামিক স্টেটের (আইএস) সঙ্গে জড়িত নয়। তবে যেহেতু আইএস ওই হামলার দায় স্বীকার করেছে, প্রধান সন্দেহভাজন সন্ত্রাসীকে তারা প্রশিক্ষণ দিয়েছে, সে ক্ষেত্রে আপনার বিরুদ্ধে অস্বীকৃতির অভিযোগের কী জবাব দেবেন?

উত্তর: হতে পারে তাদের কেউ কেউ আইএসের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল, কিন্তু সংগঠন হিসেবে এখানে আইএসের কোনো ঘাঁটি নেই। এখানে আইএসের ঘাঁটির কোনো প্রমাণ যদি কারও কাছে থাকে, তাদের উচিত সেটা আমাদের দেওয়া। আমরা হামলাকারীদের শনাক্ত করেছি। আমরা জানি তারা কোথা থেকে এসেছে, তারা স্থানীয়।

প্রশ্ন: পাকিস্তানের কাছ থেকে স্বাধীন হওয়ার জন্য বাংলাদেশ যে যুদ্ধ করেছিল, তাতে বিরোধিতাকারীদের আইসিটিতে বিচারের মাধ্যমে ফাঁসিতে ঝোলানো বন্ধ করতে সারা বিশ্ব থেকে আহ্বান জানানো হয়েছে। ৪৫ বছর পর এসব ফাঁসি কি বাংলাদেশে কোনো পরিসমাপ্তির বোধ সৃষ্টি করেছে?

উত্তর: অবশ্যই সৃষ্টি করেছে। ১৯৭১ সালের ঘটনাগুলোর পর—ওরা বেসামরিক লোকজনকে গণহারে হত্যা করেছিল, দুই লাখের বেশি নারীকে ধর্ষণ করেছিল, গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েছিল—সেসব ঘটনার শিকার লোকজনের কাছ থেকে জাতীয় দাবি উঠেছে, জড়িত ব্যক্তিদের অবশ্যই বিচার করতে হবে।

প্রশ্ন: আপনি বলছেন এটা জনগণের দাবি। অথচ নির্বাচিত জামায়াত নেতাদের ফাঁসি দেওয়া হয়েছে অথবা কারাবন্দী রাখা হয়েছে। বিরোধী দল বিএনপির অনেক নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার হয়েছেন, অথবা বিচার এড়াতে বিদেশে চলে গেছেন। আপনি কি যুদ্ধাপরাধের বিচার আর আপনার নিজের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে মিলিয়ে ফেলছেন না?

উত্তর: না, এটা আমার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ব্যাপার নয়। যদি আপনি স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন, একটা স্বাধীন দেশে কীভাবে এসব স্বাধীনতাবিরোধীকে সমর্থন দিতে পারেন? বিএনপি যুদ্ধাপরাধীদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছে। বিএনপির নেতাদের বিরুদ্ধে যেসব মামলা আছে, সেগুলো ভিন্ন, তাঁদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি এবং অন্যান্য অপরাধের অভিযোগে মামলা হয়েছে। যদি তাঁরা অপরাধী না হন, তাঁদের উচিত দেশ ছেড়ে না পালিয়ে বিচারের মুখোমুখি হওয়া। আমি যখন বিরোধী দলে ছিলাম, তখন তারাও আমার বিরুদ্ধে অনেক মামলা করেছিল।

২০১৪ সালে বিএনপি শুধু নির্বাচন বয়কটই করেনি, তারা সেটা বানচালের চেষ্টা করেছিল। তাদের কর্মীরা বিভিন্ন বিদ্যালয়ে ভোটকেন্দ্রগুলোতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল, হামলা করেছিল নির্বাচনী কর্মকর্তাদের ওপরও। বাস ও ট্রেন ধ্বংস করেছিল। ২০১৫ সালে তারা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দেশটাকে তিন মাস জিম্মি করে রেখেছিল। তখন তারা অন্তত ২৫০ জনকে হত্যা করে। তাই তাদের অবশ্যই আইনের মুখোমুখি হতে হবে। এগুলো রাজনৈতিক মামলা নয়।

প্রশ্ন: আপনি ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে এনেছিলেন। অথচ আজ আপনি এমন এক পার্লামেন্টের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যেখানে কোনো বিরোধী দল নেই। আপনি কি মনে করেন আগামী নির্বাচনে আপনি বিএনপিকে ফিরিয়ে আনবেন?

উত্তর: বিএনপির ব্যাপারে বলতে গেলে, তারাই তো নির্বাচন বয়কটের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। আমি বেগম খালেদা জিয়াকে টেলিফোন করেছিলাম। কিন্তু তিনি আমার ফোন ধরেননি। আমার বাবা তাঁর স্বামী জেনারেল জিয়াকে পদোন্নতি দিয়েছিলেন। আমরা তখন থেকেই পরস্পরকে চিনি। কিন্তু তিনি (খালেদা জিয়া) আমার সঙ্গে সবচেয়ে খারাপভাবে কথা বলেন, এমনকি আমি যখন তাঁর ছেলের মৃত্যুতে সমবেদনা জানাতে গেলাম, তিনি আমার মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে সেই সমবেদনা প্রত্যাখ্যান করলেন। তিনি দলীয় কর্মীদের বিক্ষোভ করতে এবং সহিংসতা চালানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। একজন মানুষ হিসেবে আমি আর কী করতে পারি? এটা তাঁর ভুল, তাঁর নির্বাচনের বাইরে থাকার সিদ্ধান্তটা এবং আমি আশা করি তিনি আগামীতেও একই ভুল করবেন না। কিন্তু আমি তাঁকে অপকর্মের মাধ্যমে গণতন্ত্র বিপন্ন করার সুযোগ দেব না।

প্রশ্ন: গণতন্ত্রের আরেকটি অংশ হচ্ছে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা। সম্প্রতি একজন সুপরিচিত সম্পাদককে গ্রেপ্তার, মুক্তিযুদ্ধের অবমাননার বিরুদ্ধে কঠোর সাজার বিধানসহ নতুন ডিজিটাল আইন এই সংকেত দিচ্ছে যে আপনি গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করছেন…

উত্তর: আমি যখন ক্ষমতায় আসি, দেশে তখন কেবল একটিমাত্র টেলিভিশন চ্যানেল ছিল। এখন আমাদের ২৩টি চ্যানেল আছে। এটা কে করেছে? শতাধিক সংবাদপত্রকে এখানে বিকশিত হওয়ার সুযোগ কে দিয়েছে? আমি জানতে চাই, সংবাদমাধ্যমের কোনো স্বাধীনতা যদি না-ই থাকে, কীভাবে তারা এ কথা লেখার স্বাধীনতা পেল যে লেখার স্বাধীনতাই নেই? আমরা ওই সম্পাদককে (রাষ্ট্রদ্রোহের দায়ে গ্রেপ্তার সম্পাদক শফিক রেহমান) ভিন্ন এক অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তার করেছি। তিনি যদি দেশের বিরুদ্ধে কাজ করে থাকেন, অবশ্যই বিচারের মুখোমুখি হতে হবে তাঁকে। এ ছাড়া বাংলাদেশে আরও অনেক সম্পাদক আছেন, তাঁদের কয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে?

প্রশ্ন: চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং বাংলাদেশে এসেছেন। এরপর তিনি ব্রিকস-বিমসটেক সম্মেলনে যোগ দিতে ভারতে যাবেন। সেখানে আপনিও যোগ দেবেন। চীনের সঙ্গে আপনার দেশের সম্পর্ক ভারত গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। মৈত্রীর দুয়ার খোলা সত্ত্বেও ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য কেন চীনের সঙ্গে বাণিজ্যের তুলনায় এত পিছিয়ে আছে?

উত্তর: আসলে আমাদের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের অনেক উন্নতি হয়েছে, বিশেষ করে ভারত আমাদের শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত প্রবেশের সুযোগ দেওয়ার (২০০৭-০৮) পর থেকে। অতীতে আমরা খাদ্যশস্য ভারতের কাছ থেকে কিনতাম। কিন্তু এখন আমরা স্বনির্ভর। বাণিজ্য কিছুটা কমে যাওয়ার এটা একটা কারণ হতে পারে। কিন্তু এখন অনেক মূলধনি পণ্য, যন্ত্রপাতি ও তুলা ভারত থেকে আসছে। আমাদের সম্পর্ক ভালো আছে এবং তা বিকশিত হতে থাকবে।

প্রশ্ন: কিন্তু ৬০০ থেকে ৭০০ কোটি ডলারের (ভারত-বাংলাদেশ) দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, তো চীনের চেয়ে অনেক পিছিয়ে…

উত্তর: এটা বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভর করে, তারা কোত্থেকে পণ্য কিনতে চায়। দুই দেশের বিপুল বাণিজ্য ঘাটতির ব্যাপারে বাংলাদেশও বহুদিন ধরে সোচ্চার এবং দুদেশের বাণিজ্য বাধাগুলো অপসারণে কাজ চলছে। আমরা মোংলা এবং ভেড়ামারায় ভারতীয় বিশেষ রপ্তানীকরণ অঞ্চল (এসইজেড) প্রতিষ্ঠারও পরিকল্পনা করছি, যা বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) বাড়াবে এবং তাতে বাণিজ্য ঘাটতি কমবে।

প্রশ্ন: চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার, এটা সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা অংশীদার, চীনের ‘এক অঞ্চল, এক পথ’ উদ্যোগে বাংলাদেশের বড় ভূমিকা রয়েছে। কাজেই ভারতের জন্য এটা কি উদ্বেগজনক নয় যে বাংলাদেশ এই অঞ্চলে চীনের ‘স্ট্রিং অব পার্ল’ (মুক্তার মালা) হয়ে উঠতে পারে?

উত্তর: আপনি ভারত এবং বাংলাদেশের মধ্যে সুসম্পর্কের কথা বললেন। মনোভাব যদি এটাই হয়ে থাকে তাহলে কীভাবে আপনি চীনের দিকে বাংলাদেশ ঝুঁকে পড়ছে বলে অভিযোগ তুলছেন? না, আমাদের নীতি খুবই পরিষ্কার। সবার সঙ্গেই আমাদের ভালো সম্পর্ক এবং আমরা তা বজায় রাখতে চাই। এবং আমি বিশ্বাস করি, ভালো সম্পর্কের ক্ষেত্রে যোগাযোগ একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আমরা বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত ও নেপাল (বিবিআইএন) নেটওয়ার্ক স্থাপন করেছি, ভুটান, ভারত ও নেপালের সঙ্গে ভালো সম্পর্কেরই ফল এটা। চীন, ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে আমাদের বিসিআইএম করিডরও রয়েছে। কাজেই আমরা সবাই মিলে নিজেদের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ বাড়াতে পারি এবং যার অর্থ হবে আমাদের জনগণের আর্থিক অবস্থার উন্নতি। আমাদের জনগণের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে এবং এই অঞ্চলে সবচেয়ে লাভবান কে হবে? ভারত। বাংলাদেশের বাজার থেকে ভারতই সবচেয়ে লাভবান হয়। আপনার এটা বোঝা উচিত।

প্রশ্ন: এ সপ্তাহে আপনি ব্রিকস-বিমসটেক সম্মেলনে যোগ দিতে ভারত সফর করবেন। এরপর চলতি বছরের শেষ দিকে আশা করা হচ্ছে (ভারতে) দ্বিপক্ষীয় সফর করবেন। এসব সফর থেকে কী অর্জনের আশা করছেন আপনি?

উত্তর: এ অঞ্চলে আমাদের সবার সমস্যা, শত্রু একটাই, আর তা হলো দারিদ্র্য, যা দূরীকরণে আমাদের লড়তে হবে। প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে আমাদের হয়তো অনেক সমস্যাই থাকতে পারে, কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, এসব সমস্যা সব সময়ই সমাধান সম্ভব। ভারত এবং বাংলাদেশ নিজেদের মধ্যে সমস্যা সমাধান করেছে, যেমন গঙ্গার পানিচুক্তি। আমরা আশা করছি, ব্রিকসের নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের শর্ত শিথিল করার মাধ্যমে এর নেতারা বিমসটেকের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবেন।

প্রশ্ন: সফরের সময় আপনি কি উৎকৃষ্ট সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা করবেন, কেননা স্থলসীমা চুক্তি (এলবিএ) সম্পাদিত হওয়া এবং ছিটমহল সমস্যা সমাধান হওয়া সত্ত্বেও আরও কিছু সমস্যা থেকে গেছে, যেমন অভিবাসন এবং সীমান্তে গুলি?

উত্তর: হ্যাঁ, দীর্ঘ ৪৫ বছর পর আমরা স্থলসীমান্ত সমস্যা সুরাহা করেছি। বড় সমস্যা যদি সমাধান করা যায়, আমরা তুলনামূলক ছোট সমস্যাগুলোরও সমাধান করতে পারব। সীমান্তে গুলি করে হত্যার ঘটনাগুলো উদ্বেগজনক। দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী—ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), বিএসএফের গুলিতে নিরপরাধ বাংলাদেশি নিহত হওয়ার ঘটনাগুলো যৌথভাবে তদন্তের ব্যাপারে একমত হয়েছে এবং দুই দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরা এ নিয়ে আলোচনাও করছেন। কিছু সমস্যা হয়তো এরপরও থেকে যাবে কিন্তু দেখুন, মসৃণভাবে দুই দেশের মানুষ এবং ভূমি আদান-প্রদান করে বিশ্বের জন্য কত বড় এবং অসাধারণ একটা উদাহরণ সৃষ্টি করেছি আমরা।

প্রশ্ন: আপনার দ্বিপক্ষীয় সফরের তারিখ এখনো নিশ্চিত হয়নি…এটা কি তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত?

উত্তর: না, না (হাসি), এই সফর ওই শর্তযুক্ত নয়, এমনকি রাষ্ট্রীয় সফর ছাড়াও আপনাদের দেশে আমি গিয়েছি। রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির স্ত্রীর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সময় আমি গিয়েছি। তাঁর মৃত্যুর খবর পাওয়ামাত্র আমি ছুটে গিয়েছি। কারণ, ১৯৭৫ সালে আমি যখন ভারতে নির্বাসনে ছিলাম, তখন তিনি আমার জন্য অনেক কিছু করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারত আমাদের জনগণের জন্য অনেক কিছু করেছে, আমাদের শরণার্থীদের তারা দেখভাল করেছে, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণে সহায়তা করেছে। কাজেই যখন এমন শক্ত বন্ধন থাকে, এসব শর্তের ব্যাপারে আপনি তখন ভাববেন না। প্রতিবেশীর বাড়িতে আমি যেকোনো সময় যেতে পারি।

প্রশ্ন: সার্ক যেহেতু অচলাবস্থায় রয়েছে আপনি কি মনে করেন, জোট হিসেবে বিমসটেক সফলতা পাবে?

উত্তর: না। সার্ক হলো দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সংস্থা এবং তা আগের মতোই আছে। বঙ্গোপসাগরের চারপাশের দেশগুলোর অর্থনৈতিক উন্নয়নে গঠিত বিমসটেকের আমিও একজন প্রতিষ্ঠাতা, যেহেতু ১৯৯৭ সালে আমি প্রধানমন্ত্রী ছিলাম। নরেন্দ্র মোদি সংস্থাটিকে সামনে এগিয়ে নিয়ে গেছেন এবং এ জন্য আমি তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ। কিন্তু আমি একটি সংস্থাকে অপর একটি সংস্থার বিকল্প হিসেবে দেখি না।


নতুন কাগজ | অনিল সেন

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Loading Facebook Comments ...
 বিজ্ঞাপন